শিল্প নিশ্চিত ঠিকানা বাংলাই

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

২০১৯ সাল। আবার বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে তবে এবার কলকাতায় নয়, দিঘায় যে নতুন কনভেনশন সেন্টার তৈরি হয়েছে সেখানেই। এক মনোময় পরিবেশে দিঘার সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে অপরূপ পরিবেশে আধুনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমুদ্র তীরবর্তী সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ করেই গড়ে তোলা হয়েছে এই কনভেনশন সেন্টার। দেশ-বিদেশের শিল্পপতিদের আহ্বান জানানো হয়েছে এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য। একটা অত্যন্ত জরুরি তা হল শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা যা দেশের তীব্র মন্দার বাজারেও শিল্পপতিদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।

পশ্চিমবাংলা একসময় দেশের অগ্রগণ্য রাজ্য ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং, পাট, চা, সুতা ও ওষুধ শিল্পে ভারতে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল পশ্চিমবাংলা। পশ্চিমবঙ্গে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনেকাংশেই সাহায্য করেছিল শিল্পস্থাপনে। ঐতিহাসিকভাবে কলকাতা ভারতে শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। পশ্চিমবাংলা নদীমাতৃক, খনিজ পদার্থ রয়েছে বিপুলভাবে এবং কৃষিতেও পশ্চিমবাংলা উন্নত রাজ্য ছিল। সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সেকথাও সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা প্রয়োজন। ১৯৭৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সরকার ছিল কিন্তু সরকারের কোনও ঋণ ছিল না। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঋণ নেওয়া শুরু হয় এবং ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট শাসনের অবসান হল তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঋণ বেড়ে দাঁড়াল ২ লক্ষ ৩ হাজার কোটি। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেই ভাবল বিপ্লব আসন্ন। শুরু হল কারখানায় বামফ্রন্ট সেই হিংসাত্মক আন্দোলনকে সমর্থন জানাল। ফলে ১৯৬৭-৬৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে Erotion of Capital শুরু হয়েছিল তা আরও বাড়ল। ফলে এক এক করে কল-কারখানা পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত হতে শুরু করল এবং বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল।

পশ্চিমবাংলা ভারতের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ল। বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার জন্য ছাত্ররা ভারতের অন্য রাজ্যে পাড়ি দিল। দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনগুলির অধিকাংশ যাত্রী দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া শুরু করল কারণ সময়ের সঙ্গে তাল রেখে চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনও উন্নতি হল না। লাল পতাকা পুঁতে জমি দখল এবং বিরোধিতা করলে ব্যাপক সন্ত্রাসের বাংলার মাটি রক্তাক্ত হল। ফলস্বরূপ কৃষি উৎপাদনও ব্যাহত হল। সামগ্রিকভাবে খুন, জখম, অগ্নিসংযোগ, লুঠ রাজ্যে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বিলীন করে দিল। রাজ্যের মানুষকে ভুল বুঝিয়ে, নির্বাচন দফতরকে কব্জা করে এবং সন্ত্রাস করে ৩৪ বছরের বেশি সময় শাসন ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। এত অত্যাচারের পরেও মানুষ কোনও বিকল্প যতদিন না পেয়েছে ততদিন বামফ্রন্টকে সমর্থন করেছে। এরই মধ্যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উত্থান হল আপসহীন সংগ্রামী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মানুষের কল্যাণে, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন বাংলার মানুষের মনে আস্থা ও বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হলেন মা-মাটি-মানুষের সরকারের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগেই কেন্দ্রীয় সরকারের রেল, যুব কল্যাণ, স্পোর্টস প্রভৃতি দফতরের মন্ত্রী হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাকেই নেতা বলা যায় যে হৃদয়বান, দূরদর্শী এবং লক্ষ্যে স্থির। ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছে পশ্চিমবাংলা।

একটি পরিকল্পিত অর্থনীতি তৈরি করে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন ঘটছে বিভিন্ন দফতরের ক্ষেত্রে। একটা সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা হল “শান্তি প্রতিষ্ঠা উন্নয়নের প্রধান শর্ত”। তিনি পাহাড় ও জঙ্গলমহলে শান্তি স্থাপন করে রাজ্যের উন্নয়নে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন রাইটার্স বা নবান্নে বসে ভিডিও কনফারেন্স করা সম্ভব হবে না। তিনি জেলায় জেলায় অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মিটিং করে সরেজমিনে রাজ্যের অগ্রগতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। দলের নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসন সতর্ক হয়েছিল কারণ কোনও কারণেই বা অজুহাতে উন্নয়ন শ্লথ বা বন্ধ করা যাবে না। তিনি বুঝেছিলেন, সরকারের আয় না বাড়াতে পারলে রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়, কারণ সে ঋণ রেখে গিয়েছে বামফ্রন্ট তা শোধ করতেই আয়ের ৯০ শতাংশ চলে যাবে ফলে পশ্চিমবাংলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। আজ যখন পঞ্চম বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলন তুলনায় ৩ গুণ বেড়েছে অর্থাৎ ২০১০-১১ সালে ছিল ২২,০০০ কোটি টাকা আর ২০১৮-১৯ সালে সেই আয় দাঁড়িয়েছে ৬৫,৩৪১ কোটি টাকা। আয় বৃদ্ধির পরেও পরিকল্পনা বহির্ভূত ব্যয়, ঋণ পরিশোধ- সহ বিভিন্ন ব্যয়ের জন্য কর আদায়ে ঘাটতি ২০১০- ১১র তুলনায় ৩.৯ ভাগ কমাতে সক্ষম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০১০-১১ সালে কর ঘাটতি ছিল ৩.৭৫ শতাংশ, যা ২০১৭-১৮ কমে হয়েছে ০.৯৬ শতাংশ। কোনও রাজ্যই পরিকল্পনা খাতে যদি ব্যয় বাড়াতে সক্ষম না হয় তাহলে রাজ্যের অগ্রগতি স্তব্ধ হয়ে যাবে। ২০১০-১১ সালে রাজ্যের পরিকল্পনা খাতে ব্যয় ছিল ১১৮৩৭ কোটি যা ২০১৮-১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ৭১,১১৩ কোটি অর্থাৎ বামফ্রন্টের তুলনায় ছয়গুণ বৃদ্ধি। একই সঙ্গে রাজ্যের মূলধনী ব্যয় মাত্র ৮ বছরে বৃদ্ধি হয়েছে ১১ গুণ অর্থাৎ ২০১০-১১ সালে ছিল ২২২৫ কোটি এবং ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ২৩, ৭৮৪ কোটি টাকা।

রাজ্যে কৃষি ও কৃষি সম্পর্কিত ব্যয় ২০১০-১১ সালে ছিল ৩,০২৯ কোটি যা ২০১৮-১৯ হয়েছে ২৮,৩০২ কোটি টাকা অর্থাৎ নয় গুণ বৃদ্ধি। সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে ৪.৫ গুণ অর্থাৎ ২০১০-১১ সালে ছিল ৬৮৪৫ কোটি যা ২০১৮-১৯শে হয়েছে ৩১,০৬০ কোটি টাকা। গ্রামীণ রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে সারা ভারতে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থান অধিকার করে ছিল। ২০১১ সালের আগে হয়েছিল ২৯,৭০৫ কিলোমিটার এবং ২০১৯ সালে আরও ৭৫,৭৫৫ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালের আগে গরিব মানুষদের জন্য বাড়ি তৈরি হয়েছিল মাত্র ১১ লক্ষ আর ২০১১ থেকে ২০১৯- এর মধ্যে হয়েছে আরও ২৭.৫৩ লক্ষ। রাজ্যের মানুষদের খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য ১০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে নয় কোটি মানুষকে খাদ্যসাথী প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে ২০১১ সালে ছিল ৬৫ লক্ষ আর ২০১৯ সালে ১ কোটি ৯৪ লক্ষ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। উপরের তথ্যগুলি প্রমাণ করে, কত দ্রুত রাজ্য এগিয়ে চলেছে। একটি রাজ্যে শিল্পে বিনিয়োগের কতকগুলি শর্ত থাকে যেমন (১) শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, (২) পরিকাঠামো অর্থাৎ রাস্তা, পানীয় জল, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদি, ৩) কৃষিতে উন্নতি, (৪) ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিক্যাল কলেজ, পলিটেকনিক, আইটিআই, (৫) গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে উপরোক্ত সব ক’টি শর্তই পুরণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। তিনি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নানা কল্যাণকর প্রকল্প গ্রহণ করেছেন বার দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে তা হল একটি শিশু জন্মগ্রহণ করলে একটি গাছ দেওয়া হবে। শিশুটি ১৮ বছর বয়স হলে গাছটি বিক্রি করতে পারবে, যার দাম ন্যূনতম দু’লক্ষ টাকা হবে। আবার যে কোনও ধর্মের মানুষের মৃত্যু হলে তাকে দু-হাজার টাকা দেওয়া হবে সৎকারের জন্য।

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই, তা হল হল নোবেল-জয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে দারিদ্র মুক্তির কথা বলেছেন, সেই তত্ত্ব না পড়েই তাকে বাস্তবে রূপদান করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বনিযুক্তি প্রকল্প, গরু, হাঁস, মুরগি, ছাগল পালন মানুষকে বেঁচে থাকার দিশা দেখিয়েছে। ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ার জন্য আর্থিক সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আর্থিক দিক থেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। সার্বিকভাবে কোটি কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে যা শিল্প স্থাপনের সহায়ক। চতুর্থ বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে সকল নিমন্ত্রিত শিল্পপতিরা একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গেই যথার্থ বিনিয়োগ বান্ধব রাজ্য। বিগত ম্মেলনে এসেছিলেন মুকেশ আম্বানি, লক্ষ্মী মিত্তাল, জিন্দাল, নীলাঞ্জন হীরানন্দানি, স্পাইস জেটের মালিক, জি এস গ্রুপ-সহ বহু বিদেশি প্রতিনিধি। ১০৭টি চুক্তির মধ্য দিয়ে ২ লক্ষ ১৯ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দিঘায় যখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সম্মেলন, তখন পশ্চিমবঙ্গ আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে যার প্রতিফলন ঘটবে এবারের বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে, যার অপেক্ষায় থাকবে বাংলার কোটি কোটি মানুষ।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial