শীতে ফুসফুসের সমস্যা

ডাঃ শান্তনু সেন

বছরে দশ মাস যেমন তেমন কাটুক কিন্তু শীতের এই দুটি মাসে সবাই একটু নিরোগ থাকতে চান। অথচ ছোটোখাটো,আপাত নিরীহ কিছু রোগ এই সময়ে জটিলতা বাড়ায়। শীতকালে যে সমস্যা ডেকে আনে তা হল হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়া, মাথা ভারী, জ্বর, গলা ব্যথা, বাতের যন্ত্রণা, হাম, মাম্পস, পক্স, চর্মরোগ, বুকের অসুখ এবং অবশ্যই হাঁপানি বা অ্যাজমা। এর কারণ পরিবেশ দূষণ, দূষণ থাকে সারা বছরে। কিন্তু অন্য সময় বাতাস থাকার জন্য রোগ জীবানু দূরে থাকে, কিন্তু এখন তারা আমাদের কাছে থাকে তাই শ্বাসপথে সহজেই ঢুকতে পারে। এছাড়া, তার সঙ্গে শীতকালে বাড়ে ভাইরাসের দাপট। অ্যাজিনো, রাইনো, ইসো- কত বাহারি তাদের নাম।নাক-মুখ দিয়ে এই ভাইরাসগুলি ঢুকে পড়ে নাক ও গলার কোমল শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে বাসা বাঁধে। তখন শ্বাসপথ এই ভাইরাস গুলির সঙ্গে যুদ্ধ করে। তারই বহিঃপ্রকাশ হাঁচি, কাশি,নাক দিয়ে জল ঝরা ইত্যাদি। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার থাকলে সামান্য হাঁচি,কাশিতেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ থাকে, নয়তো ফ্যারিনজাইটিস, সাইনাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস ইত্যাদির আক্রমণে শীতের সুখ রোগ জর্জরিত হয়ে পড়ে।

শীতে বুকের অসুখ বেড়ে যায়

বিশেষ করে যাদের হাঁপানি আছে, তাদের কাছে শীতকাল খুব আতঙ্কের কাল। বিশেষত শ্বাসপথজনিত সমস্ত অসুখই বেড়ে যায়।
ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের অসুখ, নিউমোনিয়া, নিউমোনাইটিস- সবই বাড়ে শীতে। বেড়ে যায়, অ্যালার্জি, ভাইরাসের সংক্রমণ। সক্রমণ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে তরল বা ঘন দুর্গন্ধযুক্ত কফ কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসে। এর কারণ ফুসফুস ভাইরাসের আক্রমণ। এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া দরকার। শ্লেষ্মা তরলকারী মিউকোলাইটিক এবং ব্রঙ্কালের সংকোচন বা স্প্যাজম কমাতে ব্রনকোডাইলেটর জাতীয় ওষুধ দিতে হবে। অবহেলা করলে ফুসফুসের সংক্রমণের পরিণতি ভয়ংকর হয়। শীতের সময় অনেক বয়স্ক মানুষই হাঁপানি ছাড়াও বুকের অসুখে মারা যায়। শিশুদেরও তাই। শীতে বুকের অসুখে রক্ত পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করা দরকার সঠিক চিকিৎসার জন্য।

শিতে হাঁপানি বাড়ে। হাঁপানি সৃষ্টিকারী নানা পদার্থ এই সময়ে প্রচুর পরিমাণে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। এদের বলে অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডির বিক্রিয়ায় এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়, যাদের বলে হিস্টামিন। এই হিস্টামিন শ্বাসনালীর বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার উপর জমা হয়ে তাদের সংকোচন ঘটায়, যাকে বলে বক্ষোস্প্যাজম। এর ফলে সরু হয়ে যাওয়া শ্বাসপথ দিয়ে প্রয়োজনীয় বাতাস ফুসফুসের বায়ুথলিতে পৌঁছতে পারেনা। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। তীব্র শ্বাসকষ্টের সময় বুক হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করে। তখন দরকার অক্সিজেন। অ্যালার্জি ঘটিত এই রোগটির জন্য দায়ী নানা ধরনের অ্যালার্জেন। যারা থাকে ধুলোয়, ধোঁয়ায়, ফুলের রেণুতে, ডিম-বেগুন, চিংড়ি-ইলিশ-সহ নানা খাদ্যদ্রব্যে। অ্যালার্জি কী খাবারের দ্বারা হয় বা কোন জিনিসে হয় তার তালিকা দীর্ঘ তাই শীতে নিজেকে কীভাবে সাবধানে রেখে শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা নিজেকেই নিতে হবে।

  • ঠান্ডা লাগাবেন না। সকালে-সন্ধ্যায় গরম জামাকাপড়, গলায় মাফলার, কানঢাকা টুপি, পায়ে মোজা পরবেন।
  • ঘরে খালি পায়ে হাঁটবেন না। চপ্পল ব্যবহার করবেন।
  • উষ্ণ জল পান করবেন। রাতে ফ্লাক্সে রাখা উষ্ণ জল খাবেন দরকার মতো।
  • অ্যালার্জির উৎস জানা থাকলে তাকে এড়িয়ে চলে ভাল থাকুন।
  • রোজ সকালে বিছানা ছাড়ার পর তোষক,লেপ,বালিশ কাউকে দিয়ে বাড়িয়ে নিয়ে ঘন্টা তিনেক রোদে দিয়ে দেবেন।
  • যে ঘরে শোবেন রাত্রিবেলা, সেই ঘরের একটি জানালার পাল্লা যেন খোলা থাকে। ভারী পর্দা দিয়ে খোলা জানালা ঢেকে রাখবেন।
  • হালকা খাবার খান। ফ্রিজের ঠান্ডা খাবার একদম খাবেন না। দুপুরে ও রাতে একই সময়ে প্রতিদিন খাওয়ার চেষ্টা করবেন।
  • খোলামেলা পরিবিশে থাকবেন। অহেতুক টেনশন বাড়াবেন না। যোগাসন করুন নিয়মিত।
  • প্রয়োজনীয় ওষুধ ডাক্তারের নির্দেশমতো সঠিকভাবে খাবেন। অকারণে বা নিজের বুদ্ধিতে প্রেসক্রাইব ওষুধ বন্ধ করবেন না। অ্যাকিউট হাঁপানি রোগীদের অক্সিজেন সিলিন্ডার কাছে থাকা দরকার।
  • ঋতু পরিবর্তনের সময় তাপমাত্রা ও পরিবেশের পরিবর্তনে অনেক সমস্যা আমাদের শরীরকে ব্যতিব্যস্ত করে, তখন নিজেকে সতর্ক হয়ে চলতে হবে এবং অবশ্যই সুস্থ থাকা দরকার।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers