২১ শের ভাষা আন্দোলন বিশ্বে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

গত ২১ ফেব্রুয়ারি ’১৯ দেশপ্রিয় পার্কে ভাষা শহিদ স্মৃতির স্তম্ভের পাশে পালিত হল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবেগমথিত বক্তব্য রেখেছিলেন ওইদিন এবং বলেছিলেন, মাতৃভাষা কোনও সংকীর্ণ জাতপাত, ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকের পাকিস্তানের বৃহত্তম অংশের মানুষের মাতৃভাষাকে অস্বীকার এবং তীব্র দমনপীড়নই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে দৃঢ়তার জন্ম দেয়। ইতিহাসের গতিপথ মানুষ পরিবর্তন করতে পারে না, সে তার আপন গতিতে চলে এবং নতুন নতুন ঘটনা ঘটে দেশে বিদেশে এবং গুরুত্ব অনুযায়ী ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় সেই ঘটনা। ধরে নেওয়া যাক যদি সেদিন বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করে পাকিস্তানি শাসক উর্দু এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করতো তাহলে বাংলাদেশের জন্ম হত না। কিন্ত ইতিহাসের লিখন কেউ পাল্টাতে পারে না। এক প্রবল আন্দোলনের সূত্রপাত হয পূর্ব পাকিস্তানে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে সামনে রেখে। কারণ, বাংলা ভাষাবাসী মানুষ গৌরববোধ করে বাংলা ভাষায় কথা বলে, সাহিত্য, গীত, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক,দর্শন, মহাকাব্য রচনা করে। বাংলার মানুষের আচার, ব্যবহার, চারিত্রিক গঠন, মানসিকতা সবই বাংলাভাষা নির্ভর। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের লড়াই সেইজন্য ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গেতে পরিণত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান জন্মের বহু আগে থেকেই বাংলা ভাষাভাষি পূর্ব বাংলার মানুষ বাংলাভাষার স্বীকৃতির জন্য লড়াই শুরু করে। ভাষা আন্দোলনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯১১ সালে রংপুরে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে ভারতের অন্যতম ভাষা বাংলাভাষা বলে জাতীয় বিপর্যয়ের ভাষা হিসাবে স্বীকৃতির দাবি করা হয়।

১৯১৮ সালে কিশ্বভারতীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ভারতের সাধারণ ভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভায় বাংলাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষার দাবি জানানো হয়। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস. এম. হলের সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাকে অবিভক্ত বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করা হয়। ২৯ জুলাই, ১৯৪৭ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন কিন্তু ডঃ মুহম্মদ শহিদুল্লা তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিক দাবি পেশ করেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিশ ভাষা বিতর্ককে তাদের সাধারণ কর্মসূচিতে গ্রহণ করে জাতির সামলে তুলে ধরে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তান সরকার কোনও ঘোষণা ছাড়াই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা রূপে ব্যবহার শুরু করে। প্রথমদিকে পোস্টকার্ড, মানি অর্ডার ফরম, রেলের টিকিটে বাংলার পরিবর্তে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার শুরু করে। ১৫ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে উচ্চতর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বিষয়াদি নিয়ে একটি সার্কুলার পাঠায়। এতে ৩১টি বিষয়ের মধ্যে ৯টি ভাষার পরীক্ষার উল্লেখ থাকলেও বাংলাভাষার কোনও উল্লেখ ছিল না। নভেম্বর ১৯৪৭ সালেই ঢাকার বুদ্ধজীবীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিপত্র পেশ করে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সভা সমাবেশ শুরু করে। ছাত্র-শিক্ষকদের যৌথ সমাবেশে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা মাওলানা আকরম যা বলেন বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা হলে পূর্ব বাংলা বিদ্রোহ করবে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গণ পরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের ভাষা করার দাবি করেন। কিন্তু পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান তার দাবি নাকচ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করেন। ৩ মার্চ যুগ্ম রাষ্ট্রভাষা সাব কমিটি দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মহম্মদ আলি জিন্না উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বলে ঘোষণা করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে পাক সরকার কোনও ঘোষণা ছাড়াই সর্বক্ষেত্রে উর্দুভাষার ব্যবহার শুরু করে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ধর্মঘট করার জন্য পাঁচজন ছাত্র বহিষ্কৃত হয়। ১১ মার্চ ১৯৫১ সালে ভাষা দিবস উদযাপন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং হরতাল পালন করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং প্রায় দশ হাজার ছাত্রছাত্রী  বিক্ষোভ মিছিলে শামিল হয়। সর্বদলীয় কর্ম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানায়। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশি সন্ত্রাস শুরু হয়। গ্রেফতার লাঠি চার্জ করেও যখন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা যায়নি তখন পার্ক পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালাতে শুরু করে এবং গুলিতে ৩ জন ছাত্রসহ ৪ জন নিহত হয় এবং ১৭ জন আহত হয় এবং বহু ছাত্রকে গ্রেফতর করা হয়। এরপর দীর্ঘ আন্দোলনের পথ পেরিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৭১ সালের শুরুতেই। উল্লেখ করেছিলাম বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও কখনও ভাষা আন্দেলানের ফলশ্রুতিতে কোন দেশ বা দেশের অংশ স্বাধীনতা লাভ করেনি।

বাংলাদেশের জন্ম এবং ২১ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা দাম্ভিক, অত্যাচারী পাক সরকারকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে স্বাধীন ভারতের অসম প্রদেশেও বাংলা ভাষাকে রাজ্য সরকারের ভাষা হিসাবে সরকার অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে গ্রহণ করার আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। অসম সরকার অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করার জন্য অসমের বাংলাভাষী নাগরিকরা বাংলাকে সরকারি ভাষা করার দাবিতে তীব্র আন্দোলন সংগঠিত করে। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরে বাংলা ভাষাভাষী নাগরিকদের আন্দোলন দমন করার জন্য বেপরোয়া গুলি চালায় এবং ১১ জন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয় তখন অসম সরকার বরাক উপত্যকার ৩টি জেলায় বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করে। ভাষা আন্দোলনে মাদ্রাজ রাজ্যের নাম পরিবর্তিত হয় এবং মাদ্রাজ রাজ্যের নাম হয় তামিলনাড়ু । মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা, আবেগ তীব্রভাবে আলোড়িত করে মানুষকে কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এবং বিশ্বের আর্থিক বিন্যাসের পরিবর্তন হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আগ্রহ এবং প্রয়োজনে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল খোলা শুরু হয়েছে। অনেকগুলি বাংলা মাধ্যম স্কুল বন্ধও হয়ে গিয়েছে। এর কারণ বাংলা মাধ্যমে পড়লে সঠিক শিক্ষা হবে না আর ইংরেজি মাধ্যমে হবে এটা কখনও যুক্তি হতে পারে না। বাংলার নবজাগরণের সময় যে মানুষগুলি বাংলার সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বের দরজায় দেশকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁরা প্রায় সকলেই বাংলার পড়াশোনা করেছেন। এখন পশ্চিমবঙ্গে অধিকাংশ ছাত্র যারা পরীক্ষায় সব থেকে ভাল ফল করছে তারা প্রায় সকলেই বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছে। প্রশ্ন হল পঠনপাঠন তখনই ভাল হবে যখন শিক্ষকরা এদের নিজের সন্তানের মতো করে তৈরি করবেন। সকল শিশু, বালক, বালিকা, কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীর মধ্যেই প্রতিভা আছে, শুধু গড়ে দিতে হবে তাঁদের। ভাষা আন্দোলন আমাদের যেমন আবেগ তেমনি তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলাও একান্ত প্রয়োজন।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers