মানা হল না সংবিধান, ভারতের হৃদয় কাশ্মীর দ্বিখণ্ডিত

কর্মবীর দাসশর্মা

পুরোপুরি সংবিধানকে উপেক্ষা করে, সংসদকে এড়িয়ে, কাশ্মীরবাসীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ভারতের হৃদয় ভূম্বর্গকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। জম্মু-কাশ্মীরে যাঁরা বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন, তাঁদের গৃহবন্দি করে, ইন্টারনেট-মোবাইল বন্ধ করে দিয়ে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে ভূস্বর্গের বাসিন্দাদের হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দিল গেরুয়া রাজনীতিকরা। মানা হল না যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা দূরের কথা, ন্যূনতম সৌজন্যও দেখানো হয়নি জম্মু-কাশ্মীরের প্রবীণ রাজনীতিক থেকে শুরু করে তিন-তিনজন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। গায়ের জোরে, হাজার হাজার সেনা নামিয়ে বিভেদের রাজনীতিকরা নিজেদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও মনোবাসনা পূর্ণ করলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এমন একতরফা সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র অসাংবিধানিক বা অগণতান্ত্রিক নয়, পুরোপুরি মানবতাবিরোধী বলে চেন্নাইয়ে এক কর্মসুচিতে অংশ নিয়ে মন্তব্য করেছেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কাশ্মীরবাসীকে গৃহবন্দি করে যেভাবে ভূস্বর্গকে দু’টুকরো করা হল সেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি অসাংবিধানিক তা প্রথম দিন থেকেই বলে আসছে তৃণমূল কংগ্রেস। সংসদে লোকসভায় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যসভায় ডেরেক ‘ও ব্রায়েন দু’জনেই সংসদে দলের তরফে বক্তব্য রেখেছেন। জননেত্রীর নির্দেশে দলের বক্তব্য ভারতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন তৃণমূলের সাংসদরা। রোল বুক হাতে নিয়ে চেয়ারম্যানের টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ‘ও ব্রায়েন দেখিয়ে দিয়েছেন এত কম সময়ে কাশ্মীর সংরক্ষণ বিল সংসদে পেশ করা হল তা সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়নি। সদস্যদের বিলির আগেই পাস করানোর হুঙ্কার দেওয়া হয়েছে। লোকসভায় তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “যে পদ্ধতিতে এই বিলগুলি আনা হয়েছে, তৃণমূল তার বিরুদ্ধে। কাশ্মীরবাসীর অধিকার ও গণতন্ত্রকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।” উপত্যকার সাধারণ নাগরিক থেকে তিন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা এবং গ্রেফতারের প্রতিবাদ করেছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে সংসদে তৃণমূল এই বিলকে সমর্থন না করে ওয়াকআউট করেছে।

চেন্নাইয়ে করুণানিধির মূর্তি উন্মোচন করে কর্মসূচির প্রধান অতিথি জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে কোনও কথা বলা হয়নি। তাঁদের গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। করুণানিধি এমন রাজনীতির বিরোধিতা করতেন।” এরপরই কাশ্মীরের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কখনও কখনও কোনও কোনও রাজনৈতিক দল আলাদা করে নানা সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সিন্ধান্ত যদি দেশের সমস্ত মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত হয়, তবে সবার সঙ্গে কথা বলা উচিত। যে রাজ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেখানকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। কাশ্মীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেখানকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা দূরের কথা, বিন্দুমাত্র কথা বলা হয়নি।” এরপরই মূর্তি উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে ফারুক আবদুল্লাদের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে আনেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রের নির্দেশে গ্রেফতারের তীব্র বিরোধিতা করে জননেত্রী বলেন, “আজ তো আমি ভেবেছিলাম, ফারুক আবদুল্লাজি এই সমাবেশে থাকবেন। কিন্তু তিনি আসতেই পারেননি।”

চেন্নাই যাওয়ার সময় কলকাতা বিমানবন্দরে কাশ্মীর নিয়ে কেন্ত্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন মা-মাটি-মানুষের নেত্রী। বলেছিলেন, “এক্ষেত্রে বিষয়বস্তু নিয়ে তার কোনও বক্তব্য না থাকলেও পদ্ধতি নিয়ে বিরোধিতা রয়েছে। যেভাবে ৩৭০ ধারা রদ ও কাশ্মীরকে ভাঙা হয়েছে তা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে করা উচিত ছিল।” বাংলার অগ্নিকন্যার কথায়, “রাজ্যসভায় যা ঘটেছে, ভারতের বাকি নাগরিকদের মতো আমিও তাতে নজর রেখেছিলাম। আমি বিশ্বাস করি কাশ্মীরের বাসিন্দারাও আমাদের ভাই-বোন। আমি এই সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু নিয়ে কিছু বলছি না। কিন্তু যে পদ্ধুতিতে এটা হল তার সঙ্গে একমত নই। সংসদে আমরা বিলের পক্ষে ভোট দিইনি। কারণ, তাতে সংসদে এটা রেকর্ড হয়ে থাকবে। এই বিলকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। সাংবিধানিক, আইনগত এবং পদ্ধতিগতভাবে কাজটা প্রশংসনীয় হয়নি। গণতান্ত্রিকভাবে এটা করাও হয়নি।” মুখ্যমন্ত্রীর মতে সংসদে বিল ও প্রস্তাব আনার আগে কাশ্মীরের মানুষ ও দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের উচিত ছিল কথা বলে নেওয়া। তিনি বলেন, “ওঁরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন। ওঁদের কাশ্মীরের লোকজনকেও ডাকা উচিত ছিল। বৈঠক ডাকলে আমরা যেতে রাজি ছিলাম। আলোচনার মাধ্যমে সবাইকে সহমতে এনে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। কিন্তু কখনও কখনও স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ক্রটি ছিল।” একইসঙ্গে জননেত্রী কাশ্মীরের তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা, ওমর আবদুল্লা, মেহবুবা মুফতিদের মুক্তিও দাবি করেন। তিনি বলেন, “ওঁরা কেউ জঙ্গি নয়। গণতন্ত্রের স্বার্থেই ওঁদের মুক্তি দেওয়া উচিত।”

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers