Snapshot

ভেদাভেদের রাজনীতি রুখতে দেশকে পথ দেখাবে এই রাজ্যের মা-মাটি-মানুষ, বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

তীর্থ রায়

বাংলায় দীর্ঘ এক মাসের উৎসবের মরশুম শেষের পথে৷ বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার শ্লোগান দিয়েছিলেন, ‘ধর্ম যাঁর যাঁর নিজের, কিন্তু উৎসব সবার৷” গত এক মাসে যেভাবে রাজ্যবাসী শান্তিতে উৎসব উদযাপন করলেন, তাতে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া শ্লোগানের যথার্থতা আরও একবার প্রমাণিত হল৷ গোটা এক মাস বাংলার বিভিন্ন ধর্মের, সম্প্রদায়ের ও সংস্কৃতির মানুষ যেভাবে এক হয়ে উৎসব পালন করলেন, তা থেকে এটাও স্পষ্ট হল যে এই সম্প্রীতির বন্ধন চিরকালের জন্য অটুট৷ যে যতই চক্রান্ত করুক এই সম্প্রীতির বন্ধনকে কেউ ভাঙতে পারবে ন৷

উৎসবের মরশুমে রাজ্যবাসীর এই সম্প্রীতির বন্ধনকে ভাঙার চক্রান্ত যে ছিল না তা নয়৷ কিন্তু চক্রান্তকারীদের বাংলার মানুষই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। উৎসবের মরশুম শুরু হওয়ার আগে রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে যে ডাক দিয়েছিলেন তা মানুষ অক্ষরে অক্ষরে রূপায়িত করেছে৷ গত এক মাস ধরে বাংলার সমস্ত মানুষ, ধর্ম-সম্প্রদায়-ভাষা-বর্ণনির্বিশেষে যেভাবে মেতে উঠেছিলেন তা এক কথায় নজিরবিহীন। মানুষের এই ঐক্য, এই সম্প্রীতি পৃথিবীর আর কোথাও হয়তো চোখে পড়বে না৷

দেশে এখন মাথাচাড়া দিয়েছে একটা বিভেদের শক্তি। তারা বিভিন্ন অঞ্চলে, এলাকায় মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করতে সদাসর্বদা সক্রিয় ও সচেষ্ট। এই বিভেদের শক্তি মাথা গলানোর চেষ্টা করছে সম্পীতির বাংলাতেও৷ এদের একমাত্র উদ্দেশ্য হল বাংলায় বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের যে ঐক্য তাকে যেনতেনপ্রকারে টুকরো টুকরো করে দেওয়া৷ বিভেদের এই শক্তি সবসময় নিশানা করে উৎসবের মরশুমকে। যে কোনও একটা ছোট ঘটনা থেকে তারা উসকানি দেয় ও প্ররোচনা দেয় মানুষের ঐক্যকে ভাঙার জন্য৷ বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবসময় রাজ্যবাসীকে এই বিভেদের শক্তির বিরুদ্ধে সচেতন করে এসেছে৷ তিনি উৎসবের অনেক আগে থেকেই মানুষকে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে বলেছিলেন৷

উৎসবের এই মরশুমে বিভেদের এই অশুভ শক্তি যাতে কোনওভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তারজন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি প্রশাসনকে সর্বদা সতর্ক রেখেছিলেন৷ তাঁর মন্ত্রীদের ও জনপ্রতিনিধিদের মুখ্যমন্ত্রী তথা বাংলার জননেত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন উৎসবের মরশুমে নিজের নিজের এলাকায় পড়ে থাকার জন্য৷ দলের নেত্রী হিসাবে তৃণমূলের সমস্ত নেতা ও কর্মীকেও তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন উৎসবের মরশুমে নিজের নিজের এলাকায় পড়ে থেকে শান্তি ও উৎসবের বাতাবরণ রক্ষা করার জন্য। দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে দলের নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন৷ পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা এখন দশ কোটিরও বেশি৷

এই উৎসবের সময় বাইরে থেকেও আরও অসংখ্য মানুষ রাজ্যে আসেন৷ সব মিলিয়ে কোটি কোটি মানুষের এই উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের অসংখ্য নেতা-কর্মী ঝাঁপিয়ে না পড়লে কোটি কোটি মানুষের উৎসবকে একশো শতাংশ শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর রাখাও হয়তো সম্ভব হত না৷ গোটা রাজ্যজুড়ে অসংখ্য গ্রাম, শহর ও পাড়ায় এই এত বড় উৎসবযজ্ঞে কোথাও সামান্যতম শান্তি বিঘ্নিত হয়নি৷ কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও কোথাও মারামারি, কাটাকাটির ঘটনা ঘটেনি৷ গোটা পৃথিবীর দিকে তাকালেই এই এক অতি বিরল ঘটনা ৷ দেশে-দেশে এখন অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতার কালো মেঘ।

সর্বত্র মানুষ নিজেকে একদিকে যেমন খোলসবন্দি করে ফেলছে, তেমন নিজের প্রতিবেশী, সহকর্মী ও সহনাগরিকদের সম্পর্কে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে৷ এই অস্থির সময় দশ-এগারো কোটি মানুষের একটি উৎসবকে সম্প্রীতির মেলবন্ধনের ও ভালবাসার মোড়কে মুড়ে রাখা কখনওই সহজ কাজ হতে পারে না৷ বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টাতেই ও নেতৃত্বেই এই কঠিন কাজ এত সহজ হয়ে উঠেছে৷ বাংলার কোটি কোটি মানুষ যেভাবে গত এক মাস ধরে উৎসবে মাতলেন, তা পৃথিবীর কোথাও কখনও সম্ভব হতে দেখা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রীর এই উৎসবের কার্নিভালে এবার বহু বিদেশি এসেও অংশ নিয়েছিলেন৷ ভিনদেশীরা বাংলার এই কার্নিভাল দেখে শুধু অভিভূতই নন, আনন্দে আপ্পুত৷

দুর্গাপুজোকে ঘিরে এই উৎসবে বাংলায় ভিনদেশীরা যেমন অংশ নেন, তেমন ভিন ধর্মের মানুষও অংশ নেন৷ ফলে এই উৎসব কখনওই কোনও ধর্মের বেড়াজালে ও গণ্ডিতে আটকে থাকে না৷ এই অর্থে বাংলার শারদোৎসব এই বিশ্বজনীন, শাশ্বত উৎসবের মর্যাদা পেয়ে গিয়েছে৷ এই মর্যাদাকে কেউ কোনওদিন খাটো করতে পারবে না৷ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উৎসব ও কার্নিভালের মরশুম রয়েছে৷ বড়দিনকে ঘিরে প্রবল শীত উপেক্ষা করেও ইউরোপ ও আমেরিকায় মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন৷ নিজস্ব কার্নিভাল রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলিতেও৷ কিছু জনসংখ্যার নিরিখে, উৎসবের ব্যাপ্তিতে বাংলার কার্নিভাল সকলকে ছাপিয়ে যায়।

পৃথিবীর আর কোনও কার্নিভালে এত সংখ্যক মানুষ অংশ নেন না৷ পালাবদলের পর রাজ্যে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ গুরু হয়েছে৷ পৃথিবীর মানুষের কাছে বাংলার মুখশ্রী আজকে বদলে গিয়েছে৷ এক নতুন বাংলা গোটা পৃথিবীর সামনে হয়েছে৷ এই উন্নয়নের বাংলা, অগ্রগতির বাংলা তার সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে না যদি না তার অনুষঙ্গে উৎসব না থাকে। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী খুব সঠিকভাবেই বলেছেন মানুষকে উৎসব করতে দিতে হবে৷ মানুষকে আনন্দ করতে দিতে হবে৷ মানুষকে মিশতে দিতে হবে৷ উৎসব না করে মানুষ ঘরে বসে কাঁদবে, এ জিনিস আজকে বাংলায় কেউ কল্পনাও করে না৷ সিপিএম হার্মাদদের এই বাংলা ছিল ভয়ের বাংলা।

যেখানে কোটি কোটি গ্রামের মানুষ সব সময়ে হার্মাদদের ভয়ে গুটিয়ে থাকত৷ এই বাংলায় কারও মনে তখন অনাবিল আনন্দ ছিল না। দেখা যেত না কারও মুখে নির্মল হাসিও৷ বাংলার সেই ভয়ের দিন আজ অতীত৷ বাংলার জননেত্রী যেদিন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন, সেদিন থেকেই এই রাজ্যের মানুষ এটা ভেবে আশ্বস্ত যে তাদের আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়ানোর কেউ রয়েছেন৷ বাংলার পুলিশ-প্রশাসন আজ সংবেদনশীল৷ যেকোনও মানুষের আপদে-বিপদে পাশে পাওয়া যায় প্রশাসনকে। এই ভয়মুক্ত বাংলায় গত কয়েক বছর ধরে উৎসবের চেহারা এক অন্য মাত্রায় পৌঁচেছে৷ উৎসবের মরশুমে পথে মানুষের স্রোতই তার সবচেযে বড় প্রমাণ৷ এই ভয়মুক্ত, আনন্দমুখর বাংলা উৎসবের মরশুমে দেখিয়ে দিল সম্প্রীতির বন্ধন কাকে বলে।