রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নীতিহীন বিলগ্নীকরণ মানা যায় না 

পূর্নেন্দু বসু

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণ কোনও নতুন বিষয় নয়। এমনকী সরকারের বিলগ্মীকরণ মন্ত্রক যখন গড়ে ওঠে, তখনও শোরগোল হয়নি। এর আগেও বিলগ্লীকরণ হয়েছে। এখনও হচ্ছে। আগামীতেও হবে। প্রশ্ন উঠছে সরকারের বিলগ্নীকরণ নীতি নিয়ে। লাভজনক সংস্থাকে কেন বেচা হচ্ছে? কেন ৫১ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রীয় শেয়ার বেচে দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত  সংস্থার নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে? অর্থনীতি যখন ঝিমিয়ে পড়েছে, তখনই কেন বিলগ্মীকরণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মন্ত্রিসভা? সরকার কেন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিচ্ছে না? কেন এই সংকটের সময় সর্বদলীয় মিটিং ডাকছে না সরকার? এরকম নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠা সত্ত্বেও সরকার তরফে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনও উদ্যোগ নেই। যা হচ্ছে তার সবটাই একপাক্ষিক। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক রীতি-নীতিরও তোয়াক্কা করছে না মোদি সরকার।

চলতি আর্থিক বছরের বাজেটে সরকারি সংস্থার বিলগ্নীকরণ থেকে ১ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছিলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। কিন্তু চালু অর্থ বছরের ৬ মাস কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত বিলগ্নীকরণ থেকে মাত্র ১৭ হাজার কোটি টাকা সরকারের হাতে এসেছে।  কাজের অবস্থা যে ভালো না, তা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য ২০ নভেম্বর, এক কোপে পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত নিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রিসভার মিটিং-এ।

ভারত পেট্রোলিয়াম (বিপিসিএল), কনটেনার কর্পোরেশন (কনকর) শিপিং কর্পোরেশন, নিপকো ও তেহরি জলবিদ্যুৎ নিগম (টিএইচডিসি) এই পাঁচটি  রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মালিকানায় সরকারের অংশীদারিত্ব ৫২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এই সিদ্ধান্তের পরে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন জানিয়েছেন, বিপিসিএল-এর ৫৩.২৯ শতাংশ সরকারি শেয়ার বেচে দেওয়ার পাশাপাশি সংস্থাটি পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে। শিপিং কর্পোরেশনের ৬৩.৭৫ শতাংশ সরকারি মালিকানা ও সংস্থার নিয়ন্ত্রণও বেসরকারি হাতে যাবে। একইভাবে কনটেনার কর্পোরেশনের ৩০.৮ শতাংশ সরকারি শেয়ার ও নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সরকার। অন্য দুই সংস্থা নিপকো ও তেহরি জলবিদ্যুৎ নিগম-এর ক্ষেত্রে বিলগ্নীকরণ অবশ্য নিছক সরকারি সংস্থার মধ্যেই হাতবদল হবে। ওই দুটি সংস্থা এনটিপিসি ও এনএইচপিসি কিনে নিতে পারে। না কেনার সম্ভাবনাও আছে। তবে বিপিসিএল- এর অন্তর্গত ন্যুমালিগড় রিফাইনারি সংস্থার বেসরকারীকরণ হবে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণ আর বেসরকারীকরণ এক কথা নয়। বিলগ্নীকরণ কথা বলে বেসরকারীকরণ করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি হাতে। অর্থাৎ সরকার কী করতে চায় তা নীতিগতভাবে স্পষ্ট করছে না। করছে বেসরকারীকরণ। বলছে বিলগ্নীকরণ! কেন এক ধাক্কায় এতগুলি বিলগ্নীকরণ তথা বেসরকারিকরণের পথে হাঁটছে মোদি সরকার? অর্থমন্ত্রক সূত্রের ব্যাখ্যা, ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি চাঙ্গা করতে হবে। তার জন্য কর্পোরেট কর করানো হয়েছে। কিন্তু, বেসরকারি লগ্নি আসছে না। বেসরকারি লগ্নি না এলে কর্পোরেট কর কমানো হল কেন? বলা হচ্ছে, বেসরকারি লগ্নি আসার জন্য সরকারি খরচের গতি বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলে সরকারই সব কিছু করবে, আর দু’দিক থেকে লাভবান হবে বেসরকারি কর্পোরেটরা। কর্পোরেট কর কমিয়ে ক্ষতি হল সরকারের। বিলগ্নীকরণের মাধ্যমে কম দামে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে  কর্পোরেটরা। কী অদ্ভুত যুক্তি! সরকারি খরচ বাড়াতে হলে তা কোথায় বাড়াতে হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। পরিকাঠামো বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি, একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। মোদি সরকারের সেরকম কোনও পরিকল্পনা থাকলে তা স্পষ্ট করা হোক। অর্থনীতির গতি বাড়াতে কোথায় কোথায় কেন্দ্রীয় সরকার বিলগ্লীকরণের টাকা ব্যয় করবে, তা জানার অধিকার আছে সমস্ত নাগরিকের।

পাঁচটি সংস্থার বিলগ্নীকরণ মারফত কমপক্ষে ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার কোটি আয়ের আশা করছে অর্থমন্ত্রক। মূল ভরসা বিপিসিএল-এর উপর। একথা আমরা বারবার শুনেছি যে, ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারও যুক্তিযুক্ত নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি  থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বিলগ্নীকরণের কথা ভাবতে শুরু করে ভারত সরকার। যদিও বিচার বিবেচনাহীন বিলগ্নীকরণের বিরুদ্ধে বারবার আওয়াজ উঠেছে। তবুও যথাযথ ভাবনাচিন্তার অভাবে সরকারি পদক্ষেপগুলি দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারেনি । সংকট গভীরতর হয়েছে।

সম্প্রতি পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত মোদী সরকার যেভাবে নিয়েছে, তাতে নীতিগত অবস্থানের ত্রূটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমহলের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? কীভাবেই বা সিদ্ধান্তটি কার্যকর করা হবে? প্রশ্ন উঠছে, বাজারের অবস্থা যখন এত খারাপ, তখন রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বেচে ভাল দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? এই সম্পত্তি বেচে অতি দ্রুত রাজকোষ ভরানোই কি সরকারের লক্ষ্য? অর্থের অভাবে এখন সরকার যে সংকটে পড়েছে, যেভাবে হোক, তা থেকে বেরোনোর পথ হিসেবেই কি এই উদ্যোগ? বিলগ্নীকরণ ক্ষেত্রে বর্তমান সময়টা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । বছরখানেক ধরে অর্থনীতিতে ঝিমুনি ভাব চলছে। এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের আর্থিক বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের উপর । অথচ কর্পোরেট কর কমানো-সহ কেন্দ্রের অধিকাংশ পদক্ষেপই চাহিদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তেমন কোনও অনুঘটকের ভূমিকা নিতে পারছে না। চাহিদা বাড়ানোর জন্য সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন হলেও সরকারি কোষাগার প্রায় শূন্য। জিএসটি এবং সেস আদায় কমছে। আর্থিক সংকট মেটাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক- সহ নানা সূত্র থেকে কিছু টাকা জোগাড় করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। পাঁচটি সংস্থার   বিলগ্নীকরণের প্রক্রিয়া কি অর্থের প্রয়োজন মেটাতেই? আসলে বাজেটের খাতার হিসাব মেলাতেই এই পদক্ষেপ। যা একেবারেই কাঙ্ক্ষীত নয়।

ইতিমধ্যেই  ইঙ্গিত মিলেছে, বিপিসিএল কিনতে ইন্ডিয়ান অয়েল বা অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা উদ্যোগী হবে না। এর অর্থ হলো, বাজার থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে সরকারি কোষাগার ভরা হবে। বিলগ্নীকরণের কোনও সুচিন্তিত পরিকল্পনা বা মাস্টার প্ল্যান নেই। শেয়ার বিক্রির বিষয়টিও বাজারের কাছে খুব আকর্ষণীয় নয়। দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলি সরকারের হাতেই থাকা উচিত। তাছাড়া বিলগ্নীকরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কোনগুলিকে আগে বাছা দরকার–সে বিষয়েও মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এক ভ্রান্ত নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে লাভজনক সংস্থার বিলগ্নীকরণ বন্ধ করে আগে যে সংস্থাগুলি টানা লোকসানে চলছে, যার ফলে সরকারি কোষাগারে চাপ পড়ছে, সেই সংস্থাগুলির পুনরুজ্জীবন সম্ভব না হলে, সেগুলির বিলগ্নীকরণ করা যেতে পারে।

সরকারি সম্পদ অদক্ষভাবে ব্যবহৃত হলে, তার পরিচালন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা দরকার । প্রথমেই রাষ্ট্রয়ত্ত সংস্থা বেচে দেওয়ার চিন্তা ঠিক নয়।  একথা ঠিক যে, দক্ষতার সঙ্গে সম্পদ ব্যবহার না করতে পারলে আর্থিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান কিছুই বাড়বে না। তাছাড়া তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত না নিয়ে, জলের দরে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিক্রি না করে যাতে ভাল দাম পাওয়া যায় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এখন বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। সবাই সম্পত্তি ধরে রাখতে চাইছেন। এই আর্থিক শ্লথগতির সময়ে সম্পত্তি বিক্রি করলে ভাল দাম পাওয়া যাবে না। তাহলে তাড়া কীসের? পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সায় দিয়েছে। কিন্তু, নীতি আয়োগ বিলগ্লীকরণের জন্য যে ২৮টি সংস্থাকে চিহ্নিত করেছে, সেকথাও  কেন্দ্র জানিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে মুনাফায় ফেরার পরেও কেন ফের এ রাজ্যের বেঙ্গল কেমিক্যালসের বিলগ্নীকরণ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠছে। শুধু বিলগ্নীকরণই নয়, বেঙ্গল কেমিক্যালের উদ্বৃত্ত জমি বিক্রি করার কথাও উঠেছে। বিষয়টি এখন হাই কোর্টের বিচারাধীন। বিএসএনএল-এর চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরা দশ মাস বেতন পান না। শ্রমিকের বেতনের সামান্যতম অংশ বকেয়া রাখাও অন্যায়। বিএসএনএল সেই অন্যায়টি করেছে। বিএসএনএল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, তাই তার সাত খুন মাফ- এমনটা হতে পারে না। শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করা প্রকৃত প্রস্তাবে আইনবিরুদ্ধ। বিএসএনএল- এর ঘটনাটির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, এখানে নিয়োগকর্তা কোনও ব্যক্তিবিশেষ নয়, স্বয়ং রাষ্ট্র। যার উপর বিশ্বাস আছে বলেই গোটা অর্থব্যবস্থা চলছে। রাষ্ট্র চুক্তিভঙ্গ করলে সেই বিশ্বাসটাই ভাঙতে বাধ্য। প্রশ্নটি তাই শুধু অস্থায়ী কর্মীদেরই নয়, প্রশ্নটি গোটা দেশের অর্থব্যবস্থার। এ কেমন দায়িত্বজ্ঞানহীতার পরিচয়। নিয়োগকর্তার ক্ষমতা বাস্তবে শ্রমিকের তুলনায় অধিক।

রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তির তুলনায় অস্থায়ী শ্রমিকের জোর সামান্য। সেই কারণেই ক্ষমতার ব্যবহার সম্বন্ধে সাবধানি হওয়া বিধেয়। অন্যায্যভাবে শ্রমিকের স্বার্থহানি করার কারণে গোটা ব্যবস্থাই বিপন্ন হতে পারে। বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট শ্রমিক আন্দোলন কিন্তু নিজের সামান্য ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে নিতে পারে। নরেন্দ্র মোদিরা নিজেদের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রেও অবিবেচক হয়ে উঠেছেন। একেই বলে ক্ষমতার দম্ভ। শ্রমিক সংগঠনগুলির নেতৃবৃন্দ দু-একটি ধর্মঘট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে চাইছেন। এতে জল গরম হবে না। সংগ্রাম-লড়াইকে নীতিগত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে। নীতির লড়াইকে আশু দাবির সঙ্গে যুক্ত করে শ্রমিক ও শ্রমিকবন্ধুদের যৌথ প্রয়াসের মজবুত ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ গড়ে– শিল্প বাঁচাও, শ্রমিক বাঁচাওয়ের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের চাপে আশু দাবি আদায়ের আলাপ-আলোচনার রাস্তা তৈরি হবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial