কুম্ভমেলার থেকেও গুরত্বপূর্ণ সাগরমেলা

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

কৌশিক বসু

গঙ্গাসাগর মেলার জন্য রাজ্য সরকার কারও কাছে হাত পাতে না। রাজ্য নিজেই এই মেলাকে সেরা হিসাবে তৈরি করেছে। গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতিপর্ব সরেজমিনে খতিয়ে দেখার পর একথাই জানালেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কথায় আছে সব তীর্থ বারবার গঙ্গাসাগর একবার। গঙ্গাসগর পৌঁছনোর যাত্রাপথের কথা ভেবেই এই প্রবাদ চালু হয়েছে। কিন্তু যে মেলা লক্ষ লক্ষ মানুষের সেতুবন্ধনের কাজ করে সেখানে যাতায়াতের সুবিধার্থে সেতু তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল মা-মাটি-মানুষের সরকার। বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্র সরকারকে এনিয়ে বারবার চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনও সাড়া মেলেনি। একটা টাকাও দেয়নি কেন্দ্র। কিন্তু রাজ্য কারও ধার ধারে না। মাথায় ঋণের পাহাড় সত্ত্বেও নিজ উদ্যোগেই গঙ্গাসাগর মেলার যাত্রাপথকে সুগম করে তুলেছে মা-মাটি-মানুষের সরকার। আর এহেন এক মিলনস্থলে সকল দেশবাসীকে আমন্ত্রন জানিয়ে জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “গঙ্গাসাগর তীর্থের আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, বর্ণের মানুষ একসঙ্গে মিলিত হন। তাই সকলকে বলব, বাংলাকে আপনাদের ঘর ভাবুন।”

কুম্ভমেলার সঙ্গে গঙ্গাসাগরের প্রসঙ্গ টেনে জননেত্রী বলেছেন, “গঙ্গাসাগর মেলার সঙ্গে অন্য মেলার পার্থক্য আছে। কুম্ভমেলায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রচুর টাকা দেয়। সেটার সঙ্গে রেলের ও রাস্তার যোগাযোগ আছে। কুস্তমেলার থেকে কম তো নয়, বরং বেশি মানুষ আসেন গঙ্গাসাগর মেলায়। যেখানে প্রত্যেক মানুষকে জলপথ দিয়ে পার হতে হয়। জোয়ার-ভাটার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেই জন্য সকলেই বলেন সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার।”

তবে গঙ্গাসাগর পৌঁছনোর জন্য সেতুর দায়িত্ব যে রাজ্য সরকার নেবে তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন জননেত্রী। তিনি বলেছেন, “সেতুর দায়িত্ব আমরাই নেব। আমাদের ঘরে যে আর্থিক বোঝা আগেকার সরকার চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছে তা শোধ হলেই প্রথম কাজ হবে ওই সেতু নির্মাণ। আমি কথা দিলাম এজন্য আর কারও কাছে হাত পাতবো না।” তিনি আরও জানান, মেলার জন্য কেন্দ্র কখনও কোনও সাহায্য করেনি। আমাদের তরফে সেতু করার প্রস্তাব দিলেও আগ্রহ দেখায়নি। অথচ সারা দেশ তো বটেই, বিদেশ থেকেও বহু মানুষ এখানে আসেন। তাই আমরা নিজেরাই উদ্যোগী হব। ৫০ হাজার কোটি টাকা দেনা রয়েছে। তা শোধের পর প্রথম প্রকল্প হবে মুড়িগঙ্গা নদীর উপর লোহার সেতু। জননেত্রী ইতিমধ্যেই মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে প্রস্তুতিপর্ব খতিয়ে দেখেছেন। গিয়েছিলেন কপিল মুনি আশ্রম ও ভারত সেবাশ্রমেও। তীর্থযাত্রীদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সে জন্য প্রশাসনের আধিকারিকদের প্রয়োজনীয় সমস্ত নির্দেশ দিয়েছেন জননেত্রী।

গঙ্গাসাগর মেলা প্রাঙ্গণকে রাজ্য সরকার এবার নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেছে। তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত, থাকার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। তীর্থকর মকুব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে দুর্ঘটনাজনিত বীমাও করা হয়েছে। এবারই প্রথম গঙ্গাসাগর মেলায় গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম খরচে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পরিষেবা দিতে চলেছে রাজ্য বিদ্যুৎ দফতর। পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণকে দুর্ঘটনা মুক্ত রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। এছাড়াও কপিল মুনির আশ্রম ও মেলা প্রাঙ্গনের চিত্র লাইভ টেলিকাস্টের ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। এই প্রথম গঙ্গাসাগর মেলায় বানানো হচ্ছে অসুস্থ যাত্রীদের জন্য গ্রিন করিডর। যে গ্রিন করিডর দিয়ে অসুস্থ যাত্রীদের সহজেই নিয়ে যাওয়া হবে হাসপাতলে। আর তার জন্যই এয়ার আম্বুল্যান্স, ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্স হেলিকপ্টার মজুত রাখা হচ্ছে। সাগর হাসপাতালকে ৩০০ বেডের হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে ও ৮৫টি অ্যাম্বুল্যান্সকে গঙ্গাসাগর মেলার জন্য তৈরি রাখা হয়েছে।

এছাড়াও ‘অতিথি’ নামক অ্যাপে গঙ্গাসাগর মেলা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য পাওয়া যাবে। পুজো থেকে নদীর জোয়ার ভাটা যান চলাচল, ফেরি অবস্থা সবটাই জানা যাবে। অ্যাপটি সাগর সুরক্ষা সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাই তীর্থ যাত্রীদের সুরক্ষার দিকেও নজর দেওয়া যাবে। এটি ব্যবহার করার সময় ব্যবহারকারীর ভৌগোলিক অবস্থান বোঝা যাবে। ফলে কোনও অসুবিধা হলে তার কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারবেন উদ্ধারকারী দল। প্রতিটি যানে থাকবে বাহন ট্রাকার। এর মাধ্যমে যাত্রী বোঝাই গাড়ি যদি কোথাও আটকে পড়ে বা কুয়াশার কারণে যদি লঞ্চ বা জলযান ভুল পথে চলে যায়, তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। সাগর মেলা চলাকালীন পরিষেবা চালু রাখার জন্য বিশেষ ভিএইচএফ রেডিও টেকনোলজি বসানো হচ্ছে। যার নাম দেয়া হয়েছে সাগর সঞ্চার। মেলা থেকে শুরু করে জোকা পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ২০০ এলইডি স্ক্রিন বসানো হচ্ছে। যার সাহায্যে মেলার বিভিন্ন ভিডিও ছবি দর্শকরা দেখে নিতে পারবেন। তাছাড়া বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও গঙ্গাসাগর ওয়েবসাইটেও লাইভ দেখানোর ব্যবস্থা থাকবে। শিশু ও বৃদ্ধদের হাতে পড়ানো হবে এক বিশেষ রিস্টব্যান্ড। এই রিস্টব্যান্ড থাকলে কেউ হারিয়ে গেলে তাদেরকে খুঁজে বের করা যাবে। এছাড়াও স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসানো হয়েছে। ৪৭৫ টি বিভিন্ন রকমের যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য। গঙ্গাসাগর মেলাকে পুরোপুরি প্লাস্টিকমুক্ত মেলা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial