একদিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্টে অর্থনীতির আরও বিবর্ণ ছবি, অন্যদিকে তথ্যে স্বচ্ছতা আনতে নতুন কমিটি ধামাচাপা দিতেই কি?

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

ডঃ দেব নারায়ন সরকার

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “জীবনের স্বচ্ছতা হল সবচেয়ে উচ্চ এবং সবচেয়ে সৎ কৌশল বা বিদ্যা (PURITY OF LIFE IS THE HIGHEST AND TRUEST ART)” দেশ ও জাতির ক্ষেত্রেও একই সত্যতা প্রযোজ্য। জিডিপি মাপার ফিতে বদলানো থেকে শুরু করে বেকারত্বের রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়ে রাখা, দারিদ্রের হার মোদির আমলে ১০ শতাংশ আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় গত নভেম্বরে আমজনতার ব্যয় সংক্রান্ত সরকারি রিপোর্ট বাতিল করে দেওয়া–মোদি সরকারের জমানায় তথ্য পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। তথ্যে এই অস্বচ্ছতার জন্য গত বছর জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর থেকে পদত্যাগ করেছেন একাধিক প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ। তথ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন ১০৮ জন অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এজন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে তোপ দেগে চলেছেন বিরোধীরা। এই সমস্ত অভিযোগের মুখে শেষপর্যন্ত তথ্যের মান উন্নত করতে ২৮ সদস্যের স্থায়ী কমিটি তৈরি করল পরিসংখ্যান মন্ত্রক। যার নেতৃত্বে থাকবেন প্রাক্তন মুখ্য পরিসংখ্যানবিদ প্রণব সেন। যিনি নিজেও এর আগে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্রের এই উদ্যোগ তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার অন্য একটি কৌশল নয়তো?

যে পরিসংখ্যানসমূহ কেন্দ্রের মনঃপুত নয়, বিভিন্ন মাপকাঠি দেখিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে মোদির আমলে তা ধামাচাপা দেওয়া বা বদলানো হচ্ছে বলে অভিযোগ ছিল অর্থনীতিবিদের। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন কত মার্চে বলেছিলেন, “বৃদ্ধির নতুন পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তি কোথায়, তা খুঁজে বের করা জরুরি। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন আলাদা কমিটি তৈরি করা হোক, তাহাই পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখুক। বিশ্বকে বোঝানো জরুরি যে আমরা তথ্যে কারচুপি করছি না।” তিনি আরও মন্তব্য করেন যে রাজকোষ ঘাটতির ঠিক অঙ্ক জানানো উচিত সরকারের। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের মুখ্য অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথও একইভাবে বলেছিলেন, ভারতের পরিসংখ্যান আরও স্বচ্ছতা জরুরি। যেখানে সারা দুনিয়া ভারতের দিকে তাকিয়ে, সেখানে দেশের বৃদ্ধির পরিসংখ্যান পরিষ্কার হওয়া উচিত। মোদ্দা কথা, সংখ্যার জিডিপি বা শতাংশে বৃদ্ধির মাপ ঘোষণার যেন আলো-আঁধারি না থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে ২০১১-১২ থেকে ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধির গড় হার ৭ শতাংশের চেয়ে বাস্তবে ২.৫ শতাংশ কম ছিল, অভিযোগ প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রক্ষণ্যমেরও। ফলে স্বভাবতই এ প্রশ্ন জাগবেই, বর্তমান অর্থবর্ষের গত ২টি ত্রৈমাসিক দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার যেখানে যথাক্রমে ৫ শতাংশ ও ৪.৫ শতাংশ, সেখানে বাস্তবে ভারতের বর্তমান অর্থবছরের গত ২টি ‘ত্রৈমাসিকে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার যেখানে যথাক্রমে ৫ শতাংশ ও ৪.৫ শতাংশ, সেখানে বাস্তবে ভারতের বর্তমান অর্থবছরের গত ২টি ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ২.৫ শতাংশের বেশি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সুতরাং অস্বচ্ছতার প্রশ্নে দাঁড়িয়ে বর্তমান ভারতের জিডিপির হিসাব।

এদিকে, ভারতের অর্থনীতির ক্রমাগত বিমর্ষ ছবিটা জানাই ছিল ৪৫ বছরের সর্বাধিক বেকারত্ব, শিল্পে সমৃদ্ধির হার গত ৮ বছরে সর্বনিম্ন, পরিকাঠামো শিল্পে বৃদ্ধির হার ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, বিদ্যুতের চাহিদা গত ১২ বছরে সর্বনিম্ন, বেসরকারি লগ্নি গত ১৬ বছরে সর্বনিম্ন, খুচরো মুদ্রাস্ফীতি গত প্রায় চার বছরে সর্বাধিক, আর্থিক সমৃদ্ধির হার গত ৬ বছরে সর্বনিম্ন ইত্যাদি।

গত ২৭ ডিসেম্বর ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার “ফিনান্সিয়াল স্টেবিলিটি রিপোর্টে” দেশের অর্থনীতির ইঞ্জিন যে আরও বিবর্ণ হয়েছে তা স্পস্ট করে তুলে ধরল। এই রিপোর্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে গত ৫৮ বছরে ভারতে ব্যাঙ্কঋণ প্রদানের হার সর্বনিম্ন। বর্তমান অর্থবছরেই, ১৯৬২ সালের পরই ভারতে ব্যাঙ্কঋণ প্রদানের হার এই প্রথম এতটা নিচে নামল। সে বছর ঋণের বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৪ শতাংশ। চলতি অর্থবর্ষে এটি প্রায় এতটা নিচে নামার সংকেত দিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এ ছাড়াও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানাল, বাজারে ঋণের বৃদ্ধি কমে যাওয়ার ধাক্কায় ব্যাঙ্কগুলির অনাদায়ী ঋণ আগামী বছরে আরও বাড়তে চলেছে। বর্তমান বছরে সেপ্টেম্বরে যেখানে অনাদায়ী ঋণ ব্যাঙ্কের মোট ঋণের ৯.৩ শতাংশ ছিল, আগামী ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে এটা বেড়ে ৯.৯ শতংশ হতে চলেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট আরও জানিয়েছে যে অর্থনীতির বৃদ্ধির চারটি ইঞ্জিনের ছবি আরও বিবর্ণ। বাজারে চাহিদা কমায় কেনাকাটা কমেছে যথেষ্ট। বাজারে লগ্নিও কমেছে যা ৫৮ বছরে সর্বনিম্ন। রফতানির চাকাও নিম্নগামী। অন্যদিকে, সরকারি খরচ ক্রমশ বাড়ছে। তাই প্রশ্ন হল, দেশের সার্বিক অর্থনীতির এরূপ নিরবচ্ছিন্ন বিবর্ণ ছবির মধ্যে মোদি সরকারের জমানায় তথ্য পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞানী, এমনকী, বিরোধীরা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যে প্রশ্ন তুলেছে, তা ধামাচাপা দিতে কি লোক দেখানোর জন্যই তথ্যের স্বচ্ছতা আনতে একটি কমিটি গঠন করা হল? সময়ই এর উত্তর দেবে।

 

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial