হ্যাপি নিউ ইয়ার

রাজ চক্রবর্তী

নতুন বছরের অরুনোদয় ঘটিয়ে একেবারে সাড়ম্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ল ২০১৯। নববর্ষের প্রথম দিনের শুভক্ষণে আমরা জানলাম, এই পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও বয়স আরেকটু বাড়ল। যেমন বাড়ে প্রতি বছরেই। তবে এটা হিসাবরক্ষদের ব্যাপার। আমরা হিসাবরক্ষক নই। কিন্তু বচ্ছরকার এই দিনটায় আমরা কীভাবে যেন সেই হিসাবরক্ষকই হয়ে পড়ি।

নববর্ষ অথবা পয়লা জানুয়ারি দিনটা কিন্তু এমনিতে একটা সাধারণ দিন বা ঘটনা। যে-ক্যালেন্ডারের সৌজন্যে পয়লা জানুয়ারি এল সেটা আমাদেরই তৈরী, দিন-মাস-বছরের হিসাবরক্ষার জন্য। ৩১ ডিসেম্বরের পরের দিন হিসাবে পয়লা জানুয়ারি আসবে, অথবা ডিসেম্বরের পরবর্তী মাস হিসাবে জানুয়ারির শুভাগমন ঘটবে, কিংবা ২০১৮ সালের পরের আসনটি যে ২০১৯ সাল গ্রহণ করবে-এটা যেমন অবাস্তব কিছু নয়, তেমনি একটা হইচই ফেলে দেওয়ার মতো কোনও বিষয়ও নয়। তাহলে আমরা নববর্ষ পালন করতে এমন আদেখলের মতো মেতে উঠি কেন?

কারণ আছে বস্‌। পয়লা জানুয়ারি দিনটা আর কিছু পারুক ছাই না পারুক, একটা উপলক্ষের জন্ম দেয়, আলবাত দেয়। প্রতিটি যুগের একটা যুগধর্ম থাকে। বিগত যুগের যেমন ছিল অন্তর্মুখী হওয়াই ধর্ম, এ যুগের তেমনি ধর্মই হল বহিমুর্খী হওয়া। আমার আনন্দ দেখ তুমি। তুমি দেখবে বলেই। আমরা সারা বছর ধরে তার উপলক্ষ খুঁজছি। আমি সাজব বলে, ধেই ধেই করে নাচব বলে, গব গব করে গিলব বলে, গলা ফাটিয়ে চেঁচাব বলে। তুমি এসব দেখে ধন্য হবে। আমি নাচব কেন? অমন ধিঙ্গিপনা করব কেন? কেন না জীবনটা বড় পানসে হয়ে গেছে। চাপে চাপে চ্যাপটা হয়ে গেছি। এভাবে চলবে না রে হরিচরিণ। লোনের জ্বালা, ইএমআইয়ের জ্বালা, গ্যাস-অম্বলের জ্বালা, সুগার-প্রেসার-কোলস্টেরল-অ্যানিমিয়া-অজানা জ্বর-অজানা বিপদে জেরবার অবস্থা। ওদিকে এই জগতে অনেক কিছুই বকেয়া রয়ে গেল আমার- টাকা-পয়সা, মান-সম্মান, হাততালি, ছ্যাবলামো, হ্যাংলামো, আদিখ্যেতা, প্যানপ্যানানি। এই নিয়ে আর ভাল্লাগে না স্যার। একতু মুক্তি দাও প্রভু।

প্রভু যিশু বললেন, সেই জন্যেই মুক্তি তো দিলাম ক’দিন আগেই। বড়দিন পেলি, আমার কৃপায়। কত ফূর্তি, গান, পিকনিক, ছুটি সবই তো হল। আরও চাই! চাই বই কি স্যার। তাই তো নিউইয়ার। আমরা এখন সুইচওভার করেছি বাংলা থেকে ইংরেজি নববর্ষে। বাংলা নববর্ষকে ল্যাং মেরেছি ঠিকই, তবে একেবারে শুইয়ে দিইনি। একটু ধুতি-টুতি পরি ওদিনটায়। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষটা ঠিকঠাক পালন করলে যেন একটা ইয়ে, মানে তৃপ্তি হয়, কেতা রক্ষা হয়। যতই হোক, আমরা এখন বাবুসোনার জন্মদিনে, থুড়ি বার্থডেতে পায়েস খাওয়াই না, কেক কাটি। বাবুসোনার বাংলা নয়, ইংরেজি মাধ্যম। রান্নাঘর বললে জাত যায়, কিচেন বলি। আমাদের ভুঁড়ি হয় না, পেটটা লার্জ হয়ে যায়। ইংরেজি নববর্ষটা পালন করলেই যত দোষ? কেন, নিউ ইয়ার কি নন্দ ঘোষ নাকি? ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায়, বস।

তবে যাই বলুন স্যার,  এবছর নতুন বছরের শুরুটা বেড়ে হল। হ্যাঁ একটা ভদ্রলোকের মতো ঠান্ডা পড়েছে বটে। অনেককাল আমরা চাতক হয়ে ছিলাম। অবশেষে রেকর্ড ভাঙচুর হল। যাঁরা দার্জিলিঙে গিয়ে তুষারপাত দেখে ফেললেন তাদের নসিবের প্রতি কিঞ্চিৎ ঈর্ষা হল বইকি। পুরনো বছরের শেষদিকটা মোটেওভাল কাটল না। পরপর কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা আমাদের বিষণ্ন করে তুলেছে। এখন নতুন বছরটা যেন সুখের হয়, সে-প্রত্যাশা সকলের। নতুন বছরে সবচেয়ে বড় ঘটনা যেটা ঘটবে সেটা হল লোকসভা ভোট। রাজনীতিকদের ব্যস্ততা সেই নিয়ে তুঙ্গে। শীতের পরই আবহাওয়ায় যেমন গরম বাড়বে, তেমনি ভোটের উত্তাপ ক্রমশ সঞ্চারিত হবে, বলাই বাহুল্য।

নতুন বছরের ক্যালেন্ডার এতদিনে অনেকেরই ঘরে পৌঁছে গেছে। তবে এখন আর সেই ছাপানো, দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের প্রতি আমাদের সমস্ত নির্ভরতা অপেক্ষা করে থাকে না। এখন সবারই মোবাইলে যেকোনও বছরের ক্যালেন্ডার মুখ দেখাতে তৈরি। যে কোনও মুহুর্তে। তবে সে শুধুই বার-মাস-তারিখটুকুর হিসাবমাত্র। এ বছর মহালয়া কবে সেটা জানতে চোখ বোলাতে হবে দেওয়ালের গায়ে লম্বমান কাগজটিতেই। তাই এখনও হাতে রোল-পাকানো ক্যালেন্ডার নিয়ে নতুন বছরের দিগ্বিজয়ী বাবুর দেখা পাওয়া যায়। আর কিছু না পারি, পাওয়া ক্যালেন্ডার বিলিয়ে দিয়ে দানশীলতার মহিমা লাভ করার একটা মোক্ষম সুযোগ পেতে পারি এই সময়টায়। তবে এটা ঠিক, নতুন শৌখিন বাবুর রং-করা নতুন ফ্ল্যাটের দেওয়ালে ক্যালেন্ডার ঝোলাতে একটা দ্বিধা আসে। দেওয়াল সচেতন হয়ে ক্যালেন্ডার যদিও বা ঝোলাই তবে তাতে একখানা পাহাড়, অরণ্য, সূর্যোদয় অথবা মোনালিসার ছবি থাকলেই মঙ্গল। দ্যাবা-দেবীর ছবি থাকলে বড় সেকেলে হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। তবু নতুন ক্যালেন্ডার যুগ যুগ জিও। হ্যাপি নিউ ইয়ার।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers