হয়রানি কমাতে এবার রোগ পরীক্ষায় এক জানালা নীতি

জলি মজুমদার

রোগী হয়রানি কমাতে রোগ-পরীক্ষায় এক-জানালা নীতি চান রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বাস্থ্যসচিবের সঙ্গে ইতিমধ্যেই সরকারি হাসপাতালে ‘কম্প্রিহেনসিভ টেস্ট’ নিয়ে কথা হয়েছে। ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে বিধানসভায় জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সরকারি হাসপাতালে ব্যাপক ভিড়। রাজ্য বিধানসভায় স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলাকালীন রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, “সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে বলে ভিড় বেড়েছে। পিপিপি মডেলে এখন বিভিন্ন টেস্ট ফ্রি। যে পরীক্ষা করাতে বেসরকারি হাসপাতালে হাজার হাজার টাকা খরচ। তা সরকারি হাসপাতালে হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আর ভিনরাজ্যের লোকও সেই সুযোগ নিচ্ছে। তাই সময় বেশি লাগছে।” গত ৩৪ বছরে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যে কোনও কাজই হয়নি বিধানসভায় তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্য দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “রাজ্যে ২০১১-এর আগে কী হয়েছে আর পরিবর্তনের পরে কী হয়েছে–তা বাজেট বরাদ্দ দেখলেই বোঝা যায়। আগে স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬৮২ কোটি টাকা। আর এ বার তা বেড়ে হয়েছে ৯৫৫৬ কোটি।”

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। প্রেশার এত বেশি থাকে যে ডাক্তার বাধ্য হয়েই দেরিতে ‘ডেট’ দেন। মুখ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ, “একটা হল সাধারণ অসুখ-বিসুখ। আর একটা এমার্জেন্সি কেস। এটা ভাবতে হবে। একটা রোগীর নানা সমস্যা হয়। তার জন্য ঘুরে ঘুরে ‘ডেট’ নিতে হয়। আমরা বলেছি, একটা জায়গা থেকে আর একটা জায়গায় পাঠাবেন না। কম্প্রিহেনসিভ চেক-আপ করান। এতে সুবিধা হয়।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “আগে জেলায় কিছু হলেই কলকাতায় পাঠিয়ে দিত। এখন তা হয় না। কম্প্রিহেনসিভ চেক-আপ নিয়ে সচিবের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তবে, ডাক্তারদের উপরেও অনেক চাপ আছে। তাদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে, কীভাবে এটা করা যায়।” প্রসঙ্গত জেলা হাসপাতালেই যাতে সমস্ত রকম অত্যাধুনিক চিকিৎসা পাওয়া যায় তার জন্য পদক্ষেপে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। ইতিমধ্যেই তিনি সমস্ত সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে মাল্টি সুপার স্পেশালিটিতে রূপান্তরিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নে কীভাবে নিরন্তর কাজ করে চলেছে তার উদাহারণ দিয়ে চন্দ্রিমা বলেন, “পরিষেবা ঠিকমতো পৌঁছে দিতে গেলে পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে। এটা মাথায় রেখেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে কাজ করে চলেছে স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকরা। প্রতিটি প্রান্তিক মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে এই সরকার। ২০১১ সালের আগে স্বাস্থ্যে ব্যয়বরাদ্দ ছিল ৬৮২ কোটি টাকা। আর ২০১৯ সালে মা-মাটি-মানুষের সরকার স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়বরাদ্দ করেছে প্রায় ৯৫৫৮ কোটি টাকা। মেডিক্যাল কলেজ বেড়েছে। প্রসূতি মৃত্যুর হার কমেছে।” সমীক্ষা দেখিয়ে তিনি জানান, ২০১১ সালে প্রসূতি মৃত্যুর হার প্রতি ১ লক্ষ মায়ের মধ্যে ছিল ১১৩ যা ২০১৮ সালে হয়েছে ১০১। যা জাতীয় গড় ১৩০-এর তুলনায় অনেক কম। রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব ২০১০ সালে ছিল মাত্র ৬৫ শতাংশ। যা ২০১৮-১৯ সালে বেড়ে হয় ৯৭.৫ শতাংশ। চন্দ্রিমা আরও বলেন, প্রতি ৫০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে সিসিইউ তৈরি করা হয়েছে। ৪৪টি সিসিইউ ইউনিট ও ২৫টি অইচডিইউ ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। পিজিতে লেবেল ওয়ান ট্রমা কেয়ার সেন্টার চালু হয়েছে। ২৪৪টি বেডের মধ্যে ২২৮টি ‘অপারেশনাল’ হয়েছে। এরপরই বিরোধীদের উদ্দেশ্য করে চন্দ্রিমার কটাক্ষ, “চশমা আমরা বিনে পয়সায় দিচ্ছি। কিন্তু ওরা পড়তে পারছে না।”

চন্দ্রিমাদেবী জানিয়েছেন, “মুখ্যমন্ত্রী একটা ঐতিহাসিক কাজ করেছেন। ইতিমধ্যেই মাল্টি সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে প্রস্তাবিত ১৩৬০০ শয্যার মধ্যে ১৩ হাজার চালু হয়ে গিয়েছে। ১০,৩৫৭টি উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে।” মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, রাজ্যে প্রায় ১৬ হাজার চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই কাজ করার চেষ্টা চলছে। সরকার প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে আরও ভালো স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে। এদিন জুনিয়র চিকিৎসকদের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালগুলিতে সিনিয়র ও জুনিয়র চিকিৎসকেরা এক যোগে পরিষেবার কাজ চালিয়ে যান। যার জন্য উপকৃত হন সাধারণ মানুষ। আর তাই নতুন ট্রমা সেন্তারের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করেছে সরকার। করা হয়েছে বেশ কিছু নতুন পদের গঠন। ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ টি শয্যা বিশিষ্ট, এসএসকেএম হাসপাতালের তৈরি নতুন ট্রমা কেয়ার সেন্টারের উদ্বোধনও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে চিন্তা ব্যক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। চিকিৎসক ও গবেষকদের কাছে সাপের কামড় থেকে বাঁচতে, বিশেষ করে কৃষকদের জমিতে চাষের কাজ করার সময়ে সাপের কামড় থেকে বাঁচাতে কোনও বিশেষ কিছু আবিষ্কার করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। একইসঙ্গে ক্যানসারের মতো মারণ রোগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হওয়া গবেষণার দিকে নজর রাখার জন্যও চিকিৎসকদের পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

 

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial