শীতে বাড়ে ব্যথা

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

ডাঃ শান্তনু সেন

শীতকালে এই ঠান্ডা হাওয়ার কিছু কিছু রোগ মানুষকে এক ঝটকায় বিছানায় শুইয়ে দেয়। আর্থ্রাইটিস তাদের মধ্যে অন্যতম। এই রোগটি যে শুধু শীতকালেই আক্রমণ করে তা নয়, যে কোনও সময়েই আক্রমণ করতে পারে। তবে বিশেষ করে শীতের দিনে রোগীকে কবজা করতে পারলে ছাড়ে না। এই রোগ যদি ক্রনিক ব্যথায় পরিণত হয় তাহলে সেই রোগীকে সারা বছর ধরে কষ্ট পেতে হয়। আর্থ্রাইটিস রোগটির প্রকৃত কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে আজও অজানা। এই রোগ শরীরে অস্থিসন্ধির সংযোগস্থলের পেশিতন্ত্রগুলিকেই আক্রমণ করে, এবং তাতে ভীষণ যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। পুরুষ-মহিলা উভয়েরই এই রোগ হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, পঁয়তাল্লিশ পেরনো মহিলারা এই সমস্যার আক্রান্ত হন। এই আক্রমণের ফলে হাত-পা, শরীরে অন্যান্য অঙ্গের নাড়াচাড়া সহজে করা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, শরীরের জয়েন্টগুলি ফুলে শক্ত হয়ে যায়। ফলে আঘাত যন্ত্রণায় রোগী শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তখন ওষুধ খাইয়ে এবং ব্যায়াম যা ফিজিওথেয়াপি করেও বিশেষ ফল লাভ সম্ভব হয় না। শুধু সামরিক ব্যথার উপশম হয়। তবে এই রোগ যদি প্রথম অবস্থার চিহ্নিত হয়, তাহলে সঠিক চিকিৎসায় ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই ধরনের ব্যথা হওয়ার জন্য অন্য যে সব কারণগুলি থাকে তা হল-বংশগত বা পিতা-মাতার থাকলে, সন্তানের এই প্রকার সমস্যা হতে পারে।

পুরুষদের তুলনার মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হন। বিলাসী, অপরিশ্রমী মানুষ অন্যদিকে অত্যধিক পরিশ্রমী ব্যক্তিদের আর্থ্রাইটিসের ব্যথা হতে পারে। অল্প বয়সে হাত-পা ভেঙে গিয়ে ব্যথা হলে পরবর্তী সময়ে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা হিসাবে দেখা দিতে পারে যা শীতকালে বেড়েও যাবে। ড্রাগাসক্তি হওয়ার জন্য, অত্যধিক মদ্যপান করলে এই ধরনের ব্যথা হতে পারে। ভিটামিন বা পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবেও ব্যথা হয়। রক্তশূন্যতা জনিত কারণে শরীর ভারী হয়, তার জন্য হাতে, পায়ে, কোমরে ব্যথা হয়। যারা কোনও সময়ে মাটিতে বসে না, সবসময় টেবিল চেয়ার ব্যবহার করে, তাদেরও এই রোগ হতে পারে। রক্তে ইএসআর বৃদ্ধি পেলে, শরীরের বিভিন্ন সন্ধিস্থলে তীব্র ব্যথা হয়। যা নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

আর্থ্রাইটিসের পিছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসাবধানতা ও অবহেলাই দায়ী। যেমন ধরুন সেলুনে গিয়ে চুল কাটার পর আমরা অনেককেই ঘাড়ে-পিঠে-হাতে ম্যাসাজ করিয়ে থাকি। যে কোনও মুহূর্তে আচমকা আঘাত লেগে শরীরের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়াও চলতি পথে হোঁচট খেয়ে হাত-পা মচকে যেতে পারে। একেও উপেক্ষা করা ঠিক নয়। দীর্ঘক্ষণ এইভাবে চললে ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিসের আক্রমণ করতে পারে। অনেকেরই অভ্যাস আছে মাঝে মাঝেই চাপ দিয়ে হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল ফাটানো বা মচকানো। এটা কিন্তু মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর থেকেও ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ এছাড়াও বিশেষ বিশেষ খাদ্য থেকে পাওয়া ইউরিক আ্যাসিড নামক পদার্থ দেহের বিভিন্ন সন্ধিতে জমা হয়। তার থেকেও হতে পারে আর্থ্রাইটিস।

আর দেখা যায় আমাদের শরীরের প্রত্যেক সন্ধির মধ্যস্থানে এবং প্রত্যেক গাঁটের প্রান্তভাগে একপ্রকার অস্থি আবরণী পর্দা আছে যা হল, সাইনোভিয়াল মেমব্রেন। সেই পর্দা থেকে একপ্রকার তরল রস বার হয়ে গাঁটগুলিকে সুষম ও পিচ্ছিল রাখে। যার জন্য হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণে হাড়ের কোনও ক্ষতি হয় না। অ্যাকিউট আর্থ্রাইটিসের এই সাইনোভিয়াল প্রদাহ থেকে বন্ধনীও আক্রান্ত হতে পারে। শরীরের মাংসপেশি এমনকী হৃৎপিণ্ডও বাদ যায় না। প্রথমে সন্ধির সাইনোভিরাল মেমব্রেন রক্তাধিক্য হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে। স্ফীত উত্তপ্ত জ্বর-সহ ব্যথা যুক্ত হয়। অঙ্গ নাড়াচাড়া করতে অসুবিধা হয়। আক্রান্ত জায়গাটির সন্ধি শক্ত হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে কনুই, গোড়ালি, কবজি, কাঁধ, মেরুদণ্ডের হাড়, হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, বুক, নার্ভ, মাংসপেশি যুক্ত হতে শুরু করে। এর ফলে বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা, হৃৎপিণ্ডের গতি অনিয়মিত হয়ে যায়। এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা করা ভাল। নয়তো আরও কিছুদিন পর অচল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যার জন্য শীতে এই ব্যথা থেকে দূরে থাকতে কিছু উপায় নিতে পারেন। তাতে আপনারও কষ্ট কমে।

  • প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন।
  • স্নানের আধঘণ্টা আগে রসুন তেল মেখে, স্নান করা। ৫০ গ্রাম সর্ষের তেলে ১০০ গ্রাম রসুন ভাল করে ফুটিয়ে নেবেন। এতে ভাল ম্যাসাজ হয় এবং রসুন আর্থ্রাইটিস বা ব্যথা-বেদনা কমাতে সাহায্য করে।
  • বয়সের সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার প্রতি যত্ন নিন, ইউরিক অ্যাসিড আছে এমন সবজি কম খাওয়াই ভাল। ব্যক্তিবিশেষের খাওয়া ভিন্ন হয় তাতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভাল।
  • অতিরিক্ত পরিশ্রম যেমন ভাল নয়, আবার সারাদিন অলসভাবে কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কোনওটাই স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। বাতের ব্যথা, কোমরে, পায়ের ব্যথা কমাতে, প্রতিদিন মর্নিংওয়াক, সাঁতার কাটা খুব কাজ দেয়।
  • বেশি ব্যথায় চিকিৎসকের পরাদর্শ মতো ফিজিওথেরাপি করুন। অবশ্যই ওষুধও খাবেন। তবে ইচ্ছামতো পেনকিলার খাবেন না। তাতে অন্য সমস্যা শুরু হবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial