মমতার টানে হাজির দেশের রাজনৈতিক নক্ষত্ররা

মেঘাংশী দাস

১৯ জানুয়ারি ব্রিগেডে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, সমস্ত নেতাদের একমঞ্চে হাজির করে ইতিহাস গড়লেন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তিন মুখ্যমন্ত্রী, চার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, পাঁচ কেন্দ্রীয় প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, এমনকী বিজেপির সাংসদরাও। রাজনৈতিক নক্ষত্ররা এতিহাসিক সমাবেশে দাঁড়িয়ে বক্তব্যে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘একমাত্র মমতাই পারেন, পেরেছেনও নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশে সবাইকে একমঞ্চে হাজির করতে।’ খোদ বিজেপি সাংসদ শক্রঘ্নর ভাষায়, “জানদার, মানদার, শানদার সভা আয়োজনের মুল কৃতিত্ব বাংলার অগ্নিকন্যা মমতা বহিনের।”

দেশের মধ্যে ব্রিগেডেই একসঙ্গে হাজির হয়েছিলেন মোদি বিরোধী সমস্ত রাজ্যের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। ছিলেন কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা থেকে শুরু করে তামিলনাড়ুর ডিএমকে সভাপতি স্ট্যালিন, এসেছিলেন অন্ধপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, মায়াবতীর দূত সতীশ মিশ্র, লালুপ্রসাদ যাদবের পুত্র তেজস্বী, গুজরাতে মোদির ঘুম ছুটিয়ে দেওয়া তরুণ দুই নেতা হার্দিক প্যাটেল ও জিগ্নেশ। বক্তব্য রাখেন অটল্বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রীসভার অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহাব ও অরুণ শৌরি।

‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়া’-এটাই ছিল জননেত্রীর ডাকে জনসমুদ্রের মূল থিম। এর আগে কখনও এভাবে এক খণ্ড ভারতকে তিলোত্তমার রাজনৈতিক মঞ্চে প্রত্যক্ষ করেনি বাংলা । হিন্দি, উর্দু, তামিল,তেলেগু, কন্নড়, মারাঠি, গুজরাতি, কাশ্মীরি, মৈথিলি, সিন্ধ্রি, মিজো-আর কত বলব- সব ভাষাভাষী মানুষ এসে এসেছিলেন মা-মাটি-মানুষের নেত্রীর ডাকে কলকাতার ব্রিগেডে। মঞ্চে ছিলেন অখিলেশ-জিগনেশ-হার্দিক-জয়ন্তদের মতন একঝাক যুবক। যারা ভবিষ্যতের দেশনেতা । গর্বের হল, ব্রিগেডের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে গোটা দেশকে নেতৃত্ব দিল বাংলা ভাষা । আরও ভাল করে বললে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যকে তিনি অনেক উচ্চতায় তুলে দিয়েছেন ১৯শে জানুয়ারির মহাসমাবেশ থেকে। মোদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আঞ্চলিক দলের নেত্রীর আসনটাও তাঁর আরও পোক্ত হল। খুব স্বাভাবিকভাবেই বক্তারা সার সত্যটা স্বীকার করে স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার নেতৃত্ব দানের প্রসঙ্গ তুললেন। কেউ কেউ মনে করিয়ে দিলেন মহামতি গোখলের বিখ্যাত উক্তি,’হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে,ইন্ডিয়া থিংক্স টুমরো’। আসলে জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দিল্লিতে পরিবর্তনের ডাকই যে আগামি দিনে গোটা দেশে কার্যকর হতে চলেছে, তা স্বীকার করে নিয়েছেন মঞ্চের নক্ষত্ররা। ব্রিগেড সমাবেশে অভিমুখ ছিল একমুখী। নজরে নরেন্দ্র মোদি।

সাবার টার্গেট প্রধানমন্ত্রী । একটাই আওয়াজ । তাকে যেভাবে হোক সরাতে হবে। কারণ সবার এক সুর, মোদি আরও একবার ক্ষমতায় এলে দেশের সংবিধানটাই বদলে দেবেন। নির্বাচন বন্ধ করে দেবেন।ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সাধারণ মানুষের টাকাও লোপাট হয়ে যাবে। দেশনেত্রী তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর এই পাঁচ বছরকে তুলনা করলেন হিটলারের জমানার সঙ্গে । অন্যদের গলায় আক্রমণ তীব্র। একসঙ্গে গোটা বিরোধী শিবিরের চোখেই ভিলেন শুধু মোদি। বাইরে থেকে নয়, মোদি হঠানোর আওয়াজ উঠল বিজেপির ঘর থেকেই । শক্রঘ্ন সিনহা এখনও বিজেপির সাংসদ। তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ যে, বিরোধী শিবিরকে বার্তা দিয়ে বললেন, “মতভেদ আপনাদের হতে পারে, কিন্তু মনের ভেদ যেন না হয়। মোদিকে হারাতেই হবে।” বাজপেয়ী আমলের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী অরুণ শৌরি ও যশবন্ত সিনহার ভাষণে ছিল প্রধানমন্ত্রীর তীব্র শ্লেষ। তাতে সামিল সদ্য বিজেপি ত্যাগ করা অরুণাচল প্রদেশের পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী গেগং আপাং।

সত্যি সত্যিই নতুন ইতিহাস গড়লেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ব্রিগেডের প্রতিটি ঘাস ইতিহাসের কথা বলে। আন্দোলনের কথা বলে। কত না গৌরবোজ্জ্বল অতীত। কিন্তু তাই বলে এমন নক্ষত্রখচিত মঞ্চ কখনও দেখা যায়নি। আর এর কৃতিত্ব যে বাংলার অগ্নিকন্যার তা বলতে দ্বিধা করলেন না জাতীয় নেতারা। সবাইকে নিয়ে মঞ্চে ওঠার পর যখন মাইক হাতে নিলেন, তখন ঘড়িতে বাজে ১১টা ৪৬ মিনিট। ব্রিগেডে তখনও এসে পৌছতে পারেননি বহু মানুষ৷ তা সত্বেও সভা শুরু করে দিয়েছিলেন জননেত্রী । সভার শুরুটা গুজরাত দিয়ে। প্রথমে বিজেপির ঘুম ছুটিয়ে দেওয়া হার্দিক প্যাটেল। তার পর তরুণ তুর্কি জিগ্নেশ। একেবারে বিজেপির আঁতুড়ঘর থেকে আসা দুই নওজওয়ান তীব্র আক্রমণ শানালেন প্রধানমন্ত্রীকে। একে একে সবার বক্তব্য । সবশেষ বক্তা মুখ্যমন্ত্রী। তিনি যখন শেষ করলেন তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৩ টে ৪৬ মিনিট। মানে পুরো চার ঘণ্টা। এত দীর্ঘ সময় কখনও কোনও ব্রিগেড হয়নি। সভায় মোট বক্তা ছিলেন ২৩ জন। নানা রাজ্যের নানা উপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন বক্তারা । বলেছেন, মোদির নেতৃত্বে বিজেপি দেশের সর্বনাশ কীভাবে করে চলেছে। ভেদাভেদের রাজনীতি কীভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে ভারতীয় সংস্কৃতি এবং মানবিকতার আত্মা। জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জননেত্রীকে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ে “লৌহমানবী” বলেন স্ট্যালিন। “শেরনি” বলেন অরুণ শৌরি। তবে নিজের বক্তব্যে জননেত্রী বলেন, “এই মঞ্চ ভারতবর্ষের মঞ্চ। নতুন সূর্য উঠবে । আমরা একসঙ্গে কাজ করব। এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। কখনও কখনও সময়ের প্রয়োজনে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা এক আকাশে উঁকি মারে। বাংলা একসময় নবজাগরণে পথ দেখিয়েছে। এখন দেশকে পথ দেখাবে ।”

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers