রাষ্ট্রের নজরদারি : একটি অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত

পূর্ণেন্দু বসু

দেশের সমস্ত কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ডিজিটাল প্যাড ও ট্যাবের উপর নজরদারি চলবে জোরদারভাবে৷ প্রত্যেকের সংরক্ষিত যাবতীয় নথির উপর এবার থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ১০টি গোয়েন্দা এজেন্সি এই নজরদারির কাজ চালাতে পারবে৷ বৃহস্পতিবার (২০.১২,১৮) রাতে জারি করা এই নির্দেশিকাতে কেন্দীয় সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এখন থেকে জাতীয় নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে দেশের যে কোনও নাগরিকের কম্পিউটার বা মোবাইলে থাকা যে কোনও তথ্য বা সেই মোবাইলে যার সঙ্গেই যা কথাবার্তা বা মেসেজ আদান- প্রদান হোক, সে-সব কারও অনুমতি ছাড়াই রেকর্ড করে তার উপরে সম্পূর্ণ নজরদারি চালাতে পারবে কেন্দীয় সরকার৷

 

কেন্দ্রীয় “স্বরাষ্ট্র দফতরের তরফে জারি করা নির্দেশিকাতে আপাতত দশটি সংস্থাকে লাগামহীন এই নজরদারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে৷ সংস্থাগুলি হল- ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি), নারকোটিক কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি), এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি), সেন্টাল ব্যুরো অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস (সিবিডিটি), ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স ট্যাক্সেস (সিবিডিটি), ডিরেক্টরেট অফ রেভেনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই), সেন্টাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ), ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েট (র) অসম, জম্মু, কাশ্মীর এবং সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে ডাইরেক্টরেট অফ সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স এবং দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

 

দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব রাজীব গান্ধী-র স্বাক্ষরিত এই কেন্দ্রীয় সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০০-এর ৬৯ নম্বর ধারার ১ নম্বর উপধারাতে কেন্দ্রের উপরে ন্যস্ত ক্ষমতার বলে এবং ২০০৯ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন (প্রোসিডিওর অ্যান্ড সেফগার্ডস ফর ইন্টারসেপশন, মনিটরিং অ্যান্ড ডিক্রিপশন অফ ইনফরমেশন) অনুযায়ী এই সংস্থাগুলিকে এই নজরদারির ক্ষমতা ও অধিকার দেওয়া হল৷ এই আইনে কোনও ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলির নির্দেশ মতো কোনও তথ্য জানাতে অস্বীকার করেন, তাহলে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানাও ধার্য করা হতে পারে৷ মোবাইল বা কম্পিউটারে কোনও নাগরিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একান্ত ব্যক্তিগত বা গোপনীয় কোনও ছবি বা ফাইল সেভ করা থাকলেও যে-কোনও মুহূর্তে উক্ত দশটি কেন্দ্রীয় সংস্থার গোয়েন্দারা তা নিজেদের ইচ্ছেমতো দেখতে পারেন৷ আগে কোনও ব্যক্তির উপরে এই ধরনের নজরদারি চালানোর প্রয়োজন হলে, কারও ভয়ানক কোনও অপরাধ বা দেশের পক্ষে বিপজ্জনক কাজে কেউ জড়িত থাকলে, আদালতের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিতভাবে এই ধরনের নজরদারি চালানো যেত৷ এখন আর কোনও বাধাই রইল না৷

 

২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী ওই দশটি এজেন্সিকে সমস্ত কম্পিউটারের উপর নজরদারির অধিকার দেওয়া হয়েছে৷ কম্পিউটার শব্দটি নিয়ে প্রাথমিকভাবে থাকলেও আজ স্পষ্ট হয়েছে, যে কোনও ডিজিটাল ডিভাইসই এই নির্দেশের অন্তর্ভুক্৷ উল্লেখ্য যে, এইভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের ষথেচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যত গোটা দেশজুড়েই তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে৷ ২১ তারিখ সকাল থেকেই সংসদের উভয় কক্ষে সমস্ত বিরোধী দলের সাংসদই একসঙ্গে এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হন৷ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানান, “দেশের সাধারণ মানুষের উপরে এইভাবে নজরদারি ঢালানো মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এখনই এই আইন প্রত্যাহার করতে হবে। দেশের মানুষের জন্য এই আইন অত্যন্ত বিপজ্জনক”। মমতার স্পষ্ট বক্তব্য, “উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিহিংসায় এসব কাজ হচ্ছে। একজন মানুষের সব ব্যক্তিগত তথ্য কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ তো স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও পরাধীন হয়ে যাওয়া। সরকারের কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেভাবে খর্ব করা হচ্ছে, তাতে আমি শঙ্কিত৷ এতে গণতান্ত্রিক অধিকার কী আর থাকে? এই বিজ্ঞপ্তি অবিলস্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

 

“বিরোধীদের আক্রমণের মুখে সরকারের পক্ষে মুখ খোলেন অমিত শাহ, অরুণ জেটলিরা৷” অমিত শাহের বক্তব্য, মানুষকে ভয় দেখিয়ে জাতীয় সুরক্ষা নিয়ে ফের একবার রাজনীতি করছে বিরোধীরা৷ রাজ্যসভায় অরুণ জেটলি বলেন, এটি কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নয়৷ ২০০৯ সালে ইউপিএ-র সিদ্ধান্ত এটি৷ কারা নজরদারি করবে, আমরা কেবল সেটি চিহ্নিত করে দিয়েছি৷ মন্ত্রী মুখে যা দাবি করছেন, সরকারি নির্দেশ কিছু তা বলছে না৷ ইউপিএ জমানায় কারও উপরে নজরদারি করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রসচিব বা নিদেনপক্ষে যুগ্মসচিব বা আইজি পর্যায়ের অফিসারের অনুমতি লাগত৷ কিন্তু নতুন জারি হওয়া বিজ্ঞপ্তিতে এ নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি৷ ফলে এই সুযোগে সন্দেহ হলেই যে-কোনও ব্যক্তির মোবাইল বা কম্পিউটারে নজরদারি করতে পারবে সরকার৷ কারও অনুমতির প্রয়োজন হবে না৷ বিরোধীদের মনোবল দূর্বল করতেই ওই আইনের অপব্যবহার হবে না–এমন কথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না৷

আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ পরে যুক্তি দেন যে, এই আইনের প্রয়োগ করার সময় স্বরাষ্ট্র সচিবের অনুমতি প্রয়োজন হবে৷ তবে এই কথা কেন বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি, তার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি রবিশঙ্কর৷ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে তদন্ত সংস্থাগুলি যে-কোনও কম্পিউটারে আড়ি পাততে পারবে৷ কম্পিউটারের যে-কোনও তথ্যের পাঠোদ্ধার করতে পারবে৷ ইন্টারনেট পরিষেবা সংস্থা বা কম্পিউটারের মালিক তদন্তে সাহায্য করতে বাধ্য৷ অন্যথায় ৭ বছর পর্যন্ত জেল৷ স্বভাবতই এই বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে উঠে আসছে ব্যক্তি-পরিসরের অধিকারের বিষয়টি৷ কিছুকাল আগেই আধার কার্ড নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল ব্যক্তি পরিসরের অধিকার জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ৷ একজন মানুষ কী খাবেন বা কার সঙ্গে মেলামেশা করবেন তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার রাষ্টের নেই। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য আদান-প্রদান সরকারি নজরদারির আওতায় আসার অর্থই হল, সেই ব্যক্তি পরিসরে রাষ্টের হস্তক্ষেপ৷ বিজেপি শাসনে প্রশ্ন তুললেই সরকারের চোখে বিরোধীরা দেশবিরোধী হয়ে যান৷ এনআরসি নিয়ে প্রশ্ন করলে দেশদ্রোহী বলে দেগে দিচ্ছে সরকারের লোকেরা৷ সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা রাফাল নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না৷ তাই এখন নজরদারির প্রশ্ন তুললেই বিরোধীরা হয়ে যাবেন ‘দেশদ্রোহী’৷ কারণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ভারতের সর্বভৌমত্ব, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা এবং বন্ধু দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত।

এখানেই বিপদ৷ কারণ, দেশের স্বার্থের কথা, দেশের নিরাপত্তার কথা বলেই যে-কোনও সরকার-বিরোধীকে যখন খুশি শাস্তি দেওয়া যাবে৷ ভয় দেখানো যাবে এই নজরদারির সিদ্ধান্তটি এমন, যার মাধ্যমে প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিককে সন্দেহভাজন অপরাধী বলে মনে করা হবে৷ তার সঙ্গে অপরাধীর মতো ব্যবহার করা হবে৷ সর্বোপরি নাগরিকের উপর এই নজরদারি অসাংবিধানিক। এর মাধ্যমে এমন ভারত গড়ে তোলার কথা ভাবে হচ্ছে, যা পুলিশরাজে পরিণত হবে৷ কেন্দ্রের বিজেপি সরকার একটা আতঙ্কের সরকারে পরিণত হয়েছে। এই নজরদারির বিজ্ঞপ্তি কেবল অগণতান্ত্রিকই নয়, এ হল মানুষকে উত্ত্যক্ত করার বিশেষ দলিল৷ এটাই নিশ্চিত যে, নির্বাচনে পর পর পরাজয় বিজেপি সরকারকে ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য মরিয়া করে তুলেছে৷ এটা সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং গোপনীয়তার অধিকারের প্রতি বড় আঘাত৷ প্রসঙ্গত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ কেউ কেউ বারবার বলেছেন যে, দেশে ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে দেশ অঘোষিত জরুরি অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছে৷ নাগরিকদের উপরে বর্তমান নজরদারির নির্দেশ সে-কথাই আর একবার স্মরণ করিয়ে দিল৷ বিশ্বের বৃহত্তম দেশে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের উপর এহেন হস্তক্ষেপ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না৷

সামনে লোকসভা নির্বাচন৷ সেই নির্বাচনে বিজেপি নিজের পরিণাম নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় আছে। হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় সেই দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজেপির উন্নয়ন তথ্য বিকাশের নমুনা মানুষ দেখেছেন। সার্বিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে হিন্দুত্ব দিয়ে বিভাজন, রামমন্দির প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি মানুষ বুঝে গিয়েছেন। বাকসর্বস্ব এক নেতার ম্যাজিক আর চলছে না। মানুষ ক্ষুদ্ধ। বিরোধীরা উজ্জীবিত। এ সব বিজেপির জন্য মোটেই ভাল নয। এই অবস্থায় এই ভোটের আগে ঘরে ঘরে গোয়েন্দাগিরি করার লক্ষ্য নিয়েই নজরদারির কালো বিজ্ঞপ্তি। স্বৈরাচারী শাসকরা চিরকালই ভেবেছেন, মানুষ কে ভয় পাইয়ে শাসন চালিয়ে যাবেন। প্রথমে তাঁরা মোহ সৃষ্টি করেন। মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে শাসককে ‘জাদুকর’ ভাবতে থাকেন। মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য এই শাসকরা এক কল্পরাজ্যে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন মানুষকে। কোথায় কোথায় স্বপ্নের জাল বোনেন। ভুলিয়ে দেন মানুষের বাস্তব জীবনের দুঃখ-কষ্ট গ্লানির কথা। শাসকের সঙ্গে মানুষও ভাবেন- ‘সুদিন আসছে’, জীবনের পরিবর্তন আসবে’ দেশ পাল্টে যাবে। দুঃখের অবসান হবে। আরও কত কী!

মোহ সৃষ্টিকারী শাসকের স্বরুপ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ সম্বিত ফিরে পান। বাস্তবটা বোধগম্য হয়। তখন স্বপ্নের রাজাকে মানুষ মাটিতে নামিয়ে আনেন। এরকমটাই হচ্ছে বর্তমান ভারতে।

মানুষের মোহ যত কাটতে থাকে, ততই স্বৈরশাসকের জনদরদি মুখোশ খুলতে শুরু করে। শুরু হয়ে যায় মানুষকে ভয় দেখানোর খেলা। হাতে থাকে গাজর ও লাঠি। গাজরে কাজ না হলে-লাঠির ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়ে। ঘরে ঘরে নজরদারির যে বিজ্ঞপ্তি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার জারি করেছে-তাতে বোঝা যাচ্ছে, ওরা মানুষকে আতঙ্কিত করার ব্যবস্থা করছে। মানুষ যাতে ভয় পেয়ে ওদের পক্ষেই থাকে সেটাই হল লক্ষ্য।

বাইরে আমরা যাই দেখি না কেন, আসলে একনায়করা যখন দেখেন তাঁদের জাদু কাজ করছে না, তখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক ভয় পেতে শুরু করেন। ভারতের একনায়ক এখন ভয় পাচ্ছেন। ভয় পেয়েই নাগরিক-নজরদারির বিজ্ঞপ্তি জারি করিয়েছেন। এই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করাতেই হবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers