রূপের যাজক জীবনানন্দ

রাজ চক্রবর্তী

নামে তাঁকে বিবেকানন্দ-গোত্রীয় গেরুয়াধারী সন্নাসী মনে হতে পারে, অথচ তা তিনি নন। পাঠক মাপ করবেন, চাক্ষুষ পরিচয়ে তাঁকে কবি বলেও ভ্রম জাগে না হয়তো। অথচ ঋষির মতো প্রজ্ঞাবান এবং যথার্থ কবির মতোই মনীষাসম্পন্ন এই মানুষটির নাম জীবনানন্দ দাশ। শুধু কবি তিনি নন, কবিসমাজের আদর্শ পুরুষ। নামে এবং কাজে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার একটা মাইলস্টোন। গত শতকের শেষের দশকে জীবনমুখী নামে বাংলা গানের একটা নতুন ধারা ঝড় তুলেছিল। কবিতার যদি তেমন কিছু বলা যায় তবে নিশ্চিতভাবে এই বক্তব্য স্বীকৃত হওয়া উচিত যে, জীবনমুখী বাংলা কবিতার পথিকৃৎ জীবনানন্দই। অবশ্যই এই বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথসহ তাঁর পূর্বসূরি বাঙালি কবিদের অপমান ঝোঝাবে না, কেন না জীবনমুখী গানেও পূর্বসূরি গারকদের অপমান বোঝানো হয়নি। কিন্তু একথা সর্বাংশে সত্য যে, জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় পালাবদলের হাওয়া এনেছিলেন এবং সেই হাওয়াই উত্তরকালের কবিদের পথ দেখিয়েছে অত্যন্ত সফলভাবে।

অথচ আমাদের দুর্ভাগ্যের কথা এখানেই যে, আধুনিক বাংলা কবিতার এই অনন্য স্রষ্টার জীবদ্দশার প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল অকল্পনীয় অগৌরব। আজ আমাদের মানতেই হবে যে, বাংলার কাব্যলোকে রবীন্দ্রনাথ যদি সূর্যের মহিমা বিস্তার করে থাকেন, তবে চন্দ্রলোকের মোহন মায়া যেন জীবনানন্দ দাশ। কবি কুসুমকুমারী ও সত্যানন্দ দাশের পুত্র জীবনানন্দ তাঁর প্রিয় রূপসী বাংলায় এসেছিলেন ১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। উনিশ শতকের একেবারে শেষ বছরটিতে পৃথিবীতে এসেছিলেন সেই কবি যিনি নানাজনের কাছে ‘হেমন্তের কবি” ‘নির্জনতার কবি’ ইত্যাকার অভিধায় অভিহিত হয়েছেন বারেবারে। রবীন্দ্রনাথের সফল পারঙ্গমতাকে স্বীকার করেই বলা যায় যে, জীবনানন্দ দাশ এক বিরাট বিপুল অবিনশ্বর মহাপৃথিবীর মুগ্ধ যাজক। এই বাংলার কাব্যকলার জগতে তিনি এক অতি অনিবার্য সৃজনবিন্দু।

জীবদ্দশায় যতই অবহেলিত হোন না কেন, মৃত্যুদিনের রাতই চিনিয়ে দিয়েছিল তাঁর জাত। বুকের পাঁজরগুলি চূর্ণ করে দিয়েছিল রাজপথে ট্রামের ধাক্কা। আনমনা কবিকে অকালে চিরঘুমে পাঠিয়েছিল এক অবিশ্বাস্য দুর্ঘটনা। বেডসোর হয়ে যাওয়া শরীরটা নীলচে হয়ে এসেছিল। ঘাড়টা একটু কাত করে শেষ একবার বলে উঠেছিলেন, “ধূসর পান্ডুলিপির রং সারা আকাশ জুড়ে।” তারপরই সব শেষ। বাংলার তাবড় সাহিত্যিকের ভিড় হয়েছিল সেদিন কবির শয্যাপার্শ্বে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সজনীকাণ্ড দাস থেকে শুরু করে কুলীনগোত্রের প্রায় সকলেই ছুটে এসেছিলেন। বাংলার এই কবিকে সেদিনই প্রথম এতখানি শ্রদ্ধার আয়োজন হয়েছিল। আর এতসব নক্ষত্রসমাবেশ দেখে বিস্মিত কবিপত্নী লাবণ্যপ্রভা ডাক্তার ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছিলেন, “তোমার দাদা নিশ্চয়ই বড় কবি ছিলেন?”

এই “বড় কবি’কে আমরা চিনতে পারলাম অচিরেই। বিশ শতকের বাংলা কবিতার নতুন বিশ্বকর্মা জীবনানন্দ কী উত্তুঙ্গ স্পর্ধায় আমাদের কইতে শেখালেন– “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।” বাস্তবিকই জীবনানন্দ দাশ যেন কোনও এক অচিন লোকের একাকী রূপদর্শী কবি। তাই বাইরের সুবিপুল অগ্রাহ্যের গ্লানি তাঁকে ছুঁতে পারেনি। নিজের গড়া অচলিত পথ ধরেই তিনি উপলব্যথিত গতিতে হাজার বছর ধরে হেঁটে বেড়িয়েছেন– “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি– সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে।” অনেক–অনেকটা পথ। এটিলা-বিম্বিসার-অশোকের ইতিহাস পেরিয়ে কবি দেখেছেন সে-জগৎ আজ বড় ধূসর। আর যে-জগতে তাঁর প্রাণধারণ, কালসর্পে দষ্ট সেই পৃথিবীও আজ রক্ত, ক্লেদ আর রিরংসার পাপে ধূসর। অথচ তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে ধ্বনিত হতে থাকে নিখাদ প্রাতিস্বিকতা আর অখণ্ড পরাবাস্তবচেতনা। তাই তার কবিতার মিস্টিক বৈভব যেন ধুম গিয়ে লাগিয়ে দেয় হৃদকমলে। তাঁকে তো কেউ কেউ ‘মরণের কবি’ বলার চেষ্টাও করেছেন। কিন্ত মরণ তো নয়, জীবনের গহীন স্রোতে ডুব দিয়ে অরূপরতন কুড়িয়ে আনতে পারেন বলেই তিনি জীবনানন্দ। তিনি রূপদর্শী, রূপদক্ষ কবি। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’ তাঁর চোখে হয়ে উঠল “রূপসী বাংলা’। তার ১৮, ২৬ কিংবা ৩৪ মাত্রার মহাপয়ার বা চতুর্দশপদীগুলি যেন অনাগতকালের, অনাগতলোকের মোহনবীণা। এই অভিনব কাব্যের রূপলোকে কুলীন গোত্রের ফুল, পাখি বা পতঙ্গের যত না আনাগোনা, তার চেয়ে বেশি লীলা অকুলীন সব প্রাণীর। শালিখ, বুনোহাস, গাংচিল, কাদাখোঁচা, ফড়িং, শিয়াল, নিমপেঁচা (তারা আবার কেউ কেউ অন্ধ)– এরা সবাই সমকালেরই প্রতীকী। তাঁর কবিতায় ফুল ফাটে আকন্দের, ভাঁটের, ছায়া পড়ে শটিবনে। কবিতায় আছে মেঠো ইঁদুর, ইহুদি রমণী, কুষ্ঠরোগী। মোটরকারও “গাড়লের মতো” কেশে চলে বায়। এসব তো বিক্ষত যুগেরই বার্তাবহ।

 

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তাঁর (জীবনানন্দের) কবিতায় “তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।” বলেছিলেন, “চিত্ররূপময়”। তাঁর কবিতায় মৃত্যুর রং নীল। সেই মৃত্যুকে পরাহত করে এই বাংলার মাটিতে বারবার ফিরে আসার বাসনা শোনা গেছে তাঁর কবিতায়। কবি জন্মান্তরবাদী। তাই মৃত্যু তাঁকে সত্যিসত্যিই ছিনিয়ে নিতে পারেনি। আবহমানের কবি জীবনানন্দ তাই আজও বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে বুক পেতে এই মাটিতে শুয়ে আছেন একরাশ তৃপ্তি ও শান্তি নিয়ে। যতদিন থাকবেন জীবনানন্দ, ততদিন এ-বাংলা জেগে থাকবে রূপশালী ধান নিতে, শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, আনন্দের জীবন নিয়ে।

 

 

 

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers