পাহাড়ে মিলল গণউচ্ছ্বাসে

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

কর্মবীর দাসশর্মা

জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে আরও একবার আমজনতার উচ্ছ্বাসে মাতল পাহাড়। সিএএ-এনআরসি-এনপিআর ইস্যুতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল দার্জিলিং। মা-মাটি-মানুষের নেত্রীকে ঘিরে গেরুয়া শিবির বিরোধী ঝাঁজ আছড়ে পড়ল পাইন, অর্কিড ও রড়োডেনড্রনের ফাঁকে ফাঁকে। মিছিলের পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে পাহাড়ি জনতার সেই ক্ষোভের উত্তাপ উপলব্ধি করলেন জননেত্রী। বস্তুত এই কারণে জনতাকে প্রথমেই নেপালি ভাষায় সম্বোধন করতে উচ্ছ্বাসে-আবেগে ফেটে পড়েছেন সমবেত হাজার হাজার পাহাড়ি জনতা। জনতাকে কুর্নিশ জানিয়ে জননেত্রী বলেছেন, “গোর্খারা দেশের সম্পদ । ভারতমাতার বীর সন্তান তাঁরা। এবার ভেটে জিততে বা ভোট চাইতে আসিনি। গোর্খাল্যান্ডের জিগির তুলে কেউ কেউ ভোটে জিতে পালিয়ে যায়। বিপদের সময় তাদের আর দেখা মেলে না। নাগরিকত্ব ইস্যুতে আজ আপনাদের খুব বিপদ। তাই পাশে দাঁড়াতে ছুটে এসেছি। কেউ তথ্য চাইতে এলে দেবেন না। জানবেন, আমি যতদিন আছি ততদিন এখান থেকে কাউকে বিতাড়িত হতে হবে না।”

নেত্রীর সঙ্গে পা মেলালেন ভামাং-লেপচা-ভুটিয়া-লামা-গুরুং-ছেত্রী-সহ পনেরোটি পাহাড়ি জনজাতির বিশিষ্টরা। দার্জিলিংয়ে সিএএ-বিরোধী আবেগ আর উচ্ছাসের বিরুদ্ধে দেশনেত্রী মমতাকে ঘিরে প্রতিবাদী জনতার স্রোত আছড়ে পড়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘার নিচের নানা উপত্যকায়। আর এই প্রতিবাদী জনতার জোয়ার আছড়ে পড়েছে যখন নেত্রীকে সামনে থেকে পাহাড়ি পথে হেঁটে যেতে দেখেছেন। বিশেষ করে নেত্রীর পাশে সেই সময় হাঁটতে দেখা গিয়েছে পাহাড়ের বিভিন্ন উপত্যকা থেকে প্রতিবাদী মিছিলে যোগ দেওয়া সাধারণ ঘরের মা-বোনেদের। রেললাইনের ধার ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়িয়া বাসিন্দারা প্রত্যেকেই মা-মাটি-মানুষের নেত্রীকে হাতের কাছে পেয়ে ভালবাসার নিদর্শন হিসাবে তুলে দিয়েছেন নিজের বারান্দার টবে ফোটা রডোডেনড্রন ফুলের গুচ্ছ। উল্টোদিকে নেত্রী সবাইকে ভরসা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি থাকতে কারও কোনও ভয় নেই। যতদিন তিনি বাংলার দায়িত্বে থাকবেন, ততদিন শুধু গোর্খা নয়, পাহাড়ের সমস্ত জনজাতির পাহারাদার হয়ে আছেন। মিছিল যত এগিয়েছে ততই দীর্ঘতায় যেমন বেড়েছে তেমনই অংশগ্রহণকারী প্রতিবাদী জনতার সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে গিয়েছে। আসলে এর আগে অনেক মিছিল গত তিন দশকে পাহাড় দেখেছে। তার অধিকাংশই ছিল রাজনৈতিক মিছিল, দলীয় স্বার্থের কথা মেশানো ছিল সেই সমস্ত মিছিলে। কিন্তু মিছিলের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, পাহাড়বাসী পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন, জননেত্রীর এই মিছিল আসলে ভরসা দেওয়ার জনস্রোত। ঐতিহাসিক মিছিলের প্রতিবাদ ধ্বনি কাটল কনকনে ঠান্ডাও। মিছিলে হাঁটলেন আট থেকে আশি। ভানুভবন থেকে রেলস্টেশন হয়ে মিছিল যত এগিয়েছে ততই ভিড় বেড়েছে। যখন দার্জিলিঙে মিছিল শেষ হচ্ছে, তখনও শেষ রয়েছে দু’কিলোমিটার দূরে। দার্জিলিং তো বটেই, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে মানুষ এদিন অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মিছিলে পা মেলান। যাঁরা যোগ দিতে পারেননি, তাঁরাও রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থেকে টানা উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন।

ভানু ভবন থেকে যখন মিছিল বের হল তখন বোঝার উপায় নেই কে মোর্চা, কে তৃণমূল কিংবা মোর্চা-তৃণমূল জোটের বিরোধী হিসেবে পরিচিত জিএনএলএফ কিংবা অন্য স্থানীয় দল। সব রাজনৈতিক দল থেকেই প্রচুর মানুষ শুধুমাত্র অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পা মেলালেন। দার্জিলিংয়ের বিশপ ও বিভিন্ন সামাজিক সাংগঠনিক সদস্যরা ছিলেন ওই মহামিছিলে। অসমের দেড় লক্ষ গোর্খা জনজাতির নাম এনআরসি-তে বাদ পড়েছে। ফলে এখন রাজনীতির সময় নয়, গোর্খা জনজাতির সত্তার লড়াই। মিছিলে পা মেলান রাজ্যের তথা ও সংস্কৃতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, রাজ্যের ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ এবং পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সভাপতি বিনয় তামাং, জিটিএ বোর্ডের চেয়ারম্যান অনিত থাপা, প্রাক্তন বিধায়ক অমর সিংরাই-সহ পাহাড় তৃণমূল এবং মোর্চার সদস্য সমর্থকরা। সেই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক অরাজনৈতিক মানুষ পা মিলিয়ে প্রতিবাদ ধ্বনি তুলেছেন। মিছিল শুরু হয় ভানুভবনের সামনে থেকে। এরপর চৌরাস্তা, সার্কিট হাউস, রেলস্টেশন হয়ে গোয়েঙ্কা রোড ধরে চকবাজার থেকে মোটর স্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে হাজির ছিলেন পনেরোটি জনজাতির উন্নয়ন বোর্ডের সদস্যরা। তাঁদের গলায় ছিল নাগরিকত্ব আইন বিরোধী সুর। এছাড়াও যাঁরা হেঁটেছেন তাঁদের প্রত্যেকের বুকে নো এনআরসি, নো সিএএ স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল। অনেকেই ড্রা-বিউগল বাজিয়ে গোটা রাস্তা পরিক্রমা করেন। শুরুতে ভানুভবনের সামনে মঞ্চ থেকে শপথবাক্য পাঠ করান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে গলা মেলায় প্রায় গোটা দার্জিলিং পাহাড়। সকাল থেকেই ছিল ঝকঝকে আকাশ। প্রকৃতিও যেন মিছিলকে সফল করতে সঙ্গ দিয়েছে। পাহাড়ে পর্যটক কম থাকলেও মুখ্যমন্ত্রীর মিছিলকে ঘিরে ছিল জনজোয়ার। জননেত্রীকে সমর্থন জানিয়ে বিজেপির বিরোধিতা করে পথে নেমেছিলেন পাহাড়ের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।

 

 

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial