সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে হানো আঘাত ১৯শে চলো ব্রিগেড

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

১৯জানুয়ারি ২০১৯ আবার ডাক দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় “চলো ব্রিগেড”। ব্রিগেড সমাবেশ কত বিশাল আকার নেয় সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন কয়েকবার এবং প্রতিবারই আগের ব্রিগেডকে ছাপিয়ে গিয়েছে জনতার স্রোত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই অতীতকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া। শুধু ব্রিগেড নয়, প্রতিবার ২১ জুলাইয়ের জমায়েতে শুধু কালো মাথা, সামনে ঘত দূর দেখা যায়, জনসম্মোহনী ক্ষমতা ছাড়া এই জমায়েত করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে ভারতের কোনও নেতার নেই। কীভাবে একজন সাধারণ ঘরের মেয়ে জনতার চোখের মণিতে রূপান্তরিত হল সে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসগ।

আমি ফিরে যাব ১৯৯২ সালের ২৫ নভেম্বর তারিখে উত্তাল হয়েছিল ব্রিগেড। ব্রিগেড পরিণত হয়েছিল জনারণ্যে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘উপলব্ধি’ বইতে সেদিনের লেখা থেকে কয়েক লাইন তুলে ধরতে চায় আজকের তৃণমূল কর্মীদের কাছে, যা সেদিনের জমায়েত সম্পর্কে একটা ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠবে৷ ‘সারা বাংলার সমস্ত রাস্তাই যেন সেদিন ব্রিগেডমুখী। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই দেখা গেল ব্রিগেড উপচে পড়ছে, জনতার জোয়ারে তখন উৎসাহের ঢেউ৷ মানুষের যেন আর কমতি নেই- এ কি স্বপ্ন? না মায়া? শুধু মানুষ আর মানুষ।… উত্তাল জনসমুদ্রে মন্দ্রিত হচ্ছে-‘বন্দেমাতরম’।

সত্যিই সেদিন মঞ্চ থেকে মনে হয়েছিল যেন সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছি আর মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়ছে মঞ্চের গায়ে। মনে পড়ে যাচ্ছে মঞ্চের নিচে আমার স্ত্রী সুপ্রিয়া আমার ছেলে ঈশদানকে নিয়ে বসে ছিল৷ সময় মতো ছেলেকে মঞ্চের উপরে তুলে না নিলে কী হত ভাবলে আজও বুক কেঁপে ওঠে৷ ‘উপলব্ধি’ বইতে মমতা আবার লিখলেন, ‘অন্তরের স্বতোৎসারিত আবেগে আমি তখন থরথর করে কাঁপছি। এত মানুষ মিটিংয়ে এসেছেন৷ গ্রামবাংলা থেকে, বহু দূর- দূরান্তর থেকে মানুষ এসেছে কংগ্রেসের পতাকা নিয়ে, সিপিএমের হাতে মার খেতে খেতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, হারানোর কিছু নেই৷ সিপিএমের মৃত্যুঘণ্টার আওয়াজ বুকে নিয়ে ওরা ফিরে যাবেন যার যার অঞ্চলে।’ সেদিন ব্রিগেড কার্যত দু’বার হয়েছিল।

তা হল তখন পর্যন্ত কোনও কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাই ব্রিগেডে আসেননি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে তার বক্তব্য রেখে কেন্দ্রীয় মন্তিসভা থেকে পদত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেন কারণ তিনি ভেবেছিলেন মন্তিত্বে থেকে রাজ্যে গণজাগরণ বাধাপ্রাপ্ত হবে৷ মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারা যাবে এই আশঙ্কায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সভা শেষ করে দেন৷ এই সময় সন্তোষমোহন দেব সভায় উপস্থিত হন৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সন্তোষমোহন দেবের নাম ঘোষণা করতেই মানুষ আবার ফিরে আসে এবং যারা ব্রিগেডে ঢুকতে পারেনি তারাও মিছিল নিয়ে চলে আসে সভায়৷ সন্তোষমোহন দেবের বক্তৃতার পর আবার সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবসময়ই এক অপ্রতিদ্বন্দী নেত্রী। তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় যেদিন এসেছিলেন তখন তিনি খুবই ছোট৷ ১৯৮৪ সাল৷ লোকসভার নির্বাচন৷ যাদবপুর কেন্দ্রে তখন সিপিএমের প্রার্থী লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যারিস্টার এবং পার্টির উপরের সারির নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়৷ সকলেই মনে করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানত রক্ষা করতে পারবেন না কারণ যাদবপুর কেন্দ্র ছিল সিপিএমের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। সমগ্র দেশকে বিস্মিত করে সেদিন বিজয়ী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যার ফলে তার নাম হয়ে গেল ‘জায়ান্ট কিলার’।

আরও একটি প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ না করলে অপরাধ করা হবে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালের মর্মান্তিক ঘটনা৷ বিজেপি ও কিছু মৌলবাদী শক্তি বাবরি মসজিদ ভেঙে দিল সেদিন মানুষ দেখেছিল মৌলবাদের উন্মত্ত উল্লাস ৷ সেদিন সরকার ও বিরোধী দলের কোনও নেতাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে অথবা যারা আক্রান্ত তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য পথে নামেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, হাঁড়ি, কড়া, থালা, চাল, ডাল নিয়ে ছুটে গিয়েছেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের পাশে৷ পরম বিশ্বাসে সেদিন সব ধর্মের মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাদের বন্ধু, তাদের ত্রাতা হিসাবে গ্রহণ করেছিল৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে জীবনে অনেক অত্যাচার, দৈহিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন কিন্তু ভীতসস্ত্রস্ত হয়ে লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে যাননি তাই যতবার ব্রিগেড সমাবেশ করেছেন, প্রতিবারই ব্রিগেড জনারণ্যে পরিণত হয়েছে৷ কারণ একটাই, মানুষ সিপিএমের সন্ত্রাসথেকে, অপদার্থতা থেকে মুক্তি চেয়েছিল কিন্তু সবসময় নিজের এলাকায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে পারেনি৷ ১৯৯২ সালে বামফ্রন্টের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছিলেন কিন্তু তারপর অপেক্ষা করতে হয়ছিল ১৯টা বছর যা কেবল অত্যাচারের ইতিহাস বহন করেছে৷ মানুষ ভোলেনি সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, সুচপুরের ঘটনা তাই আজ যখন কংগ্রেস, সিপিএম গোপনে বিজেপির সঙ্গে সমঝোতা করে উন্নয়নের বাংলাকে অস্থির করার চেষ্টা করছে তখন সমস্ত চক্রান্তের জবাব উন্নয়ন দিয়েই দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আমার জীবনে আমি আরও দু’টি ঐতিহাসিক জনসভা দেখেছি ব্রিগেড ময়দানে যার একটি হল সোভিয়েত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোসিগিন, বুলগানিন ও ইন্দিরা গান্ধীর সভা৷ অসম্ভব জনসমাবেশ হয়েছিল ব্রিগেড ময়দানে।তখন আমি ছোট তাই মাঠের মধ্যে না ঢুকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সীমানা পাঁচিলের উপর বসে দেখেছিলাম৷ পরবর্তীকালে ইন্দিরা-মুজিবের সভা হয়েছিল ব্রিগেড ময়দানে৷ বিশাল সমাবেশ হয়েছিল দুই নেতা-নেত্রীর সমাবেশে কিন্তু ১৯ জানুয়ারির ২০১৯-এর সভা সর্বকালের রেকর্ড সভায় পরিণত হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস

বাংলার মানুষ চায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের চালকের আসনে বসুক৷ তারা বিশ্বাস করে ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কোনও মূল্যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার মানুষ নন৷ তিনি যা বিশ্বাস করেন সেটাকে বাস্তবায়িত করার এক উদগ্র বাসনা তার অন্তরে কাজ করে৷ তিনি বোবা মেয়ে দীপালি বসাকের জন্য ছুটে গিয়েছেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিচারের আশায় কিন্তু পেয়েছেন লাঞ্ছনা। ‘No identity card no Vote’ নিয়ে লড়াই করেছেন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য৷ আবার বিনা বিচারে আটক বন্দিদের মুক্তির জন্য লাগাতার আন্দোলন করে কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করেছিলেন বন্দিদের মুক্তি দিতে৷ ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই আন্দোলন বাংলার মাটিকে রক্তাক্ত করে বামফ্রন্টকে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচলা করেছিল৷ সিঙ্গুরের আন্দোলন সর্বজনবিদিত৷ ২৬ দিন অনশন করে বাধ্য করেছিলেন বামফ্রন্ট সরকারকে তার আন্দোলনকে মান্যতা দিতে। নন্দীগ্রামের আন্দোলন ও নেতাইয়ের গণহত্যা ইতিহাসে এক ন্যক্কারজনক ঘটনা৷ নায়ক তৎকালীন বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কখনও লড়াইয়ের ময়দানে বামফ্রন্টের ফ্যাসিস্ট পুলিশ তার ওপর অত্যাচার করেছে আবার কখনও তিনি জয়ী হয়েছেন মানুষকে নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করে৷ মানুষ মমতা বন্দোপাধ্যায়কে বিশ্বাস করেছে এবং আস্থা জানিয়েছে তার প্রতিবাদী চরিত্রের জন্য৷

 

২০১১ সালে সব হিসাব ওলটপালট করে তিনি বাংলার ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন আর ২০১৬ শুধু রাজ্যের উন্নয়ন করে ২১১টি আসনে জয়ী হয়েছেন মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে মূলধন করে যুগ যুগ ধরে বাংলার উন্নয়নের কানাগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছে বামফ্রন্ট আর সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে টেনে তুলেছেন বাংলাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ সমাজের প্রতিটি ধর্ম, বর্ণ, জাতি, উপজাতি, সংখ্যালঘু ও ওবিসিদের জনা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছেন৷ কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করেছে জিএসটি-তে সবচেয়ে ভাল কাজ করেছে পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র পঞ্চায়েতেও প্রথম স্থান অধিকার করেছে সেই পশ্চিমবঙ্গ। এর আগে গরিবদের গৃহনির্মাণ, গ্রামীণ সড়ক ও নির্মল বাংলা অভিযানে (স্বচ্ছ ভারত অভিযান) প্রথম স্থান অধিকার করেছে পশ্চিমবঙ্গ। বিদ্যুতে স্বল্প সময়ে বিদ্যুৎ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলা এক নম্বর স্থানে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প কন্যাশ্রী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শিরোপা পেয়েছে৷ সম্প্রতি কৃষক কল্যানে কৃষকবন্ধু প্রকল্প ঐতিহাসিক৷ জিএসডিপি বৃদ্ধি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা, পরিকল্পনা ও মূলধনী ব্যয়ে ব্যাপক বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান, মহিলাদের সশক্তিকরণ, সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের সমাজের মূলস্রোতে আনার জন্য ব্যাপক আর্থিক সহযোগিতা, কৃষকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পশ্চিমবঙ্গকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান এনে দিয়েছে৷ স্কচ নামক প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গকে দেশের এক নম্বর রাজ্যের শিরোপা দিয়েছে৷ একদিকে রাজ্যের অগ্রগতি ও উন্নয়ন অন্যদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদিপরিচালিত এনডিএ সরকার৷ ব্যর্থতা ঢাকতে গিয়ে এবং রাজনৈতিক সাফল্য পাওয়ার জন্য বিজেপি ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে যা ভারতের পক্ষে ভয়ংকর বিপজ্জনক কারণ। একবার ভারত বিভাজিত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে তারপর দীর্ঘ পরম্পরা মেনে দেশের সংবিধান সব ধর্ম, সব জাতি ও উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়েছে। সব জাতি সব ধর্মের মিলনে নতুন ভারত গড়ে উঠেছে যাকে রক্ষা করতে হবে জীবন দিয়ে

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা বিশ্বে বন্দিত কারণ এত জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে যে ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে তা আজ নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে বিজেপি পরিচালিত নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে। কেন্দ্রীয় সরকারের ভ্রান্ত আর্থিক নীতি, সামাজিক অভিমুখ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারা দেশে সবচেয়ে তীব্র সমালোচক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি বিজেপির প্রাক্তন মন্ত্রী যশবন্ত সিনহা বলেছেন, মমতা দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য৷ নরেন্দ্র মোদি ও তার দোসর অমিত শাহ এবং বিজেপি দল হিসাবে উন্নয়নকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক লড়াইতে না নেমে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফসল তোলার যে চেষ্টা করছেন তা পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে৷ এবার ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনেও প্রমাণিত হবে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ধর্ম যার যার-উৎসব সবার৷ এটাই হবে সারা ভারতের শ্লোগান৷ ধর্মান্ধতার অন্ধকূপে নতূন করে ভারতকে ডুবিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সারা ভারতের ২২ জন সর্বভারতীয় নেতার সামনে ব্রিগেডের সভায় প্রমাণ করতে হবে দেশে নেতা একজনই যিনি হৃদয়বান মানুষ হিসাবে, প্রশাসক হিসাবে এই মুহূর্তে দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারেন৷

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers