কমিউনিস্ট পার্টির ফের দ্বিচারিতা কংগ্রেস সিপিএম এর চক্রান্ত ব্যর্থ হবে

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

ভারতবর্ষের দশটি বাম ও কংগ্রেস সমর্থিত এবং নির্দল ট্রেড ইউনিয়ন গত ৮ জানুয়ারি ২০২০ দেশে ধর্মঘটের ডাক দেয়। যে বিষয়গুলিকে সামনে রেখে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে সেগুলি হল- এনআরসি, সিএএ, এনপিআর-সহ আর্থিক ও সামাজিক কিছু দাবি। যে দাবিগুলি নিয়ে এই ধর্মঘট তার বিরোধিতা তৃণমূল কংগ্রেস করেনি কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে সেইভাবেই আন্দোলন হোক কিন্তু বনধ বা ধর্মঘট তিনি মানবেন না। বনধ বা ধর্মঘট মানুষের কল্যাণ করে না এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যা পশ্চিমবাংলার মানুষ হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে ঘোষণা করেছিলেন যে, বামফ্রন্ট ষাটের দশক থেকে বনধের বন্ধ্যা রাজনীতি শুরু করার ফলে পশ্চিমবাংলায় এক অশান্ত রাজনীতি সৃষ্টি হয় যার পরিণতিতে বাংলায় একে একে বড় বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেক শিল্প বাংলা ছেড়ে অন্য রাজ্য গিয়ে শিল্প স্থাপন করে ফলে পশ্চিমবাংলার অর্থনীতি চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বাংলায় বামফ্রন্ট স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় আসে ১৯৭৭ সালে।

মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি মনে করতে শুরু করে বিপ্লব আসন্ন। ক্ষমতায় এসেও বিরোধী রাজনীতি করার মানসিকতা বদলাতে পারেনি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। ওদের প্রথম লক্ষ্য হয় বিরোধীদের ওপর অত্যাচার করে দলত্যাগ করতে বাধ্য করা। শুরু হয় চাষের জমিতে লাল পতাকা পুঁতে দখল নেওয়া, পুকুরে বিষ দিয়ে মাছ মেরে দেওয়া, বর্গা রেকর্ড করিয়ে আইনানুগ কাগজটি দলীয় দফতরে রেখে ওদের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা। খুন, জখম, জমি দখল, পরিকল্পিত ডাকাতি, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং কলেজ-স্কুল- বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিয়ন দখল গায়ের জোরে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে। স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতিতে দলীয় লোক নিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলিতে অযোগ্য পার্টি কর্মীদের নিয়োগ, বন্দুকবাজদের দিয়ে নির্বাচনে বুথ দখল-সহ অসংখ্য নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিরোধী শক্তির কষ্ঠ রোধ করা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। কমিউনিস্টদের ইতিহাস কিন্তু এই অত্যাচারের কথাই বলে। রাশিয়া, চিন-সহ বিশ্বের কমিউনিস্টরা নিপীড়ন ও স্বেচ্ছাচারিতার পথ বেছে নেয়। রাশিয়ায় কমরেড স্টালিন ৩০ বছর ক্ষমতায় থেকে কোটি কোটি মানুষের হত্যা করে।

স্বৈরাচারী সেই শাসন ব্যবস্থায় সমস্ত নাগরিকের সব ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়। প্রতিবাদ করলে হয় মৃত্যু, না হয় নির্বাসন। কমিউনিস্টদের অত্যাচার বিশ্বের স্বৈরাচারীদের থেকেও নির্মম। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে চিনের তিয়েন-আন-মেন স্কোয়্যারে মানুষ জমায়েত হয়ে দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করার আহ্বান জানায়। কমিউনিস্ট শাসকরা স্টেনগান ও কামান চালিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-যুবকে হত্যা করে এবং যারা পালিয়ে গিয়েছিল তাদের গ্রেফতার করে আজও বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীতে কমিউনিস্টদের অত্যাচার বিশ্বের স্বৈরাচারী আমিনকেও ছাড়িয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনওদিন ভুলবে না ২১ জুলাই রায়না, মঙ্গলকোট, সৃচপুর, বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, কাঁকসা, নবগ্রামের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড, অগ্নি সংযোগ ও লুঠের কথা। ১৯৭৮ সালের মরিচঝাঁপির ঘটনা ও আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনার কথা মনে হলে মানুষ শিউরে ওঠে। ২০১১ সালের পর থেকে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ক্রমশ শক্তিহীন হয়ে পড়ে যদিও এর আগেই পঞ্চায়েত নির্বাচনে তারা জমি হারিয়েছিল। ২০১৬ সালে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি একেবারেই শক্তিহীন হয়ে পড়ে এবং তৃণমূল কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এককভাবে ২১১টি আসন দখল করে যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে।

পশ্চিমবাংলায় মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির অত্যাচারের সঙ্গে বিশ্ব ইতিহাসে কমিউনিস্টদের দ্বিচারিতার কিছু ঘটনার উল্লেখ করতে চাই আজকের প্রজন্মের ছাত্র-যুবদের জন্য। ভারতবর্ষের কমিউনিস্টরা সোভিয়েত দেশ ভেঙে যাওয়ার আগে কর্মপন্থা স্থির করত। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা বিচার না করে সোভিয়েত ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে ও নির্দেশে পরিচালিত হত। ১৯২২ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে ভ্লাদিমির লেলিন মনে করেছিলেন বুর্জোয়া আন্দোলনের সঙ্গেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে হবে যদি সেই আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হয়। যদিও কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক এম এন রায় এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একক শক্তিতে সংগ্রাম করে বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করার পক্ষে মত দেন। লেনিন ও এম এন রায় যে সিদ্ধান্তের কথা বলেছিলেন সেটি ছিল নীতি-নির্ভর, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না।

১৯৩০ সালে সোভিয়েতের সরকারি মুখপত্র প্রাভদা পত্রিকায় “Platform of action of the Communist Party of India”শিরোনামে প্রবন্ধে লেখা হয়েছিল “The most harmful and dengerous obstacle to the Victory of Indian Revolution is the agitation carried on by the left elements of National Congress led by Jaharal Nehru, Subhas Chandra Bose, Joyprakash narayan, Ginawala and others.”

কমিউনিস্টরা ষষ্ঠ আন্তর্জাতিকের পরেই ১৯৩২ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কমিউনিস্টরা ১৯৩২ সালে স্বাধীনতা আন্দোলন বয়কট করেও নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ভাঙার চেষ্টা শুরু করে। আবার ১৯৩৫ সালে সপ্তম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক-এ ভারতের কমিউনিস্টদের সম্পর্কে চিনের কমিউনিস্ট নেতা ওয়াং মিং বলেছিলেন যে, “Our Comrades in India have suffered for a long time from left sectorian errors. They didnot percipitate in all the mass demonstration affitiated with it. Therefore the India Communist Party were to a considerable extent isolated from mass.”

এর পরেই কমিউনিস্টরা আবার জাতীয় কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি, নিখিল ভারত কিষান সভা, নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ানের ডাকে আন্দোলনে যোগদান করে। কমিউনিস্টরা ভারতের স্বাধীনতার লড়াই থেকেও চিন ও রাশিয়ার আজ্ঞাবহ দাস হিসাবেই কাজ করতে তৎপর ছিল। ১৯৪১ সালের ২১ জুন জার্মানি সোভিয়েত আক্রমণ করার পর কমিউনিস্টদের তত্ত্ব পাল্টে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ আর হয়ে গেল “জনযুদ্ধ”। ভারতের কমিউনিস্ট নেতা সি পি যোশী তাঁর দলের পক্ষে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব রেজিল্যান্ড ম্যাকসওয়েলকে যুদ্ধে সর্বাত্মক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয় যেহেতু ব্রিটিশ ছিল সোভিয়েতের মিত্রশক্তি। ভারতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সবচেয়ে বড় সংগঠন ছিল জাতীয় কংগ্রেস কিন্তু কংগ্রেসের ডাকা সেদিনের ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শামিল হয়নি। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশদের তৈরি মন্বন্তরে বাংলায় যখন হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে তখন ব্রিটিশ প্রভুদের তল্পিবাহকদের কাজ করছে ভারতের কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্টদের মতো দ্বিচারিতা বিশ্বে কোনও রাজনৈতিক দলের চরিত্রে নেই।

তিনটি ঘটনা প্রমাণ করে কমিউনিস্টরা কী নির্লজ্জভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে সহযোগিতা করেছিল। ১) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ চেয়েছিল ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে। সেই কুচক্রে মদত দিয়েছিল তৎকালীন কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ডঃ জি অধিকারী এবং সাজ্জাত জহির, যাঁরা সেদিন পাকিস্থান গঠনের দাবিকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ২) ১৯৪৭ সালে সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর ভারতবর্ষ যেদিন স্বাধীন হয়েছিল তখন কমিউনিস্ট পার্টি বলেছিল, “এ আজাদি ঝুটা হ্যায়”। ৩) ১৯৬২ সালে চিন যখন ভারত আক্রমণ করে তখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বলেছিল চিন নয়, ভারতবর্ষই চিন আক্রমণ করেছে। কমিউনিস্টদের বিশ্বাসঘাতকতা, দ্বিচারিতা ও অমানবিক হিংস্রতা ভারতবর্ষের মানুষ কোনওদিন ভুলবে না। আজ কমিউনিস্টরা সংবিধান নিয়ে অনেক কথা বলছেন কিন্তু কেরালায় ক্ষমতায় এসে ওরা বলেছিল “We want to crash the Constitution from within,” রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সভাষচন্দ্র. গান্ধীজি-সহ দেশবরেণ্য নেতাদের কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেছিল।

কমিউনিস্টদের সাম্প্রতিক অতীতে এক চরম দ্বিচারিতা আমরা দেখেছি। তা হল, ১৯৮৮ সালে ২ জুলাই শহিদ মিনার ময়দানে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী ও মাঃ কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু একই মঞ্চে সভা করেছিলেন। বিজেপি নেতাকে প্রথম বাংলায় বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। আজ পশ্চিমবাংলায় মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি যখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে তখন চিরশক্র কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পশ্চিম বাংলাকে অশান্ত করার জন্য ধ্বংসাত্মক আন্দোলন করছে।পশ্চিমবাংলায় মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দ্রুত পশ্চিমবাংলার উন্নয়ন করে দেশে নজির গড়ছেন তখন NRC, CAA বিরোধী আন্দোলনের নামে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক আন্দোলন করে বাংলাকে অশান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন যাতে উন্নয়নকে স্তব্ধ করা যায়। বাংলার মানুষ সিপিএমের এই হিংসাত্মক আন্দোলন, দ্বিচারিতা এবং নীতিহীনতা বরদাস্ত করবে না।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial