মাতৃত্বের চিরন্তন লাইটহাউস

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

পরাধীন ভারতের ইতিহাসে সেই সময়টাকে বলা হয় কোম্পানির আমল। সিপাহি বিদ্রোহের কয়েকটা বছর আগে। উনিশ শতকের মধ্যগগনে বাংলা। হুগলি জেলার সংলগ্ন বাঁকুড়ার এক অখ্যাত গ্রাম জয়রামবাটি। আশপাশের অন্য গ্রামগুলির তুলনায় জয়রামবাটি ছিল খানিকটা শ্রীময়ী। নজরকাড়া সবুজ প্রান্তর, চাষের খেত আর একখানি এঁকেবেঁকে বয়ে চলা নদী- নাম তার আমোদর। সারা গ্রামটিতে নাকি তখন একখানি দোকানও ছিল না। ছিল কিছু দরিদ্র মানুষের বাসযোগ্য কুটির।

সেই গ্রামে সেদিন নবান্ন উৎসব চলছিল। মার্গশীর্ষ অবসানে পৌষের শীত। মাঠে মাঠে রবিশস্যের হাসি। এমন এক অপূর্ব সময়ে ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর (১২৬০ বঙ্গাব্দের ৮ পৌষ) বৃহস্পতিবার কৃষ্ণসপ্তমী তিথির পরম শুভক্ষণে রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ঘরে বেজে উঠল মঙ্গলশঙ্খ। ভূমিষ্ঠ হল সুলক্ষণযুক্ত এক কন্যাশিশু।পুত্র কামালের জন্মসময়ে সন্ত কবীরদাস বলেছিলেন, “যব হাম প্যায়দা হুয়ে/ জগ হাঁসে হাম রোয়ে। / অ্যায়সে করনি কর চলো / কি জগ রোয়ে হাম হাসে।” সারদার জন্মের সময়েও মাতা শ্যামাসুন্দরীর পড়শিরা আনন্দে নেচে উঠল। তখনও কারও জানা নেই যে, এই শিশুই পরবতীতে হবেন জগৎপূজ্য জননী। আর শুধু তাঁরই জন্য জয়রামবাটি হয়ে উঠবে অগণিত লোকের কাছে তীর্থভূমি।

জন্মপত্রিকায় ঠাকুরমণি নাম রাখা হয়েছিল সদ্যোজাত কন্যার। আর মাতা চন্দ্রমণি মেয়ের নাম রেখেছিলেন ক্ষেমঙ্করী। স্বামী গৌরীশ্বরানন্দের একটি লেখায় জনা যায়, মা সারদা নিজেই জানিয়েছিলেন তাঁর নামের ইতিহাস। তাঁর মাসিমার সারদার নামে একটি কন্যা মারা গিয়েছিল। সেই মাসিমার অনুরোধেই চন্দ্রমণির মেয়ের নাম বদলে রাখা হয় সারদা। সারদার বাবা রামচন্দ্রের জীবিকা ছিল যজমানি আর চাষবাস। তুলো, তিল, তিসির চাষ হত জমিতে। কিন্তু সরলতা আর পবিত্রতাই ছিল তাঁদের জীবনের আসল সম্পদ। এবং সেটা ছিল আজকের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় অবিশ্বাস্য রকমের। কত সামান্য উপার্জনে তৃপ্ত আর সুখী জীবনযাপন ছিল তাঁদের।
লোভ-লালসা আর পরশ্রীকাতরতার দৈন্য ছিল না। তার বদলে ছিল অখণ্ড ঈশ্বর-নির্ভরতা। তাঁরা পুরুষানুক্রমে ছিলেন ধর্মঠাকুরের সেবাইত ও ‘রাম’ মন্ত্রের উপাসক। পরিবারের অনেকের নামেই রামনাম যুক্ত ছিল তাঁদের। বর্তমানে জয়রামবাটিতে যেখানটিতে মাতৃমন্দিরটি নির্মিত হয়েছে সেখানেই ছিল রামচন্দ্রের বাস্তুভিটে। সারদামণি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন সেখানেই। সম্ভবত খ্রিস্টীয় দশম শতক থেকে এখানেই পরিবারটির বাস ছিল। বিষ্ণুপুরের রাজা চৈতন্য সিং দেব সেখানে সাড়ে সতেরো কাঠা ব্রাহ্মোত্তর ও দেবোত্তর নিষ্কর জমি দান করেছিলেন এই ব্রাহ্মণ পরিবারটিকে।

এ বছর শ্রীমা সারদা দেবীর ১৬৭তম জন্মতিথি। আজ আকণ্ঠ ভোগ-লালসা, হিংসা-বৈরিতায় ডুবে থাকা মানুষ কীভাবে সেই মহীয়সী নারীর মূল্যায়ন করবে শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিনী হিসাবেই শুধু নয়, মাতৃশক্তির বার্তাবহ এক স্বতন্ত্র নিজস্ব পরিচয়ে তিনি আজ মানবজাতির কাছে পরিচিত। এমন নারীরা যুগে যুগে একান্তভাবেই একক। ভূরি ভূরি জ্ঞানবিজ্ঞান, শিক্ষাদীক্ষায় বলীয়ান হয়েও আমরা যে কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা ও অমানবিকতার দাসত্ব বর্জন করতে পারিনি, পুরনো শতাব্দীর বাহ্যত ‘অশিক্ষিত’ এই ব্রাহ্মণ পল্লিরমণী সেই রক্ষণশীল ও সংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামে বসেই উদার নির্মল মাতৃভাবের দ্বারা সেসবকে অনায়াসে বর্জন করে দেখিয়েছেন। বাংলার মা-মাটি-মানুষের প্রথমেই স্মরণ করা হয়েছে ‘মা’কে। সেই মায়ের স্বরূপ পৃথিবীতে অক্ষয় করে রেখে গিয়েছেন শ্রীমা সারদা দেবী। মাতৃভাবের প্রচারের জন্যই তাঁর পৃথিবীতে আগমন। সেই আশ্চর্য মাতৃভাবের লীলা দেখে যেমন অবাক হয়েছে গ্রামের ডাকাত আমজাদ, তেলোভেলোর ডাকাত-বাবা, তেমনি সেই ভাব অবাক করেছে সাগরপারের নারী মার্গারেট নোবেলকেও। বাংলার ঘরে ঘরে মায়েরা মাতৃভাব বিকশিত করেন। কিন্তু, এই মায়ের লাখো সন্তান সারা দুনিয়া জুড়ে। গর্ভধারণ না করেও লাখো সন্তানের জননী সারদাদেবী দেখালেন মাতৃভাবের নবতর মহিমা। তারই আশীর্বাদ নিয়ে সাগর পার হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর নিজ হাতে তুলে দেওয়া খাবার প্রসাদজ্ঞানে কলাপাতাসুদ্ধ খেয়ে ফেলতেন সাধু নাগমহাশয়। অথচ জয়রামবাটির পল্লিকুটিরে বসে তিনি যখন ঘর সামলাতেন, বাহ্য দৃষ্টিতে কোনও অলৌকিকত্বই বোঝা যেত না তাঁর। অবগুণ্ঠনবতী জননী কলকাতা শহরের সংঘজননী রূপে আরেক মুর্তিতে দেখা দিতেন। তিনি সারদা-সরস্বতী। বলেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। আজ মানবতা ও সহিষ্ণুতার ঘোর দৈন্যের দিনে মাতা সারদাদেবীর পথ নির্বিকল্পভাবে অনুসরণ করা জরুরি। তিনি চিরন্তন মাতৃত্বের লাউটহাউস। আজকের বালিকাদের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত সারদাদেবীর জীবনচর্যা। তাতে লাভ বই ক্ষতির সম্ভাবনা নাস্তি।

 

 

 

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial