রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশের সর্বনাশ ডেকে আনবে

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়  

সম্প্রতি ভারত সরকারের নীতি আয়োগের সহকারী চেয়ারম্যান শ্রী রাজীব কুমার ঘোষণা করেছেন, সরকার ৪৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি অথবা বন্ধ করে দেবে। এনডিএ সরকারের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০ দিনে আর্থিক সংস্কারের নামে তারা ঘোষণা করেছেন সরকার প্রশাসন পরিচালনা করবে কিন্তু ব্যবসা করবে না। এই ঘোষণার অর্থই হল, ভারতবর্ষের জন্মলগ্ন থেকে যে আর্থিক নীতি গৃহীত হয়েছিল তার থেকে সরে এসে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করবে সরকার। আমাদের জন্মলগ্নেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দেশে মিশ্র অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং ব্যক্তিপুঁজি ও সরকারি পুঁজির মাধ্যমে গড়ে ওঠা ব্যবসা, বাণিজ্য, কল-কারখানার মধ্যে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু এবং সরল অর্থনীতি গড়ে উঠবে। ১৯৫১ সালে পাঁচটি মাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা ৩০০ অতিক্রম করে। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন রাজ্যের নানা সংস্থা অধিগ্রহণ করে সংস্থাগুলিকে স্বাবলম্বী ও লাভজনক করার চেষ্টা করে এবং সংস্থাগুলি বন্ধ না করে অর্থের সাহায্য দিয়ে চালু রাখার চেষ্টা করে। উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, কিন্তু একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে সরকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিক কর্মচারী নিয়োগ করে কর্মসংস্থানের জন্য। ফলে সংস্থাগুলি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে আর্থিক দিক থেকে কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে সরকার চেষ্টা করেছে সংস্থাগুলি চালানোর। একটি বিষয় অনেকের কাছেই অজ্ঞাত তা হল, ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থাগুলি সরকারি সংস্থার আধিকারিকদের একাংশকে প্রলোভন দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে দুর্বল করার চেষ্টাও করেছে। যারা শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে যুক্ত তারা সবাই জানে। প্রশ্ন হল, সরকারের কাছেও অনেক সুযোগ ছিল সংস্থাগুলিকে সচল ও লাভজনক করার কিন্তু সরকারের অদূরদর্শিতার জন্য সংস্থাগুলি ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরও কিছু সংস্থা লোকসানে চলছিল কিন্তু সঠিক পদক্ষেপ ও দুরদর্শিতায় সংস্থাগুলি আজ লাভের মুখ দেখছে। ২০১১ সালের আগে ব্রিটানিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাকবি ফার্মার প্রভূত লোকসানে চলছিল, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সঠিক সিদ্ধান্তে দু’টি কারখানাই লাভের মুখ দেখেছে। সংস্থা বন্ধ করা বা বিক্রি করার মধ্যে সরকারের কোনও কৃতিত্ব নেই কিন্তু সঠিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে চালু রাখাটাই কৃতিত্বের। মৃতপ্রায় সরকারি সংস্থা তন্তজ আজ একটি লাভজনক সংস্থায় পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক দক্ষতা ও কর্মচারীদের আন্তরিকতায়। সরকার পরিচালিত সরস্বতী প্রেস এখন লাভজনক সংস্থা। বসুমতী একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সংবাদপত্র ও প্রেস শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছায় গড়ে উঠেছিল। বামফ্রন্ট সকল কর্মচারীদের স্বেচ্ছা অবসর নিতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনে বামফ্রন্ট পিছু হঠতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে প্রেসটি চালু হয় যা অল্পদিনেই লাভের মুখ দেখবে। রাজ্য সরকার সমবায় সোসাইটির মাধ্যমে পরিচালিত মঞ্জুষা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হস্তশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন লিমিটেড (বঙ্গশ্রী), পশ্চিমবঙ্গ রেশম শিল্পী সমবায় মহাসংঘ লিমিটেড, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রফতানি উন্নয়ন সমিতি এবং শিল্পবার্তা প্রেসকে রাজ্য সরকার কাজের বরাত দিয়ে আর্থিক দিক থেকে স্বাবলম্বী ও লাভজনক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল খাদি অ্যান্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ বোর্ড গ্রামীণ সমবায়গুলিকে সাহায্য করছে যাতে গ্রামে গ্রামে খাদির উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। রাজ্যের ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে ৭টিকে সরাসরি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং ৫টি সংস্থাকে সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতিতে যখন সরকার বিভিন্ন সংস্থা বিক্রি বা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারের সংস্থাগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার ও লাভজনক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে দেশের ২৯৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পর্যায়ক্রমে বন্ধ অথবা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

১৯০৭ সালের ৩০ অক্টোবর গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যাকে বলা হয় (General Agreement on Tariff and Trade) যদিও ভারতবর্ষ এই চুক্তিতে তখন অংশ নেয়নি। ১৯৪৮ সালের ৮ জুলাই থেকে ভারতবর্ষ গ্যাটের সদস্য হয়। ১৯৯৪ সালে ১২৩টি দেশ গ্যাটের সদস্য হয় এবং ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি World Trade Organisation তৈরি হওয়ার পর থেকে WTO অন্তর্ভূক্ত দেশগুলিকে বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে নিতে হয়। ইমপোর্টের ক্ষেত্রেও বিধি নিষেধ শিথিল হওয়ার জন্য দেশীয় সংস্থাগুলি প্রবল চাপের মুখে পড়ে। বাজার অর্থনীতি ভারতের মতো দেশে যেখানে ১২৫ কোটির বেশি জনসংখ্যা সেখানে কতটা সার্থক তা বিচার বিশ্লেষণ হওয়ার আগেই বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুরোপুরি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করায় উদ্যোগী হয়েছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার (২০১৯) নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণ করেছে। ১) পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি বিক্রি অথবা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ২) বর্তমান শ্রম আইন পরিবর্তন করে শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে এবং শ্রম আইনের দীর্ঘসূত্রিতা বাতিল করে ৪৪টি কেন্দ্রীয় আইনকে ৪টি কেন্দ্রে ভাগ করা হবে। ৩) রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বিক্রি করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু থাকবে। ৪) রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের জমি নিয়ে ব্যক্তি পুঁজি অথবা বিদেশি পুঁজিপতিদের দেওয়া হবে। ৫) বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা যাদের Net Worth ২০০০ কোটি এবং ১০০০ কোটি টাকা Bank ও Cash-এ আছে তাদের Buy Back পদ্ধতিতে সরকারি শেয়ার কিনতে হবে। অর্থাৎ সরকার তার দায়িত্ব এই পদ্ধতিতে ক্রমশ কমিয়ে আনবে। এই নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা Department of Investment and Public Asset management.

উপরোক্ত পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় সরকার গত ২ মাসে ২৩৫০ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সালে ৯০,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে অথবা পুরোপুরি সংস্থাগুলি বিক্রি করে ইতিমধ্যেই সরকার ২৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রির ছাড়পত্র দিয়েছে।

ভারতবর্ষ একটি Welfare State এবং এই দেশের সরকার ও ব্যক্তি মালিকরা একই মানসিকতায় পরিচালিত হতে পারে না। সরকারের দায়িত্ব মানুষকে কর্মহীন করা নয়, কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করা।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে সরকার হাত তুলে নিলে দেশের শ্রমিক কর্মচারিরা যে বিপদের সম্মুখীন হবে সেগুলি হল-১) Private Sector শুধু মুনাফা চায়। ২) Private Sector এর কোনও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে না। ৩) Private Sector-এর কোনও স্বচ্ছতা থাকে না এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের অন্ধকারে রাখা হয়। ৪) সরকারি সংস্থা যে মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠেছিল Privatization এর ফলে তারা শুধু মুনাফার জন্য সব ধরনের নীতি বহির্ভূত কাজ করার চেষ্টা নতুন শ্রমনীতির সুযোগ নিয়ে। ৫) কম শ্রমশক্তি ব্যবহার করে maximum মুনাফার জন্য চেষ্টা করবে ফলে শ্রমিক-কর্মচারীদের উপর নিপীড়ন শুরু হবে। ৬) সরকারি সংস্থা বিক্রি করার পর শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। ৭) বেসরকারীকরণের পর উৎপাদিত বস্তুর মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে কারণ কোনও সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

এই মুহূর্তে ভারতে বেকারি সব থেকে বেশি স্বাধীনতার পর থেকে। দেশে কর্মসংস্থান একটি পবিত্র দায়িত্ব সরকারের। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কর্মসংস্থান আরও কমবে কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বিক্রি হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। আমেরিকা, ইউরোপের দেশগুলি এবং বিশ্বের ধনী দেশগুলিতে জনসংখ্যা কম কিন্তু জমি ও সম্পদ বেশি ফলে সেইসব দেশে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করা যায়। ভারতবর্ষের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে সেটা সম্ভব নয়, এটা নরেন্দ্র মোদি কবে বুঝবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers