সরকার পরিচালনায় দল ও জনগণের মৈত্রী একান্ত প্রয়োজন

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

আজ এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দকে বোঝালেন যে সংগঠনকে শক্তিশালী না করলে, জনগণের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন না করলে সমস্ত পরিশ্রম, সদিচ্ছা ও উন্নয়ন মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছবে না। ফলে মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। সমগ্র বাংলার মানুষ জানে মা-মাটি-মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রাজ্যে প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে যার ফলস্বরূপ পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা ও লোকসভায় দলের সাফল্য এসেছে। বিরোধীরা যতই বলুক মনে রাখতে হবে জনসমর্থন ছাড়া জোর করে এটা করা যায় না। তাহলে আমরা পরাজিত হইনি কিন্তু লোকসভায় আসন সংখ্যা কমে গেছে যার পিছনে মুখ্য কারণ হল অবশ্যই জনসংযোগ কমে গিয়েছে যার বিষময় ফল হল আসন সংখ্যা কমে যাওয়া।

বামফ্রন্ট বা যুক্তফ্রন্ট কীভাবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকল

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা দরকার। বামফ্রন্টে মুখ্য দল ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) যাদের কৌশল ছিল ভূমি সংস্কারের নামে অন্যের জমি দখল করে বর্গাদার বা দলীয় কর্মীদের বিতরণ কিন্তু তাদের জমি সংক্রান্ত সমস্ত কাগজ দলীয় কার্যালয়ে রেখে দিত। এমনকী ভোটার আইডেনটিটি কার্ডও দলীয় কার্যালয়ে রাখা থাকত। নির্বাচনের আগে ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোট নিত। তাদের বলা হত জমির কাগজ তারা পাবে না যদি না তারা ভোট দেয়। এর সঙ্গে দলীয় হার্মাদ বাহিনীর সাহায্যে এক ব্যাপক সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করত পুলিশ প্রশাসনের সাহায্যে। এর সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের জানালা দিয়ে অথবা চালের টালি খুলে দেখত কোন ভোটার কোথায় ভোট দিচ্ছে। এমনই এক সন্ত্রাসের পরিবেশে ভোটগ্রহণ হত বামফ্রন্ট আমলে। যারা চিহ্নিন্ত বামফ্রন্ট বিরোধী তাদের বাড়িতে সাদা থান পাঠিয়ে ভীত- সন্ত্রস্ত করে তুলত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিরুদ্ধেই অন্দোলন করেছেন কিন্তু যতক্ষণ না ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছে ততক্ষণ তৃণমূল কংগ্রেস আসন পেলেও সরকার গঠন করতে পারেনি। গরিব আদিবাসী ও তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে তাদের বাধ্য করা হত ভোটদানে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনে এই স্বৈরাচার, জুলুম ও অপদার্থতার কথা জানতে পারে মানুষ। যদিও এই দীর্ঘ পথে অসংখ্য কর্মীর প্রাণ গিয়েছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অনেকবার গুরুতর আহত হয়েছেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত সমস্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পদদলিত করে ওরা ক্ষমতায় থেকেছে।

মানুষ সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে ভয়কে জয় করে কীভাবে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করল

যতই সন্ত্রাস করুক মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারেনি। হাজরা মোড়, ২১ জুলাই, সুচপুর, ধানতলা, ঘোকসাডাঙা, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, ছোট আঙারিয়া প্রভৃতি স্থানে খুন, জখম, ধান লুঠ, জমি দখল, ডাকাতি করে সমস্ত বিরোধিতা স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত অত্যাচারকে উপেক্ষা করে লাগাতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছেন। জনগণের স্বাভাবিক প্রবণতা হল তাঁরা শান্তি চায় কিন্তু বাংলায় রক্তনদীর বন্যা দেখেছে বাংলার মানুষ এবং অবশেষে তারা বিদ্রোহ করে ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে উন্নয়ন ও শান্তির জন্য। ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মন্ত্রিসভা সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র, অবহেলিত এবং অত্যাচারিত মানুষের কল্যাণে নানা প্রকল্পের কাজ শুর করেন। রাজ্যের আয় বাড়িয়ে পরিকল্পনা বাড়াতে সক্ষম হন। উন্নয়ন সূচক বাড়তে থাকে। খাদ্যশস্য, মাছ, মাংস, ডিমের উৎপাদন বাড়তে থাকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠে ব্যাপকভাবে। কর্মসংস্থান হয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যে ও খাদ্যের উৎপাদনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। পরিকাঠামোয় গ্রামীণ রাস্তা ও গরিবদের বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে ভারতে এক নম্বর স্থানে পৌঁছয় বাংলা।

উন্নয়নের ফল ভোগ কি মানুষ পরিপূর্ণভাবে করতে পারল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের কোনও তুলনা হয় না। একটা ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যাপক ঋণ, রাজ্যে উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলার দরিদ্র মানুষের কথা মাথায় রেখে নানা প্রকল্প ঘোষণা করে গ্রাম-শহরের মানুষকে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। রাজ্যের আয় বৃদ্ধি, জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি হওয়া ঋণ শোধ করেও পরিকল্পনা ব্যয় বৃদ্ধি করে রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন পরিণত করেছেন। একটা জায়গায় কিছু সমস্যা তৈরি হয় যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে আসে। তা হল, একেবারে নিচের তলার মানুষ সরকারি প্রকল্প ও অন্যান্য সাহায্য পরিপূর্ণভাবে পাচ্ছেন না। কিছু কিছু অন্যায় করছেন দলের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ যা মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। ২০১৯-এর নির্বানের অনেক আগে থেকেই দলীয় কর্মীদের সতর্ক করেছিলেন। একথাও বলেছেন জীবনে বাঁচার জন্য কত ঐশ্বর্য লাগে? তিনি বারবার বলেছিলেন যে যাঁরা বিভিন্ন স্তরের নেতা তাঁদের স্বচ্ছ ও সাধারণ জীবনযাপন করতে হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল বেশিরভাগ কর্মী তাঁর নির্দেশ শুনলেও বেশ কিছু বিভিন্ন স্তরের নেতা তাঁর কথা না শোনার জন্য দলকে মাশুল গুনতে হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন আলো-অন্ধকার, ভাল-খারাপ, ন্যায়-অন্যায় সমাজে থাকবেই। কিন্তু মানুষ যাদের নির্বাচন করে তাদের কাছে কিছু প্রত্যাশা করে আর প্রত্যাশা পূরণ না হলে তারা মত পরিবর্তন করে। যা আজ পশ্চিমবাংলায় ঘটেছে। মানুষের সমর্থন কমেনি কিন্তু ভোটের নানা অঙ্কে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন কমেছে এবং অর্থের দাপটের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস পাল্লা দিতে পারেনি। রাজ্যে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তাতে আসন কমার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়বদ্ধ কর্মীর অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। কিছু কিছু ঘটনাকে বিজেপি প্রচার করেছে এমনভাবে যাতে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়। যথাযথ প্রচারেও তৃণমূল কংগ্রেস পাল্লা দিতে পারেনি ফলে কিছু আসনে তার প্রভাব ব্যাপকভাবে হয়েছে। আরও কিছু বিষয় আছে যার প্রভাবও নির্বাচনে পড়েছে। নির্বাচনে আসন বাড়বে আবার কমবে কিন্তু তার জন্য হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই। তৃণমূল কংগ্রেস লোকসভায় ১টি আসন থেকে ৩৪ আসন পেয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও, কর্মীদের নেত্রীর কথা শুনতে হবে এবং নির্দেশ কার্যকর করতে হবে। মনে রাখতে হবে বিভিন্ন নদীর উৎসমুখ থেকে জল সমতলে নামে যা মানুষের জীবন বাঁচায় কিন্তু নদীর উৎসমুখে জল থাকলেও তা যদি যথাযথভাবে সমতলে না আসে, পথেই অবরুদ্ধ হয়ে যায় তাহলে মানুষের জীবনে সংকট নেমে আসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নানা প্রকল্প করেছেন কিন্তু তা জনগণের কাছে এসে কোনও কোনও ক্ষেত্রে অবরুদ্ধ হয়েছে। ফলে মানুষের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় কী?

দলের আদর্শের কাছে দায়বদ্ধ কর্মীই দলের সম্পদ। আমরা প্রায়ই বলে থাকি দলের কর্মীরা দলের সম্পদ কিন্তু কিছু কর্মী ও নেতার পদস্খলন দলের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করেছে। বন্যায় গ্রাম-শহর ডুবে যায় কিন্তু বাঁধ দিয়ে, জলাশয় খনন করে, খাল কেটে সেই জলকে ধরে রেখে চাষ হয়। অর্থাৎ একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যে মানুষের জীবনে সংকট ডেকে আনে সেই জলই আবার শস্য ফলানোর জন্য ব্যবহার করে মানুষ বেঁচে থাকে। তৃণমূল কংগ্রেসে যে বিপুল মানুষ এসেছেন তাঁদেরকেও যথাযথভাবে একটি সুনির্দিষ্ট পথে গড়ে তুলতে না পারলে তাঁরাও পরিশেষে দলের বোঝা হয়ে দাঁড়াবেন। জনগণ ও দলের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে (Party People Partnership) তিনটি P হল দলের ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র। সর্বস্তরের কর্মী ও নেতাদের প্রথমে বুঝতে হবে তারা যে দলের কর্মী তাদের আদর্শ কী? দলনেত্রী অনেকবার বলেছেন অনেক বই পড়ার দরকার নেই, অনেক তত্ত্ব ঘাঁটার প্রয়োজন নেই, শুধু তিনটি বিষয়কে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে হবে। তা হল সরকার হবে-For the People, Of the People এবং By the People। অর্থাৎ সরকার হল জনগণের জন্য, জনগণের এবং জনগণের দ্বারা। এই মহাসত্যকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক কর্তাদের (Administration) ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দলীয় কর্মীদের, নেতাদের প্রত্যেককে চেক ভাল্ব এর ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে সরকারি প্রশাসন সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে কিন্তু দলের কর্মী ও নেতারা সেই সিদ্ধান্তকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়। একইসঙ্গে তারা প্রহরীর মতো লক্ষ  রাখবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে কি না। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় জনকল্যাণমূলক কাজের এবং প্রশাসন নির্দেশ দেয় কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ হল কি না, প্রশাসনিক অদক্ষতা, টিলেমি ও ব্যর্থতাকে লক্ষ রাখবে দল কারণ প্রশাসন কখনও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হয় না, দায়বদ্ধ হয় দল যার দায়িত্ব থাকে জনগণের আস্থাভাজন হওয়া ।

সরকারি দল ও জনগণের মধ্যে সেতুর ভূমিকা রাজনৈতিক দলের (Party is a bridge between The People and The Government)

একটু সেতু মানুষকে যাওয়া ও আসার সুযোগ বৃদ্ধি করে। সরকারি সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে আন্তরিকতার সঙ্গে পৌঁছে দেবে সরকারি দল এবং জনগণের কোনও বিষয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হলে তা সরকারকে জানানোর দায়িত্ব সরকারি দলের। এমনি করেই দল ও জনগণের মধ্যে মৈত্রীর বন্ধন গড়ে তুলে সরকার দল তার আদর্শকে রূপায়ণ করবে। মনে রাখতে হবে কোনও তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, চলমান জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও সততাই দলকে অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial