সাম্প্রদায়িক বিভাজন করার উদ্দেশ্যেই নাগরিকত্ব বিল

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

তীর্থ রায়

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একটি রাজনৈতিক দল কতটা বেপরোয়া হতে পারে, তার প্রমাণ মিলল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের মধ্য দিয়ে। সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক বিভাজন করার উদ্দেশ্যেই এই বিল তৈরি করেছে কেন্দ্র সরকার। ভারতের সংবিধান ও গণতন্ত্রের ভিত্তিই হল ধর্মনিরপেক্ষতা। যে ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঐতিহ্যকে গড়ে দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম, বাবাসাহেব আম্বেদকররা। জাতীয়তাবাদের এই আদর্শের ভিত্তিই হল ধর্মনিরপেক্ষতা। যে দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশ ভাগ করা হয়েছিল, তা আমাদের পূর্বসূরিরা গ্রহণ করেননি। আমরা নিজেদের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্তরসূরি হিসাবে দেখি। এই জাতীয়তাবাদকে ধর্মনিরপেক্ষতার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। কিন্তু সেই ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে বিজেপি সরকার খানখান করে দিচ্ছে। এই প্রথম ভারতবর্ষে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। কোনও দেশে নাগরিকত্বের ভিত্তি যদি ধর্মীয় কারণ হয়, তাহলে সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা টিকতে পারে না। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে এইভাবে হাস্যাস্পদ করে বিজেপি আসলে দেশকে টুকরো টুকরো করতে চায়। আপাতত তাদের লক্ষ্য ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে ভূলুন্ঠিত করে ক্ষমতায় টিকে থাকা। প্রতিবেশী দেশের ধর্মীয় নিপীড়িতদের কথা বলে ভারতে ধর্মীয় কারণে একটি সম্প্রদায়কে তারা কোণঠাসা করতে চাইছে। এই কোণঠাসা করার লক্ষ্য সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ভোটে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করা। স্বাধীনতার পর ৭২ বছরে দেশে দ্বিতীয় কোনও সরকার নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসাবে এভাবে ধর্মীয় কারণকে টেনে আনার কথা ভাবেনি। কিন্তু বিজেপি এইভাবে ধর্মকে নাগরিকত্ব প্রদানের ভিত্তি করে দেশকে সেই সর্বনাশের দিকে ঠেলল।

দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের একজন প্রচারক। দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসে তিনি সেই প্রচারকের ভূমিকাই পালন করে চলেছেন। দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসে মোদি একের পর এক যে পদক্ষেপ করছেন, তা সম্পূর্ণত ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। আমরা রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের উত্তরসূরি হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকেই ভারতের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য হিসাবে বুঝেছি। মনীষীরা তাঁদের জীবন দিয়ে সমস্ত মানুষকে ভালবাসার শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। স্বাধীনতার পর দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মধ্য দিয়ে মনীষীদের দেখানো পথকেই আমরা পাথেয় হিসাবে বিবেচনা করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, দেশে এখন এমন একটি সরকার রয়েছে, যারা আমাদের সংস্কৃতির সমস্ত ঐতিহ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়। আজকের দিনে ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের আদর্শের কথা বলাই যেন অপরাধ হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে দেশ আগামিদিনে কোথায় পৌঁছবে, তা আমরা জানি না। ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে তার ধর্মনিরপেক্ষতাকেই ভারতের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য হিসাবে বুঝেছি। মনীষীরা তাঁদের জীবন দিয়ে সমস্ত মানুষকে ভালবাসার শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। স্বাধীনতার পর দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মধ্য দিয়ে মনীষীদের দেখানো পথকেই আমরা পাথেয় হিসাবে বিবেচনা করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, দেশে এখন এমন একটি সরকার রয়েছে, যারা আমাদের সংস্কৃতির সমস্ত ঐতিহ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়। আজকের দিনে ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের আদর্শের কথা বলাই যেন অপরাধ হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে দেশ আগামিদিনে কোথায় পৌঁছবে, তা আমরা জানি না। ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে তার ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই ভারতের মহান সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। বছরের পর বছর ভারতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে মিলেছেন। মহাভারতের এই মিলনতীর্থেই গড়ে উঠেছে আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ফলে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যর এই বৈশিষ্ট্যকে যদি আমরা শ্রদ্ধা না দেখাতে পারি, মর্যাদা না দিতে পারি, তাহলে ভারতবর্ষের ঐক্য থাকে না। ভারতবর্ষকে আমরা আর মিলনতীর্থ বলতে পারি না। বিজেপি সেই কাজটাই করতে চায়। শুধুমাত্র একটি গোষ্ঠীকে মদত দিয়ে তাদের ভোটকে সুনিশ্চিত করে বিজেপি নির্বাচনে জিততে চায়। নির্বাচনে জিতে কুর্সির দখল রাখতে চায়। কিন্ত একথা তারা মাথায় রাখছে না যে, এই পথে কুর্সির দখল রাখা সম্ভব হতে পারে না। কিন্তু দেশের ঐক্য ধরে রাখা যাবে না। কারণ বিজেপি যে আধিপত্যবাদ দেশের সব অংশের মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, তা কখনওই মানুষ মেনে নেবে না।

বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে মানুষ প্রতিবাদে সরব হয়েছে। এই প্রতিবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে। বিজেপি নেতৃত্ব জানেন না মানুষের এই প্রতিবাদ কোন পরিণতির দিকে তাদের ঠেলে নিয়ে যাবে। নাগরিকত্ব বিল সংসদে পাস করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, এরপর তাঁরা এনআরসি করবেন। এনআরসি করার লক্ষ্যই হল ধর্মীয় ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন করা। অমিত শাহ বলেছেন, “শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে তফাত রয়েছে।” নিশ্চিত করেই এই দুইয়ে তফাত আছে। কিন্তু কে শরণার্থী আর কে অনুপ্রবেশকারী, তা নির্ণয় করার ভিত্তি কখনও ধর্ম হতে পারে না। একটি বিশেষ ধর্মের লোক হলেই কেউ অনুপ্রবেশকারী হয়ে যায় না। আবার যারা শরণার্থী, তারা শুধুমাত্র কয়েকটি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারেন না। শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে চিহিত করতে হবে ধর্মীয় ভিত্তির বাইরে গিয়ে। মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে নির্ণয় করতে হবে কে অনুপ্রবেশকারী, আর কে শরণার্থী।

বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য হল ধর্মীয় পরিচয়কেই প্রাধান্য দেওয়া। এই প্রাধান্য দেওয়ার পিছনে মূল কারণই হল সমাজে মেরুকরণ ঘটানো। গত কয়েক বছর ধরে দেশে মোদি সরকার আসীন হওয়ার পর থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি নানা কায়দায় মেরুকরণ করার চেষ্টা চলছে। মেরুকরণ যত তীব্র ও তীক্ষ্ণ হবে, তত রাজনৈতিক ফায়দা বিজেপির। একটি রাজনৈতিক দল এইভাবে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য দেশকে টুকরো করে ফেললে তা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না। বিজেপির দেশকে ভেঙে ফেলার সমস্ত চেষ্টার বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আন্দোলনে নামতে হবে। বিজেপিকে রুখে দেওয়া সম্ভব না হলে দেশকে বাঁচানো যে যাবে না, সেই উপলব্ধি সমস্ত মানুষের হওয়া প্রয়োজন। অমিত শাহ বলছেন, নাগরিকত্ব বিলের পর এনআরসি হবে। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক আগেই ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, বাংলায় তিনি এনআরসি কিছুতেই হতে দেবেন না। জননেত্রী নাগরিকত্ব বিল প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, কোনওভাবে এনআরসির সঙ্গে আপস নয়। এনআরসি বিরোধী লড়াইয়ে জননেত্রী দেশের সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামার আবেদন করেছেন। মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া বিজেপির এই চক্রান্তকে রোখা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী শ্লোগান দিয়েছেন, ‘নো সিএবি, নো এনআরসি’। সিএবি তথা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এবং এনআরসিকে তিনি একই কয়েনের দুটি পিঠ মনে করেন। বাংলার জননেত্রী ঘোষণা করেছেন, তিনি থাকতে এই বাংলায় সিএবি ও এনআরসির নামে কারও গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের বাংলায় সব ধর্মের মানুষ সমানভাবে থাকবে বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে সংসদেও সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন তৃণমূলের সাংসদরা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভায় তাঁর দৃপ্ত ভাষণে জানিয়েছেন, বাংলায় কোনওভাবেই এনআরসি করতে দেওয়া হবে না। অভিষেক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এই বাংলা রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের। ফলে এই বাংলায় মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ঘটিয়ে যা খুশি তাই করা যাবে না। বাংলা যে মিলন ও ঐক্যের ঐতিহ্যকে যুগ যুগ ধরে বহন করে এনেছে, সেই ঐতিহ্যকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে। যারা মানুষের মধ্যে বিভাজনের মন্ত্র নিয়ে রাজনীতি করতে নেমেছে, তাদের এই বাংলা কখনওই প্রশ্রয় দেবে না। বাংলায় বিভাজন সৃষ্টি করাকে যারা নিজেদের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেছে, তাদের বুঝে নিতে হবে এই কাজ অত সহজ নয়। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিভাজনের শক্তিকে বাংলায় এক ইঞ্চিও জায়গা দেবেন না। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার যে ডাক দিয়েছেন, তা সমস্ত তৃণমূল কর্মীকে সফলভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে। দেশকে বাঁচাতে গেলে, দেশকে রক্ষা করতে গেলে অতীতের মতো ফের বাংলাকেই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল যে দেশকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র, সেটা বুঝতে হবে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial