৪২ আসনেই জয়ের শপথ

পূর্ণেন্দু বসু

গত ১০ মার্চ, রবিবার নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছেন। একটি হিসেব অনুসারে, ১৩ ফেব্রুয়ারি সংসদের অধিবেশন সমাপ্তির পর থেকে নির্বাচন ঘোষণা অবধি নরেন্দ্র মোদি ১৫৫টি প্রকল্পের ‘উদ্বোধন’

অথবা ‘ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন’ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচির সঙ্গে তাল রেখে নির্বাচনের দিন ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন শেষবারের মতো কেন্দ্রের সরকারকে ‘ফেভার’ করল।

একটি নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য এবার অর্থাৎ লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেবেন ৯০ কোটি যোগ্য ভোটার। ভোটের জন্য প্রধান বিবেচ্য হল, মোদি সরকারের পাঁচ বছরের কাজ বা পারফরম্যান্স।

আমরা লক্ষ করছি, একটা যুদ্ধের আবহে জমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। পুলওয়ামার মর্মান্তিক ঘটনার আগে মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পেতে তলানিতে ঠেকছিল। বিশেষ করে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্রিশগড়ে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করেছিল। বিরোধীরা বিজেপি-বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করছিলেন। হঠাৎ পুলওয়ামায় জঙ্গিহানা এবং একটু যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব তৈরি করে পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনার চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল। সেনাবাহিনীর নামে ভোটের রাজনীতি করছে বিজেপি। মেকি ‘দেশপ্রেমিক’রা নেমে পড়েছেন রাস্তায়। প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকারীরা ‘দেশদ্রোহী’। তবুও প্রশ্ন থেমে থাকেনি।

প্রশ্ন উঠছে, কেন গোয়েন্দা সূত্রে আগাম খবর পাওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেনি? জওয়ানদের কেন বিমান বা ট্রেনে নিয়ে যাওয়া হল না?  সমান্তরাল সড়ক কেন খুলে রাখা হয়েছিল? কেন আড়াই হাজার জওয়ানকে বাসে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল? জঙ্গি হানাকে কি এভাবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছিল? এ সব প্রশ্ন করলেই ‘দেশদ্রোহী’ লেবেল দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবুও প্রশ্ন থামেনি। প্রশ্ন উঠল বালাকোটের পাল্টা আক্রমণ নিয়েও। ১২টি বিমানের হানায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে পাক জঙ্গিদের? সেকথা জানতে চাইছেন মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কোনও জঙ্গির প্রাণহানি হয়নি। মরেছে কিছু  পাইন গাছ। প্রকৃত সত্যটা কী? সরকার কেন জানাচ্ছে না? বলা হচ্ছে কোনও প্রশ্ন নয়। সবাইকে চুপ থাকতে হবে। কারণ এখন ভোটকেন্দ্রিক দেশপ্রেম চাই।

আগেই বলেছি লোকসভা ভোট হবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে। দেশবাসী তাঁদের পছন্দ জানাবেন। ফলে মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত ইস্যুগুলিই মূল বিবেচ্য। আসুন স্মরণ করি নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকা ফিরিয়ে এনে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেওয়া হবে। এক টাকাও জমা পড়েনি। বরং নীরব মোদি, মেহুল চোকসিরা দেশবাসীর আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়েছেন। কালো টাকা ফেরেনি। কারও অ্যাকাউন্টে এক টাকাও জমা পড়ল না। সব ভাঁওতা। সব মিথ্যা। এসব কিছু কী যুদ্ধের কথায় ভুলে যাবেন মানুষ? এর নাম দেশপ্রেম?

নোটবন্দির কথায় আসা যাক। মনে পড়ে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়ানো ১৬০ জনের মৃত্যুর কথা? লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মহীন হয়ে যাওয়ার কথা? সেই দুর্গতির কথা? মৃত মানুষগুলির প্রাণ ফিরবেন যুদ্ধে? কাজ হারানো মানুষের রুজির ব্যবস্থা হবে যুদ্ধে গেলে? প্রস্তুতিবিহীন জিএসটি চালু করার ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্পের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। কাজ হারিয়েছেন অগণিত মানুষ। যুদ্ধ কি সেই ক্ষতিপূরণ করতে পারবে? প্রশ্ন করুন, নোটবন্দি থেকে কি আপনার কোনও ফায়দা হয়েছে? নোটবন্দির কারণে কি দেশের অর্থনীতি উপকৃত হয়েছে? একজন ছোটখাটো ব্যবসায়ীর পক্ষে জিএসটি আইন মেনে চলা কি সহজসাধ্য?

নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, দুর্নীতির মূলোৎপাটন করবেন। ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। রাফাল নিয়ে কী হল? উপযুক্ত রাষ্ট্রায়াত্ত সংস্থা হ্যালকে বঞ্চিত করে, ভারতীয় সহযোগী হিসাবে আনা হল অনিল আম্বানিকে। তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হল ৩০ হাজার কোটি টাকা। এদের প্লেন বানানোর কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ১৫ দিন আগে এদের সংস্থা নথিভুক্ত হয়েছে। সত্য প্রকাশ হয়েছে এন রামের রিপোর্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে। মানুষ ভোট দেবেন অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ সরকারের জন্য। রাফাল দুর্নীতিতে অভিযুক্ত সরকারকে কেন ভোট দেবেন মানুষ?

প্রশ্ন করুন, দেশজুড়ে কৃষকের দুর্গতি কি কমানো গেছে? রিপোর্ট বলছে, দুর্গতির  সূচক বেড়ছে ৬৭ শতাংশ। কৃষকরা নিজেদের দুর্গতি অবসানের দাবিতে লংমার্চ করেছে। বেশ কয়েক হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছে। কৃষকের ভাগ্য ফেরেনি। আয় বাড়েনি।

নরেন্দ্র মোদি ৫৬ ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে বলেছিলেন- বছরে ২ কোটি ছেলেমেয়ের চাকরি হবে। কতজন প্রতিশ্রুতিমতো চাকরি পেয়েছেন? সরকারি তথ্য বলছে মাত্র ২ শতাংশ। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি শুনে তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন মানুষ। বাস্তবে পাওয়া গেল ঘোড়ার ডিম। বেকারত্ব বেড়েছে। ৪৫ বছরে বেকারত্ব এত বাড়েনি। যুদ্ধ কি কর্মসংস্থান করবে? যুদ্ধ কি বেকারদের পেট ভরাবে?

৫ বছরে সরকার তরুণ প্রজন্মের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। সেই তরুণ শক্তি কেন মোদি সরকারের জন্য ভোট দেবে? ভোটাররা কি ভাববেন না যে, মোদি সরকারের পেশিশক্তি, সেনাবাহিনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর দেখানোর নীতিতে  জম্মু ও কাশ্মীরে হিংসার অবসান হবে? কাশ্মীর উপত্যকায় এই প্রক্রিয়ায় কি শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?

ভোটাররা এত বোকা নন যে তাঁরা এবং মেহুল চোকসি সরকারের অগোচরে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন? ভোটাররা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবেন না যে, সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগ প্রভৃতি তদন্তকারী সংস্থাগুলি স্বচ্ছ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করছে। সিবিআই-এর অভ্যন্তরীণ লড়াই কি এই সংস্থার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে? একেবারেই না। সরকারের ভূমিকা মোটেই সন্তোষজনক ছিল না।

সংঘ পরিবারের সংখ্যালঘু নিগ্রহ ক্রমাগত বেড়েছে নরেন্ত্র মোদির আমলে। বেড়েছে দলিত নিগ্রহ। ৫৭ মাসে দলিত নিগ্রহের ঘটনা ৬৬৪টি। দলিতদের অবস্থা শোচনীয়। তাঁরা বারবার নিগৃহীত ও আক্রান্ত। চরম দুর্দশাগ্রস্ত দলিতরা কি যুদ্ধে মেতে উঠবেন?

নরেন্দ্র মোদি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। গণপিটুনিতে মৃত্যু অথবা বিবস্ত্র করে রাস্তায় হাঁটানো, প্রহৃত হওয়ার ঘটনা, একঘরে করে দেওয়ার ব্যবস্থাসহ ধর্ম জাতি-ভাষাগত কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন মানুষ। বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন মানুষ।

চারিদিকে কড়া নজরদারির পাকা বন্দোবস্ত। আমরা কেউ নিশ্চিত নই যে, আমাদের কথোপকথন অথবা মেসেজগুলির উপর সরকারি নজরদারি থাকছে না। ব্যক্তি পরিসরে এই হস্তক্ষেপ কি ভোটাররা মেনে নেবেন?

দেশ গত পাঁচ বছরে যে-সব বাস্তব সমস্যার মধ্যে দিয়ে চলেছে এতক্ষণের আলোচনায় সংক্ষেপে সেগুলি তুলে ধরা হয়েছে। একজন নাগরিক হিসাবে এই বাস্তব সমস্যাগুলি নিশ্চয়ই ভোটারদের ভাবাবে। আজ আমাদের সকলকে ভাবতে হবে, প্রতিটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে জবাব খুঁজতে হবে যে, জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে ধামাচাপা দিয়ে এড়িয়ে যাব, নাকি মতদানের সময় সমস্যার কারণ, ওই মোদি সরকারকে আর ফিরিয়ে না-আনার অঙ্গীকার নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিরোধীদের ভোট দেব?

বিজেপিকে ভোট দেওয়ার অর্থ মেকি জাতীয়তাবাদের পক্ষে মত দেওয়া। বিজেপিকে ভোট দেওয়ার অর্থ জওয়ান মৃত্যু নিয়ে নোংরা রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ানো। আমাদের সেনাবাহিনী হল দেশের সম্পদ। তাদের নিয়ে দেশবাসী গর্ব অনুভব করে। পুলওয়ামা বা বালাকোট দেশের জ্বলন্ত সমস্যাগুলির সমাধান করবে না। এতে মানুষের ভয় কমবে না। নতুন নতুন কর্মসংস্থান হবে না।

এর ফলে কৃষকের দুর্দশা লাঘব হবে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পুনরুজ্জীবন হবে না এতে। যুদ্ধ কি ফেরাতে পারবে? তদন্তকারী সংস্থাগুলি কি সংযত হবে? কাশ্মীর উপত্যকায় কি শান্তি ফিরবে?

লক্ষ করলেই বোঝা যাবে নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী ভাষণগুলি কিন্তু বালাকোটে বায়ুসেনার প্রত্যাঘাত-কেন্দ্রিক। এর অভিপ্রায় হল, ভোটদাতাদের মনে সাময়িক একটা উন্মাদনা সৃষ্টি করা। মোদি ভাবছেন, বালাকোট তাকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দেবে।

আমার বিশ্বাস, ভারতীয় জনগণ যথেষ্ট বিচক্ষণ ও রাজনীতি সচেতন। তাঁদের উপর আস্থা রাখা যায়। আশাকরি এতক্ষণে স্পষ্ট করতে পেরেছি–কার বিরুদ্ধে কাকে ভোট–এই প্রশ্নের উত্তর।

বিজেপি হঠাও-দেশ বাঁচাও- এই দিশা-নির্ণয়কারী স্লোগানের মর্মার্থ হল- নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে সব থেকে শক্তিশালী যে প্রার্থী, তাঁকে ভোট দেওয়া। বিজেপির বিরুদ্ধে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ৪২-এ ৪২ আসন জিতিয়ে দেওয়া। কারণ পুরো শক্তি পেলে দেশনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বল পাবেন, তাতে তিনি নতুন সরকার গড়ার কাজে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।

মোদি সরকারের প্রতিটি জনবিরোধী সিদ্ধান্ত ও কাজের বিরুদ্ধে মমতা সবার আগে সরব হয়েছেন। বিরোধিতা করেছেন সোচ্চারে। অন্যদের প্রতিবাদে উৎসাহিত করেছেন। বিরোধী ঐক্যের মধ্যমণি তিনি। একটি জনমুখী রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে গণউন্নয়নের এক নতুন দিশা দেখিয়েছেন তিনি। জনকল্যাণের ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২৯ জানুয়ারির ব্রিগেড সমাবেশ বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার পথে একটা মাইলস্টোন। সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ও বাঙালির মর্যাদা রক্ষায় তিনি অক্লান্ত প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনেই তৃণমূল সব থেকে শক্তিশালী। তাই ৪২টা আসনেই জেতার লক্ষ্য নিয়ে টিএমসি লড়াই করছে। এ রাজ্যে ৪২ আসনের জয়, দেশে নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে শক্তি জোগাবে। বাংলার সংগ্রামকে দেশ গঠনের সংগ্রামে মদত দেবে। তাই এ রাজ্যে বাম-বিজেপি-কংগ্রেসকে ভোট না দিয়ে ঘাসফুল চিহ্নে ভোট দিয়ে নতুন ভারত, অপেক্ষাকৃত একটা মানবিক সরকার গঠনে এগিয়ে আসুন।

 

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers