বিজেপির শেষের শুরু

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

তীর্থ রায়

বিজেপির শেষের শুরু হয়ে গিয়েছে। হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রের পর ঝাড়খণ্ডের বিজেপি দুর্গও খানখান হয়ে গেল। ঝাড়খণ্ড রাজ্যটি গঠিত হওয়ার পর গত ১৯ বছরের মধ্যে প্রায় ১৭ বছর সেখানে ক্ষমতায় রয়েছে গেরুয়া শিবির। ঝাড়খণ্ডে বিজেপির সেইরকম একটি দুর্গ একেবারে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

এক-তৃতীয়াংশ আদিবাসী মানুষের এই রাজ্যে বিজেপির কফিনে যেভাবে শেষ পেরেক পড়ল, তাতে বোঝাই যাচ্ছে গোটা দেশের মানসিকতা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে। আরএসএস গোটা দেশে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছিল আদিবাসীদের মধ্যে সংগঠন তৈরি করে। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই আদিবাসী মানুষই বিজেপিকে পুরোপুরি ত্যাগ করেছে। ঠিক এক বছর আগে আদিবাসী মানুষের এই বিজেপির প্রতি মোহ কেটে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল, যখন গেরুয়া শিবির ধরাশায়ী হয়েছিল ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। ছত্তিশগড়ের আদিবাসী সমাজ এক বছর আগে যে বিদ্রোহের সূচনা করেছিল, ঝাড়খণ্ডে তা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছল। ঝাড়খণ্ডের তিন কোটি ভোটারের এক কোটি আদিবাসী ভোটার বিজেপিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

আদিবাসী এলাকায় বলা চলে বিজেপি কোনও আসনই দখল করতে পারেনি। ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের এই প্রত্যাখ্যান বিজেপিকে একেবারে খাদের কিনারে ঠেলে নিয়ে চলে গিয়েছে। এই জায়গা থেকে বিজেপির আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও সম্ভাবনাই নেই। নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ ছাড়া বিজেপির সামনে আর কোনও বিকল্প পড়ে নেই। একটা সরকার কতটা জনবিরোধী হলে মানুষের ক্ষোভ এই জায়গায় পৌঁছতে পারে, তা ঝাড়খণ্ডের ভোটের ফল বলে দিচ্ছে। ছ’মাস আগে লোকসভা ভোটে ঝাড়খণ্ডে বিজেপি ১৪টি আসনের মধ্যে একাই ১১টি জিতেছিল। তাদের জোটসঙ্গী অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন তথা আজসু একটি আসন জেতে। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা মাত্র একটি আসনে এবং কংগ্রেস মাত্র একটি আসনে জয় পায়। বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি নেতারা গর্ব করে বলেছিলেন, তাঁরা ৬৫টি আসনে জিতছেনই। লোকসভা ভোটে যেহেতু বিজেপি এগিয়ে ছিল বিধানসভার ৬৭টি কেন্দ্রে, তাই অহংকারে বিজেপি রাজ্য নেতাদের বুক ছিল ফোলা। বিধানসভা ভোটে জনগণ বুঝিয়ে দিল বাস্তব অবস্থাটা কোথায় দাঁড়িয়ে। যারা ৬৫টি আসন জেতার প্রত্যাশা নিয়ে চলছিল, তাদের কপালে জুটল মাত্র ২৫টি আসন। দেশের ৭২ বছরের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এমন নজির সত্যিই কম।

যে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চাকে লোকসভায় মাত্র একটি আসনে জিতিয়েছিল ওই রাজ্যের মানুষ তারা এবার একাই ৩০টি আসনে জিতেছে। জোটসঙ্গী কংগ্রেস পেয়েছে ১৬টি আসন ও রাষ্ট্রীয় জনতা দল পেয়েছে একটি আসন। এই ফলের থেকে স্পষ্ট, গত ছ’মাসে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ কী হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছর মানুষ দেখেছিল কীভাবে একটা সরকার নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। আর গত ছ’মাসে দ্বিতীয় মোদি সরকারের আমলে মানুষ দেখতে পাচ্ছে কীভাবে একটা সরকার গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে ফ্যাসিস্ট চরিত্র গ্রহণ করে।

দ্বিতীয় মোদির সরকার গত ছ’মাসে দেশে যে যে আইন করেছে, তার মূল উদ্দেশ্যই হল গণতান্ত্রিক কাঠামোটাকে ভেঙে ফেলে দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করা। ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের ভিত্তিই হল আমাদের সংবিধান। উপমহাদেশের কোনও দেশেই গণতন্ত্র স্থায়িত্ব পায়নি।

গণতন্ত্র ওই দেশগুলিতে স্থায়িত্ব না পাওয়ার পিছনে মূল কারণই হল এদের কারও হাতেই ভারতের মতো উন্নত সংবিধান নেই। স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের পূর্বসূরিরা যে সাংবিধানিক শাসন দেশে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা উপমহাদেশের আর কোনও দেশ পারেনি। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি স্তম্ভ যদি সংবিধান হয়, তাহলে দ্বিতীয় স্তম্ভটি নিঃসন্দেহে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ। এই ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ আমরা স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পেয়েছি। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে রামপ্রসাদ বিসমিল ও আসফাকুল্লা খান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন। এই একাই ভারতের গোটা স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস জুড়ে রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ধর্ম-জাত-ভাষা-বর্ণ ইত্যাদির নিরিখে কোনও ভেদাভেদ ছিল না।
মহাত্মা গান্ধী দেশের সমস্ত মানুষকে নিয়ে যে স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিতকে রচনা করে দিয়েছে। এই ধর্মনিরপেক্ষতা তার শক্তিকে সংহত করেছে সংবিধানের মধ্যে দিয়ে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছে। যে দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর মহম্মদ আলি জিন্না দেশকে ভাগ করেছিলেন ব্রিটিশদের সাহায্য নিয়ে, সেই দ্বিজাতি তত্ত্বকে খারিজ করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদরা।

স্বাধীনতার সময় তাঁরা ঘোষণা করেছিলেন পৃথিবী যেদিকে যায় যাক, ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে। ভারতীয় রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না। রবীন্দ্রনাথের এই পুণ্যভূমি হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ইত্যাদি সবার জন্য। ধর্মের ভিত্তিতে এখানে কোনও ভেদাভেদ চলবে না। রাষ্ট্রের চোখে তথা আইন ও সংবিধানের চোখে এই দেশের সব মানুষ সমান সুযোগ, সমান সুবিধা পাবেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের এই আদর্শ ও দর্শনকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারেনি আরএসএস জিন্নার মতোই আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা গোলওয়ালকর ও সাভারকররা দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সাভারকর চেয়েছিলেন, ভারত হোক হিন্দু রাষ্ট্র। সাভারকরদের সেই স্বপ্ন সফল করতে গান্ধীজিকে পর্যন্ত হত্যা করেছিল নাথুরাম গডসে। আজ ভারতবর্ষে দ্বিতীয় মোদি সরকারের হাত ধরে সেই গডসেরাই ফিরে এসেছে। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সরকার এখন চাইছে নাথুরাম গডসের নামে রাস্তা তৈরি করতে। একটা সরকারের ভাবনা দেখেই বোঝা যায়, কোন পথে তারা দেশকে নিয়ে যেতে চায়। দ্বিতীয় মোদি সরকার এসে খোলাখুলি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর খেলায় নেমেছে।

উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের সরকার যেমন নাথুরাম গডসের নামে রাস্তা তৈরির প্রস্তাব আনছে, তেমন মহারাষ্ট্রে বিজেপির নেতারা সাভারকরকে ভারতরত্ন দেওয়ার দাবি তুলছেন। সবই একই সূত্রে গাঁথা। দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামোকে ভেঙে ফেলে আসলে গণতন্ত্রকে হত্যা করে ফেলাই নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের আসল উদ্দেশ্য। গণতন্ত্রকে শেষ করার জন্য তারা নিশানা করেছে সংবিধান ও দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে। তারা জানে, সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্রের এই দুই স্তম্ভকে ভেঙে ফেলতে পারলে স্বৈরতন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই দেশে কায়েম করা যাবে।

নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা চান না ভোটে জিতে ক্ষমতা দখল করতে। স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে তাঁরা বছরের পর বছর দেশের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চান। তাঁদের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাখা মানে প্রচুর অর্থ ও সম্পদ। এই বিপুল অর্থ ও সম্পদ তাঁরা বিদেশে পাচার করছেন। বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি, মেহুল চোক্সির মতো পেটোয়া শিল্পপতি ও ব্যবসারীদের মাধ্যমে তাঁরা দেশের সম্পদ লুঠ করে বিদেশের ব্যাঙ্কে পাহাড় তৈরি করছেন। কারণ এই নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা জানেন, মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে একদিন তাঁদের ক্ষমতা থেকে হঠতেই হবে। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য একদিন অস্তমিত হয়েছে। ফলে নরেন্দ্র মোদি-অস্তমিত শাহরা যতই ক্ষমতাশালী হোন, মানুষ তাঁদের উৎখাত করবেই। মানুষের দ্বারা উৎখাতে তখন তাঁরা বিদেশে পালাবেন। মানুষের উৎখাত করার কাজ যে শুরু হয়ে গিয়েছে, তা ঝাড়খণ্ডের ভোটের ফল বলে দিচ্ছে। সেই কারণেই আমরা বলছি, ঝাড়খণ্ড থেকে বিজেপির শেষের শুরু হয়েছে। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনের যে সুর বেঁধে দিয়েছেন, তা আজ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা ভারতবর্ষে। দেশের সমস্ত শহরে, গ্রামেগঞ্জে মানুষ আজ রাস্তায় নেমে পড়েছেন। মোদির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাই আজ মানুষের একমাত্র লক্ষ্য। যতদিন যাবে, আন্দোলনের এই আগুন দাবানলের মতো দেশের প্রতিটি প্রান্তে ও কোণে ছড়িয়ে পড়বে। এই ভয়ংকর দাবানলকে দমানো নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের পক্ষে সম্ভব নয়। আজ তাঁরা যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই মানুষ তাঁদের উপর খেপে উঠছে। এই ক্ষোভের আগুন বিজেপিকে ছারখার করে দেবেই দেবে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial