মুখ্যমন্ত্রীর অনবদ্য প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রমাণ গঙ্গাসাগর দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মেলা

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

১৪ ও ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ গঙ্গাসাগর মেলা অনুষ্ঠিত হল সাগরদ্বীপে। সাগরদ্বীপ পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তদেশে প্রায় মোহানার কাছে অবস্থিত৷ একটি প্রবাদ চলে আসছিল বহুকাল ধরে তা হল ‘সর্ব তীর্থ বারবার গঙ্গাসাগর একবার’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবাদটিকে ভুল প্রমাণ করেছেন এবং এমন সুবন্দোবস্ত করেছেন যার ফলে পুণ্যার্থীরা প্রায় সকলেই বলেছেন, এমন সুন্দর ব্যবস্থা ভারতে কোনও বৃহৎ মেলায় হয় না এমনকী কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সাহায্যে যে কুম্ভমেলা হয় সেখানেও নয়। মূল বক্তব্যে যাওয়ার আগে সাগরদ্বীপে কপিলমুনির আশ্রম এবং পৌষ সংক্রান্তিতে মকরস্নান সেরে কপিলমুনির আশ্রমে পূজা দেওয়ার যে রীতি আছে তার পৌরাণিক ইতিহাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরতে চাই৷ ভারতবর্ষে এবং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য পূজা ও মেলা হয় কিন্তু সেগুলির চরিত্র সর্বভারতীয় নয়। একমাত্র গঙ্গাসাগর মেলায় সারা ভারতবর্ষ থেকে মানুষ আসে পুণ্যস্নানের জন্য।

সারা দেশের মানুষ একটি দৃঢ় বিশ্বাস থেকে সাগরমেলায় আসে৷ তারা মনে করে মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগর পুণ্যস্নান করেল সব পাপ ধুয়ে যায় এবং সমস্ত যন্ত্রণার থেকে মুক্তি হয় ও জীবনে স্বচ্ছতা আসে৷ পৌরাণিক ঘটনাটি হল কর্দমমুনি বিষ্ণুর সঙ্গে চুক্তি করেন যে তিনি বৈবাহিক জীবন পালন করতে চান যদি প্রভু বিষ্ণু তার সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন৷ যথাসময়ে কপিলমুনি জন্মগ্রহণ করেন প্রভু বিষ্ণুর অংশ হিসাবে৷ পরবর্তীকালে কপিলমুনি একজন প্রতিষ্ঠিত সাধুতে পরিণত হলেন৷

কপিলমুনির আশ্রম এই সাগরদ্বীপের একপ্রান্তে। এই সাগরদ্বীপের একপ্রান্তে সাগররাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ করে তাঁর ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন৷ প্রচলিত উপাখ্যান হল অশ্বমেধের ঘোড়া যেখান দিয়ে যাবে সেখানকার রাজা যদি ঘোড়া আটকায় তাহলে যুদ্ধ হবে এবং হয় যার ঘোড়া সে জয়ী হয়ে রাজ্য দখল করবে অথবা পরাজিত হয়ে অশ্বমেধের ঘোড়া ফেরত পাবে না৷ সাগররাজা খবর পেলেন তার ঘোড়া পাওয়া যাচ্ছে না৷ কথিত আছে দেবরাজ ইন্দ্র সেই ঘোড়া লুকিয়ে রেখেছেন চুরি করে৷ সাগররাজা তার ৬০ হাজার সন্তানদের খুঁজে বের করার জন্য পাঠালেন৷ তারা ঘুরতে ঘুরতে কপিলমুনির আশ্রমে হাজির হলেন৷ যেহেতু দেবরাজ ইন্দ্র কপিলমুনির আশ্রমে অশ্বমেধের ঘোড়া লুকিয়ে রেখেছিলেন, সাগররাজার ছেলেরা কপিলমুনির আশ্রমে ঘোড়াটিকে দেখে মনে করলেন কপিলমুনিই ঘোড়াটিকে লুকিয়ে রেখেছেন৷ সাগররাজের ছেলেরা কপিলমুনিকে অসম্মানজনক কথা বলায় কপিলমুনি অত্যন্ত রুদ্ধ হলেন এবং মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার জন্য সেই ছেলেদের ভস্ম করেছেন৷ তাদের পোড়া ছাই পাতালে নিক্ষেপ করেন এবং তাদের আত্মাকে নরকে পাঠিয়ে দেন৷ সাগররাজার বংশধর রাজা ভগীরথ কপিলমুনির কাছে প্রার্থনা জানায় সাগররাজার সন্তানদের বাঁচানোর জন্য প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে কপিলমুনি শর্ত দিয়ে জানালেন পার্বতী যদি দেবী গঙ্গা নদীর রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন এবং সেই জলে যদি সাগররাজার সন্তানদের ছাই পবিত্র গঙ্গার জলে মিশে যায় তাহলে তারা মুক্তি পাবে।

রাজা ভগীরথ কঠিন তপস্যা করলেন এবং মহাদেবকে রাজি করালেন গঙ্গার মর্তে অবতরণে৷ গঙ্গা মর্তে অবতরণ করেন এবং গঙ্গার জলে সাগররাজার ৬০ হাজার সন্তান মোক্ষলাভ করেন৷ যেদিন গঙ্গা মর্তে অবতরণ করেছিলেন সেই দিনটি ছিল মকর সংক্রান্তি৷ এই কারণে হিন্দু জনসমষ্টির কাছে অত্যন্ত ধর্মীয় আবেগে সম্পৃক্ত এই দিনটি এবং তারাও ওইদিনে সাগরদ্বীপে গঙ্গায় স্নান করে কপিলমুনির পুজো দিয়ে পাপ থেকে মুক্ত হতে চায়৷ একটি প্রচলিত পৌরাণিক ঘটনা হল গঙ্গাদেবী স্বর্গ থেকে মর্তে যদি সরাসরি অবতরণ করতেন তাহলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত সেইজন মহাদেব তার জটায় গঙ্গাদেবীকে ধারণ করে মর্তে আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন৷ প্রবন্ধের শুরুতেই লিখেছি প্রচলিত প্রবাদটির কথা সব তীর্থ বারবার–গঙ্গাসাগর একবার৷ ওইকথা বলা হত কারণ সাগরদ্বীপে মানুষের পৌঁছনো ছিল ভয়ংকর কষ্টকর৷ ভারতবর্ষে অন্য কোনও তীর্থস্থানে যাওয়া ততটা কষ্টকর ছিল না যতটা গঙ্গাসাগর তীর্থে যেতে মানুষকে পেতে হল৷ একমাত্র সাগরদ্বীপের কপিলমুনির আশ্রমে যেতে চার কিলোমিটার আড়াআড়ি পারাপার করতে হত৷ খাদ্য, বাসস্থান, পানীয় জল, চিকিৎসা, কোনও কিছুরই সুযোগ ছিল না৷ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাগরসঙ্গমে যাওয়া কত বিপজ্জনক ছিল এবং ধর্মীয় কুসংস্কার কত তীব্র ছিল সেকথা লিখেছেন ‘দেবতার গ্রাস’কবিতায়৷ ভয়ংকর বাতাস এবং নদীর গর্জনে নৌকা টলমল যাত্রীরা সমস্বরে নৌকা তীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আর্তনাদ করলেও তীর পর্যন্ত দেখা যায় না৷ অন্ধ কুসংস্কার বশে রাখালকে সমুদ্রের জলে দেয় যাত্রীরা বাঁচবার জন্য কারণ মোক্ষদা রাগের বশে বলেছিল,‘চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে।’‘কবিতাটি মর্মস্পশী কিন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে নৌকাডুবি, বন্যজন্তুর আক্রমণে, বিনা চিকিৎসায়, খাদ্যের এবং বাসস্থানের অভাবে ও প্রবল শীতে বহু মানুষের মৃত্যু হত সাগরদ্বীপে পৌঁছতে।

বিগত দিনে বামফ্রন্টের রাজত্বে সামান্য কিছু পরিবর্তন হলেও নৌকাড়ুবিতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন৷ পরিবহণ দুর্ঘটনা, বাসস্থানে আগুন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার অভাব, বাসস্থানের অভাবের জন্য মুক্ত আকাশতলে শীতের রাত্রিযাপন পুণ্যার্থীদের কাছে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল, তবু মানুষের স্রোত কমেনি৷ আজ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মকর সংক্রান্তিতে স্নান আর কোনওভাবে বিপজ্জনক নয় একথা পুণ্যর্থীরা স্বীকার করেছেন৷ রাজ্যের এবং অন্য রাজ্য থেকে আসা পূণ্যার্থীরা ধন্য ধন্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ অনেক যাত্রী বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখতে চাই৷ ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিবছর ক্রমান্বয়ে সার্বিক পরিষেবার উন্নতি হয়ে চলেছে৷ বামফ্রন্ট আমলে এত দুর্ঘটনা ও নানা কারণে পুণ্যার্থীদের মৃত্যু হত আর এবার মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ১ জন যার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বারবার মন্ত্রীদের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে, নন গভর্নমেন্ট সংস্থা ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন৷

বিদ্যুৎ পরিষেবা এত উন্নত করা হয়েছে যে, লট-৮, কচুবেড়িয়া, চিমাণ্ডড়ি, বেণুবন ও নামখানা-সহ কচুবেড়িয়া থেকে মন্দির পর্যন্ত এবং মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ রুদ্রনগর, কাকদ্বীপ ও নামখানা সাব স্টেশন থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে একটি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন টানা হয়েছিল যাতে যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়৷ প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তায় লোহার ব্যারিকেড করা হয়েছিল দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য। প্রত্যেকটি যাত্রী সমাগমের জায়গায় পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং বেণুবন পয়েন্টে একটি অতিরিক্ত জেটি তৈরি করা হয়েছিল৷ রাস্তা চওড়া করা হয়েছিল দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য৷ হোগলায় যাতে কোনও আগুন না লাগে তার জন্য অগ্নি প্রতিরোধক দেওয়া হয়েছিল৷ ৪০টি বৈদ্যুতিক গাড়িতে জঞ্জাল সাফাইয়ের জন্য রাখা হয়েছিল যা প্রতিনিয়ত জঞ্জাল পরিষ্কার করেছে। স্নানের জায়গায় স্থায়ীভাবে লঞ্চ, স্পিড বোট, হেলিকপ্টারের ব্যবস্থার সঙ্গে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা কর্মী রাখা হয়েছিল৷ কয়েক হাজার পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করেছে৷ সার্চলাইটের সাহায্যে বার্জ ও ভেসেলের গতিবিধি লক্ষ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ প্রতিটি স্থানে মোট ৮০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখার জন্য৷ একটি আন্তর্জাতিক মানের কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছিল যেখানে বাবুঘাটের অস্থায়ী আবাস থেকে মেলা প্রাঙ্গণ পর্যন্ত ৭০০টি সিসিটিভি ও ১২টি ড্রোনের সাহায্যে দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ পোর্টেবল ফ্লাডলাইট এবং উদ্ধার করা, সুবিধা করে দেওয়া, খোঁজখবর করা-সহ সব ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ সামগ্রিক ব্যবস্থার খুব সামান্যই উল্লেখ করা হল যা দেখে পূণ্যার্থীরা দু’হাত তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আশীর্বাদ করে বলেছেন, এমন নেতাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers