হরপ্রসাদের দিগদর্শন

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও প্রাচীনতম পুঁথিপত্র আবিষ্কার করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে পোক্ত ভিতের উপরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি সুপণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক-সব মিলিয়ে হরপ্রসাদ উনিশ-বিশ শতকের বিশিষ্ট মনীষী। কিন্তু তাঁর নামটি ঐতিহাসিকভাবে যে বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়েও গিয়েছে সেটি হল চর্যাপদ। চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর করে গিয়েছেন। কীভাবে সম্ভব হল সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা সে অন্যকাহিনী। কিন্তু আসল ঘটনা হল, হরপ্রসাদকে ভোলা আর সম্ভব হল না কৃতবিদ্য বাঙালির পক্ষে।

কর্মজীবনের শুরুতে হরপ্রসাদ শিক্ষকপদে যোগ দিয়েছিলেন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। পাঁচ বছরের মধ্যে ১৮৮৩ সালে হলেন সংস্কৃত কলেজের প্রফেসর। পাশাপাশি হলেন বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। পড়াতেন প্রেসিডেন্সি কলেজেও। ১৯০০ সাল-বিশ শতকের প্রথম বছরটিতে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হলেন হরপ্রসাদ। কুড়ি বছর পরে তিনি অবিভক্ত বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হন। পরবর্তীতে ইনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রধান পদটিও আলোকিত করেছিলেন। অন্যদিকে এই মানুষটি আবার নৈহাটি পুরসভার কমিশনার, ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন।

কিন্তু এসবই হল তাঁর পেশার দিক। এর চেয়েও মূল্যবান তাঁর নেশার দিকটি। নেশায় ছিল প্রাচীনতার গন্ধ। গভীর শিকড়ের সন্ধান। লাইব্রেরিয়ান থাকার সময় যে-গন্ধ তাঁর নেশা জাগিয়েছিল। খুঁজে খুঁজে ফিরতে লাগলেন প্রাচীন পুঁথিপত্র। ধোঁয়া মানেই আগুনের সন্ধান। ধোঁয়ার পিছু ধাওয়া করে শেষ অবধি পেয়ে গেলেন গনগনে আগুনের খোঁজ। সাহায্য করেছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। চারবার নেপালের রাজদরবারে গিয়েছিলেন হিস্টোরিওগ্রাফার হিসাবে। সেখানেই খুঁজে পেলেন (১৮৯৭) সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’-এর পুঁথি। পেলেন বিদ্যাপতির ‘কীর্তিলতা’। তৃতীয়বার ১৯০৭ সালে গিয়ে খুঁজে পেলেন চর্যাপদের পুঁথি। তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ নয় বছর গবেষণার শেষে প্রকাশিত হল ‘হাজার বছরের পুরনো বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’। পুঁথিটিতে মোট ২৪ জন কবির রচিত ৫০টি পদ ছিল। ছিন্ন পুঁথিটিতে পাওয়া গিয়েছিল মোট সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ। হরপ্রসাদ জানালেন, পদগুলি খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে কোনও এক সময়ে রচিত। অতএব বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন এটাই এবং বাংলা সাহিত্যের গোড়াপত্তনের কালও এটাই। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নতুন দিকনির্দেশ সম্ভব হল। চর্যার পদগুলি ছিল বৌদ্ধ সহজিয়া তান্ত্রিকদের সাধনসম্ভূত রচনা। চর্যার ভাষাকে তিনি বলেছেন ‘সন্ধ্যাভাষা’ অর্থাৎ রহস্যময়।

নৈহাটির রামকমল ন্যায়রত্নের ছয়টি সন্তানের মধ্যে পঞ্চমজন ছিলেন হরপ্রসাদ। পারিবারিক পদবি ছিল ভট্টাচার্য। ১৮৭৭ সালে সংস্কৃতে অনার্স ডিগ্রি এবং এমএ পাস করার পর বৃত্তি এবং ‘শাস্ত্রী’ উপাধি লাভ। ১৮৫৩ সালের ৬ ডিসেম্বর পণ্ডিতবংশে জাত এই ছেলের প্রথমে অবশ্য নাম ছিল শরৎনাথ। একবার মরণাপন্ন অবস্থা থেকে তাঁর প্রাণরক্ষা হয়। ছেলের আরোগ্যের জন্য শিবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন বাবা এবং তাই তাঁর নাম বদলে তখন রাখা হল হরপ্রসাদ। ১৮৯৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধি দিয়েছিল। ছাত্রাবস্থায় মেধাবী ছেলেটি দু’বার ডবল প্রোমোশন পেয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজেন্দ্রনাথলাল মিত্র এবং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে যেমন শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন হরপ্রসাদ তেমনি তাঁকে আবার শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন আরেক বাঙালি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বেদের অনুবাদ রচনার কাজে রমেশচন্দ্র দত্তকে সহায়তা করেছিলেন হরপ্রসাদ। রমেশচন্দ্র লিখেছেন, “তাঁহার সহায়তা ভিন্ন আমি এই কার্য্য সমাধা করিতে পারিতাম কিনা সন্দেহ।” সংস্কৃত কলেজে ছাত্র থাকাকালীন হরপ্রসাদের প্রবন্ধ পড়ে বঞ্চিমচন্দ্র বলেছিলেন ‘কাঁচা সোনা’।

সেই সোনা পরবর্তীতে স্বর্ণাভা দান করেছিল। কৃতী ভারততত্ত্ববিদ, সংরক্ষণবিশারদ, পুঁথি সংগ্রাহক ও প্রসিদ্ধ পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ব্যাপক ও বিচিত্র কর্মজীবনে মৌলিক সাহিত্যও রচনা করে গিয়েছেন। ‘বেনের মেয়ে’ ও ‘কাঞ্চনমালা’ তাঁর দু’খানি উপন্যাস এবং বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর অনেকগুলি প্রবন্ধের বই রয়েছে। উত্তর কলকাতার পটলডাঙা স্ট্রিটের বাসভবনে ১৯৩১ সালে প্রয়াত হন হরপ্রসাদ। তাঁর কীর্তি পরাধীন ভারতমাতাকে গৌরব এনে দিয়েছিল। তুলে ধরেছিল বাংলার মেধা ও মনীষীকেও। বাংলা আজও তাঁর কর্মকুশলতায় গর্বিত। তিনি আজও বাঙালির প্রেরণা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ১৬৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রণাম।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial