মা সারদা ও বাঙালির মাতৃভক্তি

 

রাজ চক্রবর্তী

 

বাঙালির মাতৃভক্তি ইতিহাসে সুবিদিত। আবার এই বাংলায় মাতৃজাতির প্রতি অত্যাচারের কথাও কিছু অবিদিত নয়। সে যাই হোক, বাংলার মা-মাটি-মানুষের প্ৰথমকে সম্মান জানিয়ে আমাদের আজকের কলম এমন একজনের প্রতি নিবেদিত যিনি বাঙালিকে তথা বিশ্ববাসীকে “মা” বলতে শিখিয়েছিলেন নতুন করে।

 

পুরুষতান্ত্রিকতাই হয়তো এদেশের পুরুষকে মাতৃভক্ত করে তুলেছে। তাই বাংলায় পুরুষদেবতার বদলে দূর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতীর বন্দনার ধুম চলেছে সেই সুদূর অতীত থেকে। বাংলায় পুরুষদেবতা বলতে শৈবতীর্থ তারকেশ্বর। অথচ দিকে দিকে শক্তিপীঠ। বাঙালি দেশকেও মা বলেছে, ভূমিকে মাতৃভূমি বলেছে। দেশমাতার ইজ্জত রক্ষা করতে ব্রিটিশের গুলিতে বুক পেতে দিয়েছে। আগমনি-বিজয়ার গান গেয়ে তারা মা-মা বলে কেঁদে  বুক ভাসিয়েছে। শাক্তসংগীতের রচয়িতারা সকলেই কিন্তু পুরুষ। আর বাংলায় বৈষ্ণব পদাবলির তুলনায় শাক্ত পদাবলির জনপ্রিয়তা কিছুটা বেশি তো বটেই। মায়ের প্রতি এই যে ন্যাওটাপনা এর আসল রহস্য ফাঁস করেছেন রামপ্রসাদ সেন। তাঁর ভাষায়, “মার সোহাগে বাপের আদর, এ-দৃষ্টান্ত যথা-তথা।” আবার মায়ের গুণপনা নিয়েই বেশির ভাগ বাঙালির খ্যাতি জুটেছে। বিদ্যাসাগর-বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে মায় জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত। এমনকী মাতৃমুখী পুত্রসন্তান সুখী হয়- এমন একটা প্রবাদও রটেছে। অভিভাবকের জায়গায় সন্তানের কাছে বাপেরা নাম লেখো না কেন, একটা জায়গায় সন্তানের কাছে বাপেরা ব্রাত্যই থেকেছে। তাই তো বলা হয় ‘মাদার্স চাইল্ড’ কথাটা। সে-কথাটা চিকাগো-বিজয়ী বিবেকানন্দ বলেছেন স্পষ্ট করে- “মায়ের কৃপা আমার উপর বাপের কৃপার চেয়ে লক্ষগুণ বড়ো।… ওই মায়ের দিকে আমিও একটু গোঁড়া। মা’র হুকুম হলেই বীরভদ্র ভূতপ্রেত সব করতে পারে। ভায়া, আমেরিকা আসবার আগে মাকে আশীর্বাদ করতে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি এক আশীর্বাদ  দিলেন, অমনি হুপ করে সাগর পার, এই বুঝ।”

 

যাঁর কথা স্বামীজি এই ভাবে লিখেছেন, তিনি জননী সারদা, রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার পর যিনি ছিলেন সংঘজননী। জয়রামবাটির পল্লিকুটিরে ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর (১২৬০ বঙ্গাব্দের ৮ পৌষ) ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন এই কন্যা। মা শ্যামাসুন্দরী তাঁদের এই প্রথম সন্তানের প্রথম নাম রেখেছিলেন ক্ষেমঙ্করী। পরে নাম হল সারদা আর জন্মপত্রিকায় নাম লেখা হল ঠাকুরমণি দেবী।

ভক্ত অভয়পদ বন্দোপাধ্যায় গেয়েছেন, “বৈকুন্ঠ হতে লক্ষ্মী এল পৃথিবীর এই মাটিতে/জয়রামবাটিতে।” বাঁকুড়ার পল্লিবালা এই সারদার বিয়ে হল পাশের গ্রাম কামারপুকুরের গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সারদার বয়স তখন ৬ আর গদাধরের ১৪। তিনি এক নিরক্ষর ব্রাহ্মণ-কন্যা। কিন্তু সব-সময় যে আশ্চর্য বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখা দিয়েছে তাঁর মধ্যে তা পরম বিস্ময়কর। নিবেদিতার ভাষায় তিনি শুধু মা নন, তিনি ঈশ্বরের ‘অপূর্বতম সৃষ্টি’। সেই উনিশ শতকের গ্রাম্য পরিবেশে এই মানুষটি কী করে চরম সংস্কারবর্জিত অথচ পরম বিস্ময়কর। নিবেদিতার ভাষায় তিনি শুধু মা নন, তিনি ঈশ্বরের ‘অপূর্বতম সৃষ্টি’। সেই উনিশ শতকের গ্রাম্য পরিবেশে এই মানুষটি কী করে চরম সংস্কারবর্জিত অথচ পরম সংযত জীবনযাপন করেছেন তা ভেবে বিস্মিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

 

বাঙ্গালোরের এক ভক্তকে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ লিখেছিলেন, “It is so fortunate you are to have the Mother of the Universe at your very door.” এই মায়ের বশ তেলোভেলার ভয়ংকর বাগদি ডাকাত থেকে কলকাতার মাতাল পদ্মবিনোদ, হিন্দু সন্নাসী থেকে মুসলমান আমজাদ, মায় মাদ্রাজি ভক্ত থেকে খ্রীস্টান ডাক্তার পর্যন্ত। মায়ের শেষ অসুখে দেখতে এসেছেন ডাক্তার প্রাণধর বসু। দেখেছেন, ভিজিট নিয়েছেন ষোলো টাকা ও গাড়িভাড়া পাঁচ টাকা। পরের দিন এসে ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি দেখে জানতে চাইলেন, “আমি এতদিন কার চিকিৎসা করছি?” সারদানন্দর কাছে উত্তর শোনার পর থেকে আর ভিজিট তো কখনও নেননি, উল্টে নিজের গাড়ি চড়েই আসতেন বারবার।

 

এ-পোড়া দেশে যখন সারদাদেবীর আবির্ভাব হয়, তখন পরাধীন ভারতের সমাজ পরানুকরণে মত্ত। পশ্চিমের বিদ্যা ও বিত্তের মোহ গ্রাস করেছে ভারতকে। পশ্চিমে তখন নারীর লক্ষ্য পুরুষের মনোরঞ্জন। সতীত্ব ও মাতৃত্বের ধ্যানধারণা সেখানে অনুপস্থিত। কিন্তু সংসর্গদোষে ভারতীয়দের অধঃপতনের সম্ভাবনা ছিল বিলক্ষণ। ঠিক সেই সময় নারীর মাতৃভাবের একটা জলজ্যান্ত আদর্শ দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছিলেন এই মহীয়সী নারী। সেই সর্বব্যাপী মাতৃত্ব আজও আমাদের জীবনে আলোকপাত করে চলেছে। জগতের একটি বিশেষ প্রয়োজন সিদ্ধির উদ্দেশ্যে সারদাদেবীর আগমন। সেই সিদ্ধির দায়িত্ব তাঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং। আজ তাঁর আবির্ভাবের ১৬৬তম বর্ষে তাঁকে আমাদের সভক্তি প্রণাম। এই মাতৃশক্তি আমাদের আলোকিত করে রাখুক দিনগুলিতেও।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers