সংবিধান কতটা অধিকার দিয়েছে রাজ্যপালকে

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

একটি অত্যন্ত বিতর্কিত সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে আলোচনা আজকের বিষয়। সম্ভবত এই উত্থাপন করার প্রয়োজন ছিল না যদি না বর্তমান মাননীয় রাজ্যপাল অতি সক্রিয়তার পথে হাঁটতেন। আমরা মনে করি, রাজ্যপাল পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং সব পক্ষকেই এই বিষয়টি মনে রেখে চলতে হবে। কারণ পদটি সাংবিধানিক। এই পদটি নিয়ে নানা রাজ্যে বিভিন্ন সময়ে আদালতে সওয়াল জবাব হয়েছে কিন্তু আদালত পরিশেষে সংবিধানকেই গুরুত্ব দিয়েছে।

সংবিধানের ১৫৩ ধারায় বলা হয়েছে প্রতিটি রাজ্যে একজন করে রাজ্যপাল থাকবেন। তবে একাধিক রাজ্যে একই ব্যক্তি, রাজ্যপাল হিসাবে কাজ করতে পারবেন এবং উপরোক্ত ধারার বলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে না। পশ্চিমবঙ্গে কেশরীনাথ ত্রিপাঠী অবসর নেওয়ার পর দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসাবে নিয়োগ করেন। একজন রাজ্যপালের কার্যকাল পাঁচ বছরের জন্য। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্রকৃতপক্ষে কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি নিয়োজিত প্রভিনশিয়াল কনস্টিটিউশন কমিটি প্রথমে সুপারিশ করেছিল যে রাজ্যপাল রাজ্যের নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত হবে। কিন্তু একটি রাজ্যে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী এবং নির্বাচিত রাজ্যপাল থাকলে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য হবেন। এরপর খসড়া সংবিধানে বলা হয় বিধায়করা চারজনের একটি প্যানেল থেকে রাজ্যপাল নির্বাচিত করবেন। বস্তুতপক্ষে উপরোক্ত দুটি প্রস্তাবই বাতিল হয়ে যায় এবং সংবিধানে রাষ্ট্রপতি দ্বারা রাজ্যপাল নিয়োগ হবে বলে লিপিবদ্ধ করে খসড়া সংবিধানের অন্তর্ভূক্ত করা হয়, যা বর্তমানে বহাল রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারই একজন রাজ্যপালকে নিয়োগ করে। রাজ্যপাল তাঁর যে কোনও কাজ যা তিনি নিজের ইচ্ছায় করেন তাঁর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই পদ্ধতিতে রাজ্যপালের সমতুল্য পদাধিকারী নিয়োগ করা হয়। কানাডায় লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা অস্ট্রেলিয়ার গভর্নর একই পদ্ধতিতে নিয়োগ করা হয়। সংবিধানের ১৫৫ ধারায় রাজ্যপাল নিয়োগ করবেন দেশের রাষ্ট্রপতি এবং তিনি যদি চান তাহলে তাঁর ইচ্ছায় অপসারণ করতে পারেন। সংবিধানের ১৬৩ (১) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিমণ্ডলীর সদস্যরা রাজ্যপালকে সাহায্য ও পরামর্শ দেবেন তাঁর সংবিধানে বর্ণিত কাজ করার জন্য। এছাড়া রাজ্যপাল তাঁর ক্ষমতা বলে উপরে বর্ণিত সংবিধানের নির্দেশ অথবা পারবেন যা সংবিধানসম্মত। সংবিধানের ১৬৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, যদি রাজ্যপাল উপরোক্ত ধারা অনুযায়ী কোনও কাজ করেন প্রশ্ন করা যাবে না। অর্থাৎ রাজ্যপাল অনুযায়ী কাজ করবেন এবং সেই কাজ সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। সংবিধানে ১৬৩(৩) ধারায় বলা হয়েছে, যদি মন্ত্রিমন্ডলী কোনও প্রশ্ন উথাপনে করেন তা কোনও কোর্টেই অনুসন্ধান করা যাবে না। একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে রাজ্যপাল মূলত মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিমণ্ডলীর পরামর্শে ও সাহায্যে কাজ করবেন। কিন্তু যদি নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করেন তাও সংবিধানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই করতে হবে। রাজ্যপাল রাজ্যের সাধারণ এক্সিকিউটিভ যিনি মন্ত্রিমণ্ডলীর পরামর্শে কাজ করেন তিনি প্রয়োজন মনে করলে মন্ত্রিমণ্ডলীকে পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু তা মানার জন্য জোর করতে পারেন না। কারণ মন্ত্রিমণ্ডলী মানুষের কাছে দায়বদ্ধ কিন্তু রাজ্যপাল নন।

সংবিধান কতকগুলি ক্ষেত্রে রাজ্যপালের একক ক্ষমতা দিয়েছে যেমন (১) মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ (২) মন্ত্রিত্ব বাতিল (৩) বিধানসভা বাতিল (৪) বিশেষ ক্ষেত্রে রাজ্যপাল মন্ত্রিমণ্ডলীর পরামর্শ শুনতে বাধ্যনন। যখন ১৯৪৭ সালের প্রিভেনশান অফ করাপসন অ্যাক্ট অনুযায়ী কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে দোষ প্রমাণিত। কিন্তু মন্ত্রিমণ্ডলী তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নিষেধ করছেন। এই প্রসঙ্গে রাজ্যপালকে ক্ষমতা দেওয়ার কারণ হল মন্ত্রিমণ্ডলী মন্ত্রীর অপরাধের বিচার করতে পারে না। বিচার সংবিধানের ২৩৫ ধারা অনুযায়ী যখন কোনও উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের জজের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তখন উচ্চ আদালতের বিচার অনুযায়ী রাজ্যপালকে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে মন্ত্রিমন্ডলীর সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নন রাজ্যপাল। সংবিধানের ১৬৩ ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানে বর্ণিত রাজ্যপালের ক্ষমতা পালনে রাজ্যপাল মন্ত্রিমণ্ডলীর পরামর্শ মানতে বাধ্য নন। বিষয়গুলি হল__ (১) রাজ্যে বিশেষভাবে শান্তি বিঘ্নিত হলে রাজ্যপাল তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন (২) রাজ্য মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করা (৩) বিধানসভা বাতিল করেতে পারবেন (৪) নির্বাচন তদারক, পথপ্রদর্শন এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন (৫)রাজ্যের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান এবং অ্যাডভোকেট জেনারেলকে নিয়োগ করা। উপরে যে সকল ক্ষমতা রাজ্যপালকে দেওয়া হয়েছে প্রায় সবগুলিই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকেই পালন করতে হবে। সংবিধানের ১৬৬ ধারায় বলা হয়েছে রাজ্য সরকারকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা রাজাপালের নামেই প্রয়োগ করতে হবে। রাজ্য সরকারের আদেশ এবং অন্যান্য কার্যকলাপ রাজ্যপালের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে এবং সেই আদেশকে কোনও স্তরে প্রশ্ন করা যাবে না। রাজ্যপাল রাজ্যের কর্মপদ্ধতি আরও সরলীকরণ করার জন্য নিয়ম তৈরি করতে পারবেন যা মন্ত্রিমণ্ডলীকে জানানো হবে।

সংবিধানের ১৬৭ ধারায় বলা হয়েছে (১) মন্ত্রিসভার গৃহীত সিদ্ধান্ত রাজ্যপালকে জানাতে হবে এবং কোনও আইন প্রণয়ন করতে হলে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে জানাবেন। প্রশাসন পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাজ্যপালকে জানাতে হবে। কোনও মন্ত্রী যদি কোনও সিদ্ধান্ত নেন যা মন্ত্ৰিমণ্ডলী অনুমোদন করে না সেই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজ্যপালকে জানাতে হবে। সংক্ষিপ্তভাবে সংবিধানে বর্ণিত বিষয়গুলি তুলে ধরা হল যা রাজ্যপাল এবং রাজ্য সরকারকে সংবিধানে নির্দেশ দিয়েছে। যেভাবে কাজ করছেন তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সহমত হতে পারছেন না, তার কারণ পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ২১ জন রাজ্যপালকে দেখেছে। কিন্তু বর্তমান রাজ্যপাল সকলের থেকেই আলাদা । অতীতে রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্য সরকারের মতানৈক্য হয়েছে কিন্তু যে পদ্ধতিতে বর্তমান রাজ্যপাল তাঁর দায়িত্ব পালনের নামে সরাসরি রাজ্য সরকারের সঙ্গে “কোল্ড ওয়ার” চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি রাজ্যপাল হয়ে এসে প্রথম গেলেন বিজেপি সাংসদদের বাড়ি ভাটপাড়ায়। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপির কেন্দ্ৰীয় মন্ত্রীকে উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু পশ্চিমবাংলায় বহু তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী মারা গিয়েছেন বিজেপি কর্মীদের আক্রমণে তাঁদের বাড়ি গেলেন না। সহানুভূতিও জানালেন না। কাশ্মীরে যখন উগ্রপস্থীদের হাতে পাঁচজন বাঙালি শ্রমিক খুন হলেন তখনও কোনও সমবেদনা জানালেন না এবং তাঁদের বাড়িতেও গেলেন না। রাজ্যপাল সারা রাজ্য ঘুরতে শুরু করেছেন। কিন্তু কেন? আগেই আলোচনা করেছি যে রাজ্যপাল নির্বাচিত হন না, রাষ্ট্রপতির দ্বারা নিয়োজিত হন।

রাজ্যের মানুষের কাছে মন্ত্রিমণ্ডলী ও সরকার দায়বদ্ধ এবং রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দায়বদ্ধ। তাঁর কোনও পরামর্শ থাকলে তিনি রাজ্য সরকারকে দিতেই পারেন কিন্তু ভারতবর্ষের কোনও রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন স্থানে সভা করছেন। মনে রাখতে হবে, রাজ্যপাল অত্যন্ত সম্মাননীয় পদ এবং সেই পদের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব রাজ্যপালের নিজের। রাজ্যে সরকার একটি পক্ষ, বিরোধী দলগুলি আরেকটি পক্ষ যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাসম্মত ও সাংবিধানিক কিন্তু রাজ্যপাল তৃতীয় পক্ষ হিসাবে অবতীর্ণ হোন এটা বাংলার মানুষ অনুমোদন করে না। সারা দেশে রাজ্যপালের ছবি রাস্তায় কোথাও লাগানো হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল প্রশ্ন তুলেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ছবি লাগানো আছে কিন্তু রাজ্যপালের ছবি কেন নেই। এই উক্তি রাজ্যপালের পদমর্যাদার প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান। তিনি বলেছেন, যে তিনি সারা বাংলায় ঘুরে বেড়াবেন কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ নিয়ে। মনে রাখতে হবে, তাঁর এই ভ্রমণে যে খরচ হবে তা রাজ্য সরকারকেই বহন করতে হবে। যে ভ্রমণে রাজ্যের মানুষ উপকৃত হবে না সম্ভবত একটি দল উপকৃত হবে সেই ভ্রমণ রাজ্য সরকারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা । রাজ্যপাল শিশুসুলভ আচরণও করছেন। তিনি হেলিকপ্টার চেয়ে পাননি বলে গাড়িতে ফরাককা গিয়ে গায়ে ব্যথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। রাজ্যপাল তাঁর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে কাজ করুন কিন্তু রাজ্যে সমান্তরাল প্রশাসন চালাবার চেষ্টা করলে সফল হবেন না এটা তাঁর জানা উচিত। বাংলার মাটি চিন্তাবিদ, অর্থনীতিবিদ, বিশ্বকবি, বীর সন্ন্যাসী, সাধক, লেখক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, খেলোয়াড়-সহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট মানুষের জন্মস্থান। আমরা তাঁদের আদর্শের ধারক ও বাহক। এখানে চমকের রাজনীতি ব্যর্থ হবেই।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial