মমতার মতো সৎ সাহসী নেত্রীর দেশে বড়ই অভাব

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

পশ্চিমবাংলায় মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর একটি উক্তি যা তিনি দলের কর্মিসভায় বলেছেন। তাঁকে স্বাগত না জানালে অপরাধবোধে ভুগতে হবে। তিনি বলেছেন তাঁর দলের কোনও নেতা বা কর্মী যদি অন্যায় অর্থ বা কোনও কিছু গ্রহণ করেছেন তা মানুষকে ফেরত দিতে হবে। এই মুহূর্তে ভারতবর্ষে কোনও রাজনৈতিক নেতা নেই যিনি প্রথমে তাঁর নিজের দলের কর্মীদের সৎ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পরে সকলকে সততার পথে থেকে দেশ ও রাজ্যের উন্নয়নে শামিল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এটা বাংলা তথা দেশের মানুষ জানেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহজ সরল জীবনযাত্রার কথা। উপদেশ দেওয়ার জন্য উপদেশদাতাকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। ব্যক্তিজীবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা অর্জন করেছেন বলেই তিনি এই সৎসাহস দেখাবার মতো সাহস দেখিয়েছেন। ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে কোনও দল আছে কি না জানা নেই যারা অহঙ্কার করে বলতে পারে তাদের দলের নেতা ও কর্মীরা সৎ ও সত্যনিষ্ঠ নেই তার কারণ হল স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে যখন সরকার গঠিত হল তখন অল্প কিছু মানুষ অসৎ ছিল কিন্তু সময় যত এগিয়েছে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা লোভ সংবরণ করতে পারেননি এবং ক্রমশ দুর্নীতি ছড়িয়েছে পড়েছে মহামারীর মতো। বিভিন্ন মানুষ যাদের নিজেদের কার্যসিদ্ধির জন্য মন্ত্রী, আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রলোভন দেখায় এবং যারা সৎ তাদেরকে প্রলুব্ধ করতে পারে না কিন্তু অনেক মানুষই এই প্রলোভনকে জয় করতে পারেন না এবং স্বার্থান্বেষীদের পাতা ফাঁদে পা দেন। একবার পদস্খলন হলে তারা অর্থ ও সম্পদের মোহে পড়েন এবং তখন তারা বার বার পাপ জেনেও সেই পথেই পা বাড়ান। স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে অসংখ্য আদর্শ মানুষের জন্ম হয়েছে ভারতের মাটিতে কিন্ত তার প্রভাব সর্বত্র প্রসারিত হয়নি। ভারতবর্ষ ধর্মের দেশ, ভারতের জনজীবনের মর্মবাণী আধ্যাত্মিকতা তা সত্ত্বেও মানুষের মন থেকে অসৎ প্রবৃত্তি দূর হয়নি। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান-সহ বিচিত্র ধর্মের সভায় যারা ধর্মীয় গুরু তারা মানুষের অন্তরে সৎ প্রবৃত্তি জাগরিত করার কথাই বলেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষা দেন কিন্তু সেই শিক্ষায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সাড়া দেয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার অভাব, দারিদ্র এবং নোংরা পরিবেশে জীবনযাপন মানুষকে অন্যায়ের পথ বেছে নিতে সাহায্য করেছে। উপরোক্ত কথাগুলি সমস্যার অধিক সরলীকরণ হয়ে গেল। শিক্ষিত ও শিক্ষিত মানুষরাও এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত বহু মানুষ ব্যাপকভাবে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, একথাও সত্য। বড় অঙ্কের দুর্নীতি করার জন্য এখন রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ ক্রমশ বাড়ছে।

ভারতবর্ষে সাম্প্রতিক অতীতে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে জেলও খেটেছেন বা খাটছেন যেমন লালুপ্রসাদ যাদব, সুরেশ কালমাদি, শ্রীমতী কানিমোঝি, শ্রী বি. এস. ইয়েদুরাপ্পা, বঙ্গারু লক্ষণ, মণিপাল ম্যান্ডেরনা, অমর সিং, আর বালকৃষ্ণ পিল্লাই, শ্রীমতী বিবি জাগির কাউর, শ্রী সুখরাম-সহ আরও অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়। যদিও যতক্ষণ না আদালত তাদের দোষী বলে সাব্যস্ত করছেন ততক্ষণ কাউকে দোষী বা দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যায় না। ভারতবর্ষের সংসদ একটি কমিটি করে জানতে চায় এই মুহূর্তে ভারতীয়দের সম্পদ দেশের বাইরে কত জমা হয়েছে। কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে টাকার অঙ্কে তা হল ৩৮৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৯০ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিককালে আমরা দেখেছি ২৯ জন অসাধু ব্যবসায়ী দেশের ব্যাঙ্কের টাকা বাস্তবিকভাবে লুঠ করে বিদেশে চলে গিয়েছে। বিজয় মালিয়া, মেহুল চোকসি, নীরব মোদি-সহ ২৯ জন ব্যবসায়ী ৫০০ কোটি থেকে ১২-১৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছে। কীভাবে দেশের সরকারের চোখে ফাঁকি দিয়ে তারা চলে গেল যদি না উচ্চপর্যায়ের নেতা ও সরকারি আধিকারিকরা এদের সাহায্য করে থাকে। এই পর্যায়ের দুর্নীতি মানুষ যখন জানতে পারে তখন তা নিচের স্তর পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে। সরকারি আমলা, দালালদের সম্পদ বৃদ্ধি মানুষের নজরে সহজে আসে না কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের এবং তাদের ছত্রছায়ার থাকা মানুষদের দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের নজরে আসে। কিন্ত তাদের পুলিশ প্রশাসনে এতটাই ক্ষমতা থাকে যে তাদের আঘাত করতে সাধারণ মানুষ ভয় পায়।

আধুনিক ভারতবর্ষের মানুষ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে আদর্শ নেতা হিসেবে গ্রহণ করে তাকে জাতির পিতা আখ্যায় ভূষিত করেছে। মহাত্মা গান্ধীর মতে, মানুষের সব সমস্যার কাছে দুটি শিকড় (১) বাসনা (২) লোভ। বাসনা ও লোভের দ্বারা তাড়িত মানুষ একান্তই নিজ স্বার্থে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠে। তার দৃষ্টি হয় ক্ষুদ্র।বৃহতের পটভূমিতে এই মানুষ কাজ করতে অক্ষম। সমস্ত কাজ, চিন্তা, সঙ্কল্পে থাকে একটি মৌলিক লক্ষ্য, কীভাবে নিজ স্বার্থ, নিজ তৃপ্তির রসদ পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাবে। ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকেই শুধুমাত্র সব বিষয় পর্যালোচনা করতে থাকলে বৃহত্তর বিষয়গুলির অনুধাবন করাই সম্ভব হয় না। মানুষের ক্ষুদ্রতর পরিমন্ডল ক্ষুদ্রদৃষ্টির সঞ্চার ঘটায়। ক্ষুদ্র দৃষ্টির ফলে জগতের সকলকে মনে হয় ক্ষুদ্র দৃষ্টির পূজারি। একান্তই নিজ স্বার্থের পরিপূর্ণতার জন্য যে ব্যক্তি ব্যাপৃত তার কাছে এই বিশ্বাস ফুটে ওঠে যে, জগতের সকলেই নিজ স্বার্থের জন্যই ছুটে চলেছে। তার ধারণা এমনও হয় যে কোনও ব্যক্তির স্বার্থত্যাগ বা আত্মবিসর্জনকেও সে রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা ব্যাখ্যা উপস্থিত করতে সচেষ্ট হয়। বোঝাতে চেষ্টা করে যে জগতের সব কিছুই চলছে স্বার্থের নিরিখে। এই ব্যক্তি কোনও মহৎ কাজে যুক্ত হতে পারেন না উদার মন নিয়ে। কাজের প্রবাহে যুক্ত হলেও তার মধ্য থেকেই ওই ব্যক্তি খুঁজতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে নিজ স্বার্থের স্ফূর্তি।

মহাত্মা গান্ধী যে দর্শনে বিশ্বাস করতেন আজকের ভারতবাসীকে সেই পথই অবলম্বন করতে হবে। আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিজীবন একেবারেই মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত। দীর্ঘদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, অর্থ বা সম্পদের প্রতি কোনও লোভই তাঁর নেই। ভারতবর্ষের মন্ত্রীত্বের পদে থেকে অথবা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে থেকে বিপুল অর্থ ও সম্পদের অধিকারী হতে পারতেন তিনি। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন যে মহত্তর মানুষ না হতে পারলে নেতৃত্বে থাকা শোভা পায় না। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই যা বর্তমান দলের সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দকে প্রভাবিত করবে স্বচ্ছ ও নির্লোভ জীবনযাপনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য রেল ভবনে গিয়েছি। রেল বোর্ডের একজন সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছুক্ষণ পরে তার ঘরে যেতেই চা খেতে বললেন। চা খাওয়ার পর তিনি দেখলাম নিজের ছোট ব্যাগ থেকে বেয়ারাকে টাকা দিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করতে বললেন তিনি দফতরে বসে যা নিজের জন্য বা নিজের অতিথির জন্য ব্যবস্থা করতে বলেন, তার দাম তিনি নিজেই দেন। সম্ভবত, এই কথা অনেকেই জানে না বা মহাত্মা গান্ধীর কথায় জেনেও তাকে ছোট করে দেখেন। ঘটনাটি ক্ষুদ্র কিন্তু আজকে যারা ক্ষমতায় বিভিন্নস্তরে আছেন তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাচনভঙ্গি অত্যন্ত সহজ ও সরল যে কারণে তথাকথিত ‘এলিট’ সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে অন্য চোখে দেখেন। দলীয় কর্মীদের বিভিন্ন সভায় বহুবার বলেছেন একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য কী প্রয়োজন। যেটাই প্রয়োজন হোক তা অর্জন করতে কোনও অসৎ পথ অবলম্বন করা অত্যন্ত অন্যায়। তিনি বিদেশে গিয়ে এবং আমাদের দেশে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দামি পোশাক, জুতো বা গয়নার প্রয়োজনবোধ করেননি। ভারতবর্ষে কৌটিল্যই অর্থশাস্ত্রের জনক। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের পরিচয় রাষ্ট্র নেতৃত্ব থেকে আসে। রাষ্ট্রের জাগরণ ও আর্থিক স্থিতি একইভাবে দাবি করে উপযুক্ত নেতৃত্বের। নেতৃত্বের পরিচয়ই রাষ্ট্র সব সময়ে পরিচিত হয় না কিন্তু নেতৃত্বের বিকাশ উপযুক্ত মাত্রায় না হলে রাষ্ট্রেরও বিকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

রাজ্যের বিকাশের প্রশ্নে নির্দ্বিধায় বলা যায় কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, নির্মল বাংলা প্রভৃতি প্রকল্প দেশ-বিদেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। পঞ্চায়েত গরিব মানুষের জন্য গৃহনির্মাণ,পঞ্চায়েতের রাস্তা, বিদ্যুৎ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিমবাংলা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। আর্থিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া পশ্চিমবঙ্গকে সাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন যে কারণে ২০১১ সাপেক্ষে পরিকল্পনা ব্যয় ৬ গুণের বেশি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তিনি মনে করেছেন যারা দলের নেতৃত্বে থেকে অথবা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ক্ষমতায় থেকে অসাধু উপায়ে রোজগার করেছেন তারা যার কাছ থেকে এই অর্থ নিয়েছেন তারা ফেরত দেবেন। বর্তমান ভারতে একজনও নেতা নেই যিনি নিজের দলের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ করার জন্য এই সাহসী ঘোষণা করতে পারেন। আবারও বলতে চাই এই পদক্ষেপ করার ক্ষমতা শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই আছে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial