জেএনইউঃ গণতন্ত্রের হত্যাকারী বিজেপি

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

তীর্থ রায়

দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিজেপি কীভাবে ভেঙে ফেলতে চাইছে, তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায়। মেয়েদের হোস্টেলে মুখোশধারী একদল গুন্ডাকে পাঠিয়ে দেশের রাজধানীর বুকে বিজেপি যে নৃশংস ঘটনা ঘটাল, তার নজির স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে নেই। বিজেপির মুখোশধারী গুন্ডারা যেভাবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের রক্তে ভেজাল, তা নিন্দা করার কোনও ভাষা নেই। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে শুধু গোটা দেশ নয়, গর্জে উঠেছে দেশের বাইরে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষক। দেশের জননেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সঠিকভাবেই এই ঘটনাকে ‘ফ্যাসিস্ট সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বিজেপির উত্থানের মধ্য দিয়ে যে ফ্যাসিস্ট শক্তির পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তা এর আগেও বহুবার জননেত্রী উল্লেখ করেছেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর এখন গোটা পৃথিবীর কাছেই স্পষ্ট যে, বিজেপি একটি ফ্যাসিস্ট শক্তি ছাড়া কিছু নয়। সাম্প্রদায়িকতাকে হাতিয়ার করে তারা দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন করতে চায়। ধর্মের ভিত্তিতে দেশে মেরুকরণ আনতে চায় এবং সবশেষে ক্ষমতায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তারা গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণ ধংস করে দিতে চায়। ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হয় গণতন্ত্র। গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য তারা হিংসার পথ নিতে পিছপা হয় না। এটাই ফ্যাসিবাদের চরিত্র। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তাঁর দেশের ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে দেশ নাৎসিবাদের দিকে চলেছে।

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। তাঁর এই উপলব্ধিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর যেভাবে গোটা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে গোটা দেশ ক্ষোভে ফুঁসছে। মাত্র ছ’মাস আগে যে সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হয়েছে, তার বিরুদ্ধেই এইভাবে গোটা দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আসলে গোটা দেশজুড়ে মানুষ মনে করছে, এই সরকারকে যদি চলতে দেওয়া হয়, তাহালে গণতন্ত্রের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই সংসদীয় গণতন্ত্রের মুখোশ পরে বাজারে নেমেছেন। যে মুখোশধারী গুন্ডারা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে ঢুকে হামলা চালিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই এক একজন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ। এরা চাইছে বাহুবলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশ শাসন করতে। যেভাবে হিটলার, মুসোলিনিরা ক্ষমতা দখল করেছিল, ঠিক একই পথে হাঁটছে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা। আসলে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের দর্শনে অনুপ্রাণিত আরএসএস। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ হলেন এই আরএসএসের প্রচারক । এই আরএসএসেরই কর্মী ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে। ফলে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের কীর্তিকলাপ আমাদের প্রতি মুহূর্তে নাথুরাম গডসের স্মৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে।

ভারতবর্ষ বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের দেশ। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের পবিত্র মাটিতে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ এসে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ফলে এই ভারতের ঐক্য রক্ষা করতে গেলে বহুত্ববাদকে গুরুত্ব দিতেই হবে। ভারতে কখনও কোনও একটি ধর্মের, কোনও একটি সংস্কৃতির, কোনও একটি ভাষার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। সেটা যদি হয়, তাহলে ভারতের বহুত্ববাদের আদর্শকে ভেঙে ফেলতে হয়। বহুত্ববাদ যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ভারতও টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। ভারতবর্ষের এই গণতন্ত্রের কোনও অস্তিত্ব ও অর্থ থাকবে না। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা সেইরকম একটি ভারতবর্ষেরই স্বপ্ন দেখেন। যেখানে কর্তৃত্ব করবে একটি ধর্ম, একটি সংস্কৃতি, একটি ভাষা।

যদি এই দেশকে বাঁচাতে হয়, যদি আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক সুসভ্য সমাজে বাস করব, তাহলে গণতন্ত্রকে ভেঙে ফেলার, দেশের বহুত্ববাদকে ধ্বংস করে ফেলার এই অশুভ শক্তিকে আমাদের পরাস্ত করতেই হবে। দেশের ছাত্রসমাজ আজ তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারছেন গণতন্ত্র বিপন্ন ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ। তারাই আগামিদিনের নেতৃত্ব। আজ ছাত্ররা সেই কারণে গোটা দেশজুড়ে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। তবে দেশের এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে একেবারে প্রথমদিন থেকে যিনি সরব ছিলেন, তিনি হলেন দেশের জননেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রতিটি মুহূর্তে দেশবাসীকে সতর্ক করে গিয়েছেন এই স্বৈরাচারী ও বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে। নরেন্দ্র মোদি যখন রাতের অন্ধকারে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে নোটবন্দি করেছেন তখন সবার আগে যিনি সরব হয়েছিলেন, তার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নরেন্দ্র মোদি নোট বাতিলের কথা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তিনি যখন নোটবন্দির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, তখন দেশের বহু অর্থনীতিবিদই সরকারের এই পদক্ষেপের ভয়াবহ ক্ষতির দিকটি বুঝে উঠতে পারেননি। পরবর্তীকালে দেশের নাগরিক মানুষ বুঝেছেন নোটবন্দি দেশের জীবনে কীভাবে বিপর্যয় নামিয়ে আনল।

একইভাবে নরেন্দ্র মোদি যখন মধ্যরাতে দেশের সংসদ ডেকে জিএসটি চালু করেছিলেন, তখনও সবার আগে সরব হয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিনও তিনি বলেছিলেন, হুড়োহুড়ি করে এইভাবে জিএসটি চালু করা বিরাট বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বেন ছোট ছোট ব্যবসারীরা। এখন গোটা দেশ উপলব্ধি করছে, কতটা সত্যি কথা বলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। একইভাবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সরব হয়েছেন ৩৭০ ধারা বিলোপের বিরুদ্ধে ও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাসের বিরুদ্ধে। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা যেদিন এনআরসির কথা বলেছিলেন, সেদিন সরব হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হওয়ার পর যখন দেখা গেল লক্ষ লক্ষ বাঙালির নাম বাদ গিয়েছে, তখন তার বিরুদ্ধে পথে নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ গোটা দেশ বুঝতে পারছে এনআরসি কী ভয়ংকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই বিভেদকামী শক্তির কাছে। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা সংশোধিত নাগরিত্ব আইন ও এনআরসিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে দেশকে আবার ভাঙতে চাইছে। আজ বিজেপির বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে আন্দোলনের এক এবং একমাত্র মুখ হল জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই কারণে বিজেপির নিশানা আজ তৃণমূল ও বাংলা। কিন্তু গোটা দেশ আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গণতন্ত্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য গোটা দেশ আজ শপথ গ্রহণ করছে। বিভিন্ন রাজ্যের নেতারা জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি দিয়ে তাঁর আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন। জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে গেলে, দেশকে বাঁচাতে গেলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহদের দ্রুত ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। এঁদের ক্ষমতাচ্যুত না করতে পারলে দেশকে রক্ষা করা যাবে না। গণতন্ত্রকে তো বাঁচানোই যাবে না। তাই জননেত্রীর ডাককে সামনে রেখে আজ সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে হবে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial