প্রত্যন্ত পাথরপ্রতিমায় জনজোয়ারে ভেসে উন্নয়নযজ্ঞ জননেত্রীর

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

জলি মজুমদার

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে বাংলায়। বাড়ছে কর্মসংস্থান। দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচিতে আজ সারা দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে বাংলা। মঙ্গলবার পাথরপ্রতিমা কলেজ মাঠে জেলার একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন, শিলান্যাস ও পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠান করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা বাংলার জনগণমন অধিনায়িকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিনের অনুষ্ঠানে বুলবুল ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ বিলি-সহ একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। মুলত যে সমস্ত প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে সেগুলি হল পাথরপ্রতিমা ব্লকে শ্রীনারায়ণপুর, সাগর ব্লকে চেমাগুড়ি, ক্যানিং-২ ব্লকে মাখালতলা, সিংহেশ্বর এবং কাকদ্বীপ ব্লকে শিবকালীনগর, রামরতনপুর, হেসামাবাদ ও রামতনুনগরে নলবাহিত জল সরবরাহ প্রকল্পের উদ্বোধন। পাথরপ্রতিমা ব্লকের জেটিঘাটেরও উদ্বোধন করা হয়েছে। পাথরপ্রতিমা থেকেই জেলার বিভিন্ন ব্লকে মোট ৫২৫টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জেলার মোট ২৭টি নতুন রাস্তা এবং ৪ টি রাস্তার সংস্কারকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। ডায়মণ্ড হারবার পুরসভা এলাকায় গ্রিন সিটি উদ্যানের সৌন্দর্যায়ন এবং সংস্কারেরও উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই সমস্ত এলাকাগুলি ঘূর্ণিঝড় প্রবণ।

বাম আমলে এখানে কোনও রকম ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্র ছিল না। কিন্তু মা-মাটি-মানুষের সরকারের আমলে পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। পাথরপ্রতিমায় দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাসন্তী ব্লকে ৪টি বিদ্যালয়ে, সাগর ব্লকে ৪ টি বিদ্যালয়ে, গোসাবা ব্লকে ৩ টি বিদ্যালয়ে এবং নামখানা ব্লকে ৩টি বিদ্যালয়ে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। ফলতা ব্লকে নয়াপুকুরিয়া হাই মাদ্রাসায় এবং মথুরাপুর-২ ব্লকে কৃষ্ণচন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রাবাসের উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিনের সভামঞ্চ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা ও জেলার বাইরের ৮১টি প্রকল্পের শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্পগুলির রূপায়ণের জন্য ব্যয় হবে ৫৪০ কোটি টাকা। এই সমস্ত প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে বাংলার মানচিত্রে পাথরপ্রতিমার চেহারাই বদলে যাবে। এলাকার সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন, বিগত কোনও সরকার তাদের জন্য এত কাজ করেনি। বিদ্যুৎ সংযোগের সমস্যা মেটাতে পাথরপ্রতিমা ব্লকের রামগঙ্গায় এবং বজবজ-১ ব্লকের বিড়লাপুরে ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস সাবস্টেশনে প্রকল্পের শিল্যানাস করা হয়েছে। ডায়মন্ডহারবার ক্রিক খালের উপর লালপোল ব্রিজ প্রকল্পের শিলান্যাস করা হয়েছে। ডায়মন্ডহারবারে হুগলী নদীর বামপাড়ের বাঁধ এবং সিপিটি জেটির কাছে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক সংস্কারের কাজের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি মেনে সেই কাজেরও শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন ব্লকে ১৫৫০ টি অঙ্গণওয়াড়ি কেন্দ্রকে শিশু আলয়ে উন্নীতকরণের কাজের শিলান্যাসও করা হয়েছে এদিন।

সাগর ব্লকে বকখালি সমুদ্র সৈকতে এবং গঙ্গাসাগরে উপকূলীয় পিএস ক্যাম্পাসে একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাথরপ্রতিমার এই সভা থেকেই ৬২ জনের হাতে নানান পরিষেবা সামগ্রী ও চেক তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে ছিল কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজসাথীর সাইকেল বিলি, সবুজশ্রীর চারাগাছ বিলি, কৃষি সরঞ্জাম প্রদান, আমার বাড়ি প্রকল্পের চেক, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাক্স-সহ সাইকেল ও লোকশিল্পীদের বাদ্যযন্ত্র। সব মিলিয়ে জেলার মোট আড়াই লক্ষ মানুষের হাতে নানান পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজারের বেশি মানুষের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিট তুলে দেওয়া হয়। বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ মুখ্যমন্ত্রী হাত থেকে কিট নিয়ে জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের জন্য যা করেছেন তা গত চৌত্রিশ বছরেও কেউ করেনি। বুলবুল ঘূর্ণিঝড়ে অনেকেরই বাড়ি ভেঙে গিয়েছে। জীবনধারার শেষ সংস্থান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সে কারণেই তাদের এই কিট প্রদান। যে কিটের মধ্যে রয়েছে স্টোভ, কড়াই, হাঁড়ি, জামাকাপড় ও শুকনো খাবার। এদিনের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, “এই সরকার মা-মাটি মানুষের সরকার। বুলবুল ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত মানুষের কাছে ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে এই কাজ চলবে। কোনও মানুষের অসুবিধা থাকলে সরকার সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াবে। কারণ, এই সরকার মানবিক সরকার।”

এদিন পাথরপ্রতিমা কলেজ মাঠে এই অনুষ্ঠানে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা, গিয়াসুদ্দিন মোল্লা, সাংসদ চৌধুরিমোহন জাটুয়া, প্রতিমা মণ্ডল, বিধায়ক গোবিন্দ চন্দ্র নস্কর, সমীরকুমার জানা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই রয়েছেন পাথরপ্রতিমার আপামর মানুষ। সভায় হাজার হাজার মানুষের ঢলই তা বলে দিচ্ছিল। কাছের মানুষ ‘দিদি’কে একবার চোখে দেখার জন্য হেলিপ্যাডে হাজার হাজার মানুষ এসেছিলেন দূরদূরান্ত থেকে। শুধু সভার মাঠে নয়, সভাস্থলের বাইরেও হাজার হাজার মানুষ মমতাকে দেখার জন্য আকুল ছিলেন। মহিলারা শাঁখ বাজিয়ে, উলুধ্বনি দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বাগত জানান। মানুষের ভিড় দেখে মমতাও উজ্জীবিত হন। বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতির কথা বলতে গিয়ে এখানকার মানুষদের সহনশীলতা নিয়ে প্রশংসা করে মমতা বলেন, “এখানকার মানুষ অনেক কষ্ট করে থাকেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও ওঁরা মনোবল হারাননি। বুলবুল ঝড়ে যেন কোনও মানুষের ক্ষতি না হয়। তা নিয়ে সজাগ ছিল রাজ্য সরকার। ঘূর্ণিঝড় থেকে মানুষকে বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে তুলে আনা হয়েছিল। বুলবুলের সময় আপনারা রাত জেগেছেন। আর আমি কলকাতায় রাত জেগেছি। চব্বিশ ঘণ্টা দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। তাদের খবর নিয়েছি।” কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য সাংসদ কোটার ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এ ছাড়া স্থানীয় সাংসদ চৌধুরিমোহন জাটুয়ার তহবিল থেকে ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কলেজের মাঠে একটি স্টেডিয়াম তৈরির কথা ঘোষণা করেছেন মমতা। সাধারণ মানুষকে অভয় দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে এনপিআর-এনআরসি-সিএএ কার্যকর করার চেষ্টা মানা হবে না। সেই জন্য যত দূর আন্দোলন হওয়ার, তা হবে। নাগরিকত্বের বিষয়ে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “আমি রাজ্যের জনগণের পাহারাদার। আমার সেই অধিকার কাড়তে এলে আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে হাঁটতে হবে। সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নেবে, আর আমরা ললিপপ খাব, এটা হবে না।”

 

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial