রাজ্যে অচলাবস্থা তৈরি করছে বিজেপি

পূর্ণেন্দু বসু

রাজ্য জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অশান্তি ছড়ানো হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির নেতৃত্বে একদফা অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সেই অশান্তি অব্যাহত আছে এবং ক্রমাগত বেড়ে চলেছে অশান্তির মাত্রা।

লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন দখল করার পর বিজেপি দ্রুত দলের ক্ষমতা বাড়াবার লক্ষ্যে ক্রমশই মারমুখী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস দখল করছে। অন্যদিকে বিজেপির মদতে ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে সিপিএম দল। তারাও পার্টি অফিস দখলের নামে গ্রামেগঞ্জে সংগঠিত হিংসা ছড়িয়ে দিচ্ছে। মার দাঙ্গা, খুন, হিংসা-অগ্নিসংযোগ পরিণত হয়েছে রোজকার ঘটনায়।

নির্বাচনে বামশক্তির বড় অংশের ভোট গিয়েছে পন্মশিবিরে। এর পিছনে ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা। সিপিএম- আশ্রিত এবং বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা যৌথভাবে নির্বাচনে হাত ধরাধরি করে কাজ করেছে। অশান্তি সৃষ্টির পিছনে তাদেরই এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামে গ্রামে চলছে সন্ত্রাস সৃষ্টির একটানা কার্যকলাপ । বিজেপি- সিপিএমের যৌথ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেখানেই তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সেখানেই পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।

রাজনীতির ওলট-পালটের বর্তমান সময়ে রাজনীতির আশ্রয় নিয়ে থাকা দুষ্কৃতীরা বিজেপির দিকে ঝুঁকছে। এদের মধ্যে যেমন সিপিএমের হার্মাদরা আছে, তেমনই অন্যান্য দলের প্রশ্রয় পাওয়া দুষ্কৃতীরাও দলবদল করছে। সকলের একটাই শত্রু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার দল।

নির্বাচন পরবর্তীকালে অল্পসময়ের মধ্যেই ব্যারাকপুর মহকুমা, সন্দেশখালি, আরামবাগ, ধনেখালি, ভাটপাড়া, ডোমকল-সহ বিভিন্ন জেলায় বিজেপি-সিপিএম মদত পুষ্ট দুর্বৃত্যদের হাতে খুন হয়েছেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী। এঁদের সংখ্যালঘু তৃণমূল সমর্থকদের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ ও মারণ হামলা ঘটছে একের পর এক। বহু তৃণমূলকর্মী সমর্থক পরিবারগুলি গ্রামছাড়া-ঘরছাড়া হয়ে আতঙ্কের দিন কাটাচ্ছেন।

বিজেপি ও সিপিএম নেতারা দু’ধরনের প্রচার করছে। এক, সর্বত্র তৃণমূল কংগ্রেস আক্রমণ করছে। দুই, পার্টি অফিস পোড়ানো বা খুন-জখমের ঘটনাগুলি হল -তৃণমূল কংগ্রেসের গোষ্ঠী কোন্দলের ফল। এদের তাল দিচ্ছে সংবাদ মাধ্যমের বড় অংশ। এরই সঙ্গে চলছে তৃণমূল বিরোধী রাজ্যপাল ডেপুটেশন, রাজ্যপালকে দিল্লি পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নালিশ জানানো।

শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ না থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের নামে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অধিকার হরণের তথাকথিত নিন্দা-প্রতিবাদ ও বিচারালয়ে মামলা দায়ের করার কাজ।

কোর্ট নিয়ম করে সরকারের কাছে কৈফিয়ত তলব করছে। রাজ্যপাল রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বড় নজর সৃষ্টি করতে সদা ব্যাস্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক কয়েকদিনের মধ্যে দু’বার রাজ্যকে “অ্যাডভাইসরি* পাঠিয়েছে। চারদিকে গেল গেল রব। যত দোষ, নন্দ ঘোষ। সবকিছুই ঘটছে মমতার জন্য। সবকিছুর জন্য দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস। মানুষও বিভ্রান্ত। যদিও লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এটাও বাস্তব যে, বিজেপি সাড়ে চার শতাংশ ভোট কম পেয়েছে, তৃণমূলের তুলনায়। কিন্ত, ১৯টি আসন লাভ করেছে।

সারা দেশে বিজেপির তিনশোর বেশি আসন পাওয়া এবং অমিত শাহর হাতে স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব আসার সঙ্গে বাঙলায় অশান্তি ও অস্থিরতা বেড়ে ওঠার একটা গভির সম্পর্ক আছে। এই ফলাফলে ছরম উৎসাহে বিজেপির আস্ফালন বেড়ে গিয়েছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতাদের আস্ফালন এখন গগনচুম্বী। ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন তাঁরা। তৃণমূল থেকে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের ঔদ্ধত্য ও দম্ভ সমস্ত মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলা দখল করতে হবে যে!

একদিকে চলছে, ভয়ংকর মিথ্যা ও কুৎসার ঝড়। অন্যদিকে আত্কসৃষ্টির ভয়াবহ কার্যক্রম। তৃণমূল কংগ্রেসকে হেয় করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ও বাঙালিকে হেয় করার চক্রান্ত শক্তিশালী হচ্ছে। পাশাপাশি চলছে ধর্ম ভাষা ও জাতিভিত্তিক রাজনীতি । সব স্তর থেকে প্রচার করা হচ্ছে, রাজ্য সরকার ৬ মাসের মধ্যেই পড়ে যাবে। কেউ কেউ তো রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু করার কথাও সগর্বে বলছেন।

এঁরা ভুলে যাচ্ছেন এ রাজ্যের সরকার মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার। বিজেপি নেতারা তো এখনই চাইছেন ক্ষমতা দখল করতে। তারা বার বার কেন্দ্রীয় সরকারের ভয় দেখাচ্ছেন।

আমরা লক্ষ্য করলাম, হঠাৎ করে বাবরি মসজিদ ভাঙা ও গুজরাত দাঙ্গায় ব্যবহৃত সেই ‘জয় শ্রীরাম” ধ্বনিতে বাংলার দিকে দিকে একটা আগ্রাসী বাতাবরণ তৈরি করা হল। একদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষজনকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হল। এমনকী, ‘জয় শ্রীরাম’ উচ্চারণ না করলে মারধর করা হল। অন্যদিকে, হিন্দিভাষী হিন্দুদের মাধ্যমে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি দিয়ে বাংলা ভাষী হিন্দুদের উত্যক্ত করা হতে থাকল। “জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি আর ধর্মীয় সম্ভাষণ রইল না, তা হয়ে উঠলো একটি রাজনৈতিক স্লোগান। যার মাধ্যমে উস্কানি ও মেরুকরণের কাজ চলতে থাকল বিজেপি নেতাদের বক্তৃতায় ও মন্তব্যে। মজা পেয়ে গেল সংবাদমাধ্যম। প্রশ্ন উঠতে শুরু করলো, মুখ্যমন্ত্রী কেন দু’দুবার তাঁকে দেখে “জয় শ্রীরাম’ দেওয়ায় রুখে দাঁড়ালেন?

এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে বাংলার সম্ভাষণ কখনও “জয় শ্রীরাম” ধ্বনিতে হয় না। হিন্দি বলয়ে, বিশেষ করে বিহার, উত্তরপ্রদেশে “জয় রামজিকী’ বা “জয় সিয়ারাম”ধ্বনি শোনা যায়। বাংলায় আমরা পরস্পরকে সুপ্রভাত, শুভসন্ধ্যা, শুভরাত্রি বলি। বা করজোড়ে বলি নমস্কার। আমরা কেন “জয় শ্রীরাম” বলতে যাব? আসলে ‘জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুত্ববাদীদের কর্তৃত্ববাদী স্লোগান। এই স্লোগানের মাধ্যমে মুসলিমদের উপর ঘৃণা ছড়ানো যায় এবং নিজেদের রামভক্ত বজরংবলীর উপাসক হিসেবে জাহির করা যায়। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে রাম বা হনুমান কখনওই বিশেষ দেবতা হিসেবে পুজিত হন না। তাই “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি হল ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ মার্কা বিজেপির একবগ্না স্লোগান। যার মাধ্যমে ভারতের বহুত্বকে নাকচ করাই মূল উদ্দেশ্য।

আপাত দৃষ্টিতে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিকে একটি নিরীহ বিষয় বলে মনে হলেও, আসলে এগুলো বাংলার উপর এক প্রবল ও স্থুল সাংস্কৃতিক আক্রমণ। বাঙালির সাংস্কৃতিক অধিকারের উপর কর্তৃত্ববাদী হস্তক্ষেপ। বাঙালি জাতির উপর বড় ধরনের সাংস্কৃতিক আক্রমণ। সবথেকে বড় অপমানকর বিষয় হল, বিজেপি নেতাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে এ বিষয়ে শ্লেষাত্মক কটাক্ষ। ‘জয় শ্রীরাম’ এর স্লোগানধারী বিজেপির হাফ-বাঙালিরা বঙ্গ সংস্কৃতির উপর যেভাবে তাদের ‘জয় শ্রীরাম’ সংস্কৃতি চাপিয়ে দিচ্ছে, তা বাংলা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক এতিহ্যের প্রতি চরম অবমাননা ও বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ছাড়া কিছু নয়। বলা বাহুল্য, আমাদের আলোচনা রাম নিয়ে নয়। আমাদের আলোচনা, ‘জয় শ্রীরাম’-এই আগ্রাসী রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে। এই স্লোগান দিয়েই যত অপকর্ম করে গেরুয়া শিবিরের আগ্রাসী অংশ।

গত কয়েকদিন ধরে আমরা লক্ষ করেছি বিজয় মিছিলের নামে বিজেপির পক্ষ থেকে নানা উস্কানিমূলক কাজ করা হচ্ছে। অঢেল টাকা ছড়ানো হচ্ছে। সরবরাহ করা হচ্ছে অস্ত্র গোলা- বারুদ-সহ সুপারিকিলারদের। অন্য রাজ্য থেকে আনা হচ্ছে দক্ষ গোলমাল সৃষ্টিকারীদের।

মমতাকে জব্দ করতে পারলেই সব বিরোধীরা খুশি। বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস, এসইউসি, নকশাল ধরি মাছ না ছুই পানি-নাগরিক সমাজের উচ্চবংশীয় মাথারা কিছু ঘটলেই একযোগে নেমে পড়েন। মমতা-বিরোধিতার ফাঁক গলে কেমন করে গেরুয়া শিবির এ রাজ্যে তাঁদের ষড়যন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকে বাবু-বিবিদের খেয়াল থাকছে না।

ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়ে তাদের অনেকেই মমতার তথাকথিত ‘মুসলিম তোষণ’-এর বিষয়ে গাই-গুই করতেই থাকেন। বিজেপির বৃদ্ধির পিছনে কারণ হিসেবে মমতাকেই দোষ দেন। মমতার কাজেও সাম্প্রদায়িকতার দোষ খোঁজেন।

সাম্প্রতিক জুনিয়র ডাক্তারদের একরোখা জেদি ‘আন্দোলন’-এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। আন্দোলনের দাবি ও আন্দোলনের ধরনের মধ্যে কোনও মিল নেই। মুখ্যমন্ত্রীকে হেয় করাই যখন এই আন্দোলনের মূল ধারা, তখন তাদের প্রতি কেবলই ভুলগুলিকে শুধরে দেবে কে? গণ আন্দোলন, বললেই হয় না। গণস্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী আন্দোলনের ধরন শেষ বিচারে জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাড়ায়। সহানুভূতি জানিয়েও, তাদের সতর্ক করা দরকার। সে কাজ মমতাই করছেন। এমন একটা অচলাবস্থার সময় ‘কমবয়সিদের জেদ’ বলে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে হবে? সমর্থনকারীরা কেন অপেক্ষায় থাকা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের প্রতিনিধিদের নিয়ে যেতে পারলেন না। একথা কে বলবে আলোচনার টেবিলে না গেলে কোনও আন্দোলনেরই বিচার পাওয়া যায় না। “উই ওয়ান্ট জাস্টিস” বলে চিৎকার করলেই হবে। আন্দোলন শেষ হয় আলোচনায়। পর্বান্তরে আবার আন্দোলন হয়। সব থেকে বড় কথা- এই আন্দোলন অসুস্থ, মুমূর্ষু মানুষের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। কষ্ট পাচ্ছেন আবাল-বৃদ্ধ- বনিতা, সমস্ত ডাক্তারি সেবা না পাওয়া মানুষ। ওঁদের প্রতি কেবল সন্তান-বাৎসল্য দেখালেই হবে না। ওঁদের চিকিৎসামুখী করতে হবে। ওদের সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারের এবং আমাদেরও।

এই অচলাবস্থায় কার লাভ হবে? ওরা কি সত্যিই জানে-মুখ্যমন্ত্রী একবছরেও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কী কী কাজ করেছেন। আন্দোলনের সমর্থনকারীরা সরকারের প্রতি একটা গভীর অবিশ্বাস থেকে এই আন্দোলনকে দেখছেন বলেই মনে হয়। এই ঘটনার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত। হবেও।

তবুও, এ রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে যে গেরুয়া শক্তি-তার বিরুদ্ধেই সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের একজোট হওয়া দরকার। মূল ষড়যন্ত্রীদের চিহ্নিত করে-বাকিদের ঐক্য পারে রাজ্যে শান্তি ফেরাতে। সরকারের ভুল থাকলে সমালোচনা করুন। ভাল কাজকে ভাল বলুন। কিন্তু রাজ্যে অচলাবস্থা তৈরি হতে দেবেন না।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial