আমাদের বিবেকানন্দ

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

মাত্র শতাব্দীকালের ব্যবধানে যে-জাতি বহু ক্ষেত্রে বিবেকশুন্যতার পরিচয় দিয়ে চলেছে তারই সামনে নিজেকে লাইটহাউসের মতো মেলে ধরেছিলেন সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ। বাংলা তথা কলকাতার নরেন্দ্রনাথ আর আমাদের মধ্যে এক শতাব্দীর ব্যবধান। তিনি জন্মেছিলেন উনিশ শতকে আর আজ একুশ শতকের যুগ। মাঝে গোটা একটি শতক যার ঠিক শুরুতেই দাঁড়ি পড়েছিল তাঁর জীবদ্দশায় (১৯০২)। আজ এক শতাব্দী দূর থেকে সেই গেরুয়াধারী বীর বাঙালিকে যখন দেখি তখন বিস্ময়ের আর থই মেলে না। একটা নতুন শতাব্দী শুরুতেই বিদায় নিয়েছিলেন উনচল্লিশের টগবগে তরুণ নরেন্দ্র। সেই শতাব্দী শুরুর ৩৬ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। তাঁর আগমনটা ঠিক ‘সম্ভবামি যুগে যুগে’ নয় আবার টম-ডিক-হ্যারি-র ব্যাপারও নয়। অথচ সেই আগমনে পৃথিবীতে উঠেছিল এক প্রবল ঝড়। আর সেই ঝড়ে ধরাশায়ী হওয়ার ছিল যত কাপুরুষতার, দুর্বলতার, অলসতার। হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যতটা হওয়ার ততটা তো হল না। কেন হল না? কেন না, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’। প্রবল কম্পনে বাঙালি তথা ভারতবাসী একটা গা-ঝাড়া দিয়েছিল বটে, কিন্তু সেটা তেমনতাবে বোধহয় স্থায়ী হয়নি। বিবেকানন্দ নামের একটা প্রবল সূর্য ভারতের আকাশে উঠলেও তার তেজে আমাদের সেভাবে গা-সেঁকা হয়ে ওঠেনি। অথচ দুর্ভাগ্য এটাই যে, বিবেকানন্দরা পৃথিবীতে বারবার জন্ম নেন না।

‘উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্‌ নিবোধত।– বললেন বিবেকানন্দ। মানে ওঠো, জাগো । কেননা, ভারতবাসী ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমঘোর কাটানোর জন্য ঘুমভাঙানিয়া নির্ঘোষ। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে পরাধীন ভারত তাকিয়ে ছিল ঠিক এমন একজনের দিকেই। গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর প্রিয় এই শিষ্যটিকে গড়ে দিয়েছিলেন দেশের চাহিদামতো। তাই তো বলেছিলেন, ‘তুই বটবৃক্ষ হবি’। ১৮৮৬-তে ঠাকুরের দেহাবসান। তারপর তাঁর ব্যাটন নিয়ে রিলে রেসে ছুটলেন বিলে। একে একে ঘটল শিকাগো বিজয়, রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা ও বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার মতো তিনটি মস্ত মস্ত ঘটনা। তিনি বলেন কাজ করতে। বলছেন ভয়কে জয় করতে। বললেন তামসিকতাকে বিদায় দিতে। বললেন স্বরুপকে চিনতে। বললেন, পৃথিবীর সমস্ত শক্তি তোমার মধ্যে আছে। তুমি যে কোনও কাজ এবং সমস্ত কাজই করতে পারো (‘All power is within you. You can do any-thing and everything’) ৩৯ বছরের তাঁর নিজের জীবনটা তাঁর এই মহাবাক্যেরই প্রমাণ।

বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি ভারত তথা ভারতবাসীর উন্নতি। আর এর জন্য চেয়েছিলেন শিক্ষার বিস্তার। এ শিক্ষা ডিগ্রি নয়। চেতনার উন্নতির নাম শিক্ষা। তাঁর গুরু সেই পাওয়ার কথাই জানিয়েছিলেন আশীর্বচনে- ‘চৈতন্য হোক’। সেই শিক্ষার প্রদীপ নরেনের মধ্যে জ্বালিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং। আর তারই স্বীকৃতি মিলেছে বারবার। কপর্দকশুন্য সন্ন্যাসী হিসাবে তিনি পৌঁছেছেন আমেরিকায় –উদ্দেশ্য শিকাগো সম্মেলনে বক্তৃতা। তাঁকে সুপারিশপত্র লিখে দিচ্ছেন হার্বার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইট । লিখলেন তিনি, বিবেকানন্দ “…is more learned than all our leaned professors put together.” আমেরিকার সমস্ত অধ্যাপককে জড়ো করলে যা বিদ্যা হবে তার চেয়েও বেশি বিদ্বান এই তরুণ সন্ন্যাসী। কিমাশ্চর্যম্।

শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য। নিজে কুস্তি লড়তেন। ডাল-রুটি খেতেন। চরিত্র বজায় রাখতে গেলে সুস্বাস্থ্য প্রয়োজন। তিনি চাইতেন দেশের মানুষ তরুণরা স্বাস্থ্যবান হোক। এজন্য চাই ফুটবল খেলা। আর সেই ফুটবল খেলার জন্য, স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য এমনকী গীতাপাঠও শিকেয় তুলে রাখতে বলেছেন।

এই একুশ শতকে দাঁড়িয়েও আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বামী বিবেকানন্দ নামে সেই লাইট হাউসকে। আজও তিনি বলছেন, কথা নয়, কাজ চাই। ১২ জানুয়ারি স্বামীজির জন্মদিন জাতীয় যুব দিবসে আমাদের নতুন করে অঙ্গীকার হোক–চৈতন্যবান হব, চরিত্রবান হব। দেশ গড়ার জন্য আমাদের পরিশ্রম নিবেদন করব নিঃশেষে। জয়তু বিবেকানন্দ। আমাদের ভাগ্যনিয়ন্তা বিবেকানন্দ।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial