যতক্ষণ না প্রত্যাহার, ততক্ষণ আন্দোলন

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

মেঘাংশী দাস

যতই হুমকি আসুক না কেন, তিনি আন্দোলনের পথ থেকে সরবেন না। যত দিন না সিএএ-এনআরসি প্রত্যাহার হয় তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। এটা তাঁর কাছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ পাহাড়ে সিএএ ও এনআরসি বিরোধী হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মহামিছিল শেষে একথা স্পষ্ট ঘোষণা করে দিলেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লখনউয়ের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে যে মন্তব্য করেছিলেন পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তার কড়া জবাব দিয়েছেন মা-মাটি-মানুষের নেত্রী। বলেছেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বড় বড় কথা বলছেন। সকালে এক রকম, বিকেলে আর এক রকম। নাগরিকত্ব আইনের নামে নিজেদের ইচ্ছামতো লোককে রেখে বাকিদের তাড়ানোর চেষ্টা করছে বিজেপি। উনি বলুন, ক্যা-তে কোনও একটি সম্প্রদায়ের হলে নাম বাদ দেওয়ার কথা আইনে নেই কি না। পাঁচ বছর নাগরিকত্বহীন হয়ে থাকতে হবে কি হবে না? যদি বাবা-মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে কলামটি রয়েছে কেন? কেন অসম-ত্রিপুরাকে বাদ রাখা হল? নিজেদের রাজ্য বলে?” গলার স্বর চড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তোপ দেগে প্রত্যয়ী জননেত্রীর প্রশ্ন, “আমি যদি মিথ্যা হই, তাহলে সত্যিটা কী? বলুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রমাণ করে দেখান, আমি মিথ্যা কথা বলেছি। ক্যায়া হ্যায় সচ? বলুন।” রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সুরে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, “বলুন, এনপিআর-এ বাবা-মায়ের জন্মস্থান আর তারিখ কলামটি রয়েছে কি না?”

সমতলের পর পাহাড়েও সিএএ, এনআরসি-বিরোধী জনতার প্রতিবাদী মিছিলে ভিড় উপচে পড়ে। পাহাড়ি ট্র্যাডিশনাল পোশাকে হাজার হাজার মানুষ জননেত্রীর সঙ্গে পা মেলান। মিছিল শেষের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, “দেশের হাল বেহাল। অর্থনীতিতে মন্দা, কাজ হারাচ্ছে মানুষ৷ কৃষকরা আত্মঘাতী হচ্ছেন। একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিলগ্নীকরণ করা হচ্ছে। সে সব থেকে নজর ঘোরাতেই এই ভেদাভেদের রাজনীতি। দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে।” পাহাড়ে লোকসভা ভোটে বিজেপির জয়ের বিষয় নিয়ে ইঙ্গিত করে জননেত্রী বলেন, “বিজেপি ভোটের সময় আসে। গোর্খাল্যান্ড করে দেব বলে ভোট নেয়। তারপর পালিয়ে যায়। পাহাড়ে আমরা ভোট পাইনি। কিন্তু মানুষের বিপদে আমি আছি। সেই জন্য এসেছি। ওরা অসমে এক লক্ষ গোর্খার নাম এনআরসি করে বাদ দিয়েছে। দেশের জন্য তাঁদের কতজন প্রাণ দিয়েছেন। এবার এরা বলবে, গোর্খারা নাগরিক নয়। তাঁদেরও তাড়ানো হবে। কিছুতেই নয়। আমি থাকতে কাউকে বাংলা ছেড়ে যেতে হবে না। আমি আপনাদের পাশে আছি। কেউ ভয় পাবেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকুন। এখানে কিছুই হবে না। কাউকে ভাড়াতে গেলে সবার আশে আমাকে তাড়াতে হবে। বাংলায় একটাও ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না।”

কেন্দ্র-বিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়া হাজার হাজার জনতাকে তৃণমূল নেত্রীর আরও প্রশ্ন, অসম-ত্রিপুরা-নাগাল্যান্ডে যদি না হয় দার্জিলিংয়ে কেন হবে? যে সমস্ত রাজ্য এনপিআর বৈঠকে যোগ দিয়েছিল তাদের আবার নতুন করে ভাবার জন্য আহবান জানিয়েছেন বাংলার অগ্নিকন্যা। তিনি বলেন, “এখন বলছে মোবাইল অ্যাপে নাগরিকত্ব হয়ে যাবে। ছোট বাচ্চাদের যা বৃদ্ধি আছে এদের নেই। এর চেয়ে বড় চিটিংবাজি আর নেই। ভাল লোকদের বের করে খারাপদের দেশে রাখার ষড়যন্ত্র হয়েছে।” মা-মাটি-মানুষের নেত্রীর পাশে ছিলেন দুই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিনয় তামাং, অনিত থাপা, অমর রাইরা।

দার্জিলিংয়ে প্রতিবাদী মহামিছিলে অংশে নেওয়ার একদিন আগে উত্তরবঙ্গ উৎসবেও এনপিআর ও সিএএ নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি কেন্দ্রের বিরোধিতার কারণ বাখ্যা করেন জননেত্রী। বলেন, “মানুষ কোথা থেকে বলবে বাবা-মায়ের জন্মতারিখ। আমি নিজেই তো বলতে পারব না। এখন বলা হচ্ছে, ওই কলামাটি পূরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। তা-ই যদি হয় সেটি রাখা হয়েছে কেন?” মা-মাটি-মানুষের নেত্রীর ব্যাখ্যা, পরীক্ষার খাতায় যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না, সেটিও কিন্তু ধরা হয়। উত্তর না দেওয়ার জন্য নম্বর কাটা যায়। এখানেও তো তা-ই হবে। যাঁরা তথ্য দেবেন আর যাঁরা দিতে পারবেন না, দুটো ভাগ হয়ে যাবে। যিনি কাগজ দেখাতে পারলেন না তাঁকে বাদ করে দেওয়া হবে।” জননেত্রীর সাফ কথা, “কাগজপত্র ঠিক না করা পর্যন্ত এসব কিছুই করা যাবে না। আর যতদিন না এনপিআর থেকে ওই দুটি কলাম বাদ যাচ্ছে, ততদিন আমাদের আন্দোলন জারি থাকবে। সিএএ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যাব” এনপিআর নিয়ে কার্যক্ষেত্রে প্রতিবাদী এখন তিনিই। দিল্লির বৈঠকে বাংলা ছাড়া সব রাজ্য হাজির ছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে জননেত্রী শিলিগুড়িতে উত্তরবঙ্গ উৎসবের সূচনায় সবাইকে একজোট হয়ে আইনটি বুঝে প্রতিবাদ করার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুখে এক কথা বলে সবাই বৈঠকে চলে গেল। আমি যাইনি। তবু তো একজন প্রতিবাদ করল। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। তবু আমি আবার সবাইকে বলছি ভেবে দেখার জন্য। উত্তর-পূর্বের মুখ্যমন্ত্রীদের প্রতিবাদ করতে বলব।” বস্তুত, নাগরিক আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা জননেত্রী সমতলের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের মানুষকেও আশ্বস্ত করেন। বলেন, “এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর, আমি থাকতে কিছুই হবে না। কারও কথায় কান দেবেন না।”

 

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial