ভয় ও অসহিষ্ণুতা গনতন্ত্রের বড় বিপদ

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

সাম্প্রতিককালে দেশেরএকজন প্রখ্যাত অভিনেতা নাসিরুদ্দিন তাঁর সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত বলে মতপ্রকাশ করেছেন। নাসিরুদ্দিন শাহ-এর মতো একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ যদি এই ভয় ব্যক্ত করেন তাহলে গণতন্ত্র শব্দটি কলুষিত হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে দল বা দলের সমষ্টি ক্ষমতায় আসক কেন্দ্রে আথবা রাজ্যে, তাঁরা সংবিধানের বর্ণিত ধারাগুলির দ্বারা আবদ্ধ। কারও ক্ষমতা সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়, কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের সংবিধানে ক্ষমতার সীমানা নির্ধারণ করা আছে। সংবিধানের ১৯নং ধারায় বলা হয়েছে (১) প্রতি নাগরিকের কথা বলা ও অভিব্যক্তির স্বাধীনতা থাকবে, (২)অস্ত্র ছাড়া সমাবেশ করার অ্যাসোসিয়েশন বা ইউনিয়ন করা, ভারতীয় সীমানার মধ্যে স্বাধীনভাবে পরিক্রমা করা, দেশের যে কোনও স্থানে থাকা ও স্থায়ীভাবে বসবাস করা, যে কোনও কাজ করা এবং যে কোনও চাকরি ও ব্যবসা স্বাধীনভাবে করার অধিকার ভারতীয় নাগরিকদের কাছে আছে। নাসিরুদ্দিন শাহ তাঁর মত ব্যক্ত করার পর যাঁরা অসহিষ্ণু তাঁরা নানা ধরনের ব্যঙ্গোক্তি করেছেন যা তাঁর পক্ষে অপমানকর। দেশের যাঁরা পরিচালক তারা জানেন যে ভারতবর্ষ বহু জাতি, উপজাতি ও ভাষাভাষী মানুষের দেশ এবং প্রত্যেক মানুষের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত। অতএব নাসিরুদ্দিন শা তাঁর ব্যক্তিগত মত জানিয়েছেন, যা তাঁর অধিকারের মধ্যে পড়ে। রাজা বা দেশের শাসক কেমন হবেন তাঁর নিদর্শন আমরা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনী’ পুস্তকে ‘মস্তক বিক্রয়’ কবিতায়। সংক্ষেপে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই। কাশীরাজ কোশলরাজকে হিংসা করতেন কোশলরাজকে দেশের মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত এবং তাঁকে দীনদরিদ্রের পিতামাতা মনে করত।

কাশীরাজ হিংসার বশে কোশল রাজ্য আক্রমণ করলেন। কোশলরাজ রাজ্য ছেড়ে বনে পালিয়ে গেলেন। কোশল রাজ্যের মানুষ মর্মাহত হয়ে বললেন, “সকল মানুষের বন্ধু যারা তাদের শত্রুদের ধিক।” এমন সময় এক বণিকের তরী গেলে সে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবণধারণ করতে করতে বনের মধ্যে কোশল রাজাকে জিজ্ঞাসা করলেন কীভাবে কোশল রাজ্যে যাবেন। এরই মধ্যে কাশীরাজ ঘোষণা করেছেন, কোশল রাজকে ধরে আনলে শত স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। কোশলরাজ সেই বণিককে নিয়ে কাশীরাজের রাজসভায় গিয়ে জানালেন তিনি কোশলরাজ এবং বণিকটিকে শত স্বর্ণমুদ্রা দেবার জন্য। কাশীরাজ তাঁকে জানালেন মরে তুমি আরও মহান হবে। তা হতে দেব না। তোমাকে রাজত্ব ফিরিয়ে দেব এবং হৃদয়ে স্থান দেব। বলে রাজমুকুট তাকে পরিয়ে দিলেন। সমস্ত মানুষ কাশীরাজকে ধন্য ধন্য করল। ওই কবিতা পড়ে আমরা বুঝি রাজা বা শাসক কেমন হবে।

নাসিরুদ্দিন শাহের বক্তব্যের পর তাঁকে কটুক্তি না করে শাসকদলের নেতাদের উচিত ছিল তাঁকে ডেকে বলা যে ভারতবর্ষে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ। আপনার পরিবারের সকলে নিরাপদ। আপনার পরিবারের সকলে নিরাপদ। দেশবাসী ধন্য ধন্য করতেন। স্বামীজি বলেছিলেন, “শিক্ষা সর্বরোগহরা”। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী করে। যাঁরা আজ দেশের শাসক তাঁরা যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হত তাহলে কোশলরাজের মতো যিনি মানুষের ভালবাসার পাত্র তাকে কাশীরাজের মতো দেশকে ডেকে এনে তাঁর ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত একথা জানা উচিত ছিল। কাশীরাজ সেই বিনয় প্রদর্শন করেছিলেন বলেই পুরবাসী তাঁকে ধন্য ধন্য করেছিল। স্বামীজি বুঝেছিলেন ভারতবর্ষের মানুষের রোগগুলি হল অশিক্ষা, কুসংস্কার, জাতপাত, ধর্মান্ধতা যার থেকে উৎপত্তি হয় অন্ধত্ব ও অসহিষ্ণুতা।

গণতন্ত্র দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরিক্ষার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ এবং বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ গণতন্ত্র চায়। ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটি আজ জেনেছে শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার তার আছে। খ্রিঃপূর্ব পাঁচ শতকে প্রখ্যাত দার্শনিক হেরোডোটাস বলেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের কথা। সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলেছিলেন নাগরিকদের সম অধিকারের কথা ও শাসকের দায়বদ্ধতার কথা। দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, “এথেনিয়ান সংবিধানই গণতন্ত্র কারণ ইহা সংখ্যাধিক্যের জন্য কল্যাণকর।” দার্শনিক ও রাষ্ট্রনেতা আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্রের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আজও বিশ্বের মানুষ মনে করে সেটি সর্বোত্তম। তিনি বলেছিলেন, “জনগণের গণতন্ত্র, জনগণের জন্য এবং জনগণের দ্বারা।” আজও এই মন্তব্য সমগ্র পৃথিবীতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং বিশ্বের গনতন্ত্রপ্রেমী মানুষ গনতন্ত্রের এই ব্যাখ্যাকেই সমর্থন করে। পরবর্তীকালে দার্শনিক লর্ড ব্লেস গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর মত ব্যক্ত করে বলেন, “একটি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা পরিচালিত হবে যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষিত প্রতিনিধি থাকবে অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মত প্রতিফলিত হবে। মহাত্বা গান্ধী সত্য ও অহিংসাকে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসাবে চিহ্নত করেছেন। তিনি সর্বস্তরের মানুষের শারীরিক, আর্থিক ও আধ্যাত্বিক শক্তির সম্মিলিত চেষ্টায় সর্বস্তরের মানুষের শারীরিক, আর্থিক ও আধ্যাত্বিক শক্তির সম্মিলিত চেষ্টায় সর্বস্তরের মানুষের মেধার মধ্যে গণতন্ত্রের বিকাশের কথা বলেছেন। আমার লেখার নামকরণ হল ভয় ও অসহিষ্ণুতা গণতন্ত্র বড় বিপদ।

বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রাচীন গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমেরিকায়। সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ভিরুজভেল্ট ১৯৪১ সালে গণতন্ত্রের চারটি স্তরের কথা বলেছিলেন। (১) কথা বলা বা ব্যাখ্যা ও অভিব্যক্তির স্বাধীনতা। (২) নিজ নিজ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা (৩) মানুষের প্রয়োজন বা বাসনার স্বাধীনতা (৪) ভোয় থেকে মুক্তির স্বাধীনতা। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন গণতন্ত্রের অন্তিম উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে নিরাশা দূর করা, তাকে গোপন করা নয়। বৃহৎ পরিসরে গণতন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন দার্শনিক ও রাষ্ট্রনেতা যে মতামত দিয়েছেন তাকে মূলত তিনটি বিভাগে ভাগ করা যায়। (১) রাজনৈতিক গনতন্ত্র (২) সামাজিক গণতন্ত্র (৩) অর্থনৈতিক গণতন্ত্র। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের অর্থ হল নাগরিকদের সার্বিক স্বাধীনতা। দার্শনিক এ ডি লিন্ডসে বলেছেন, গণতন্ত্র কোনও অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, আপস-মীমাংসা নয় অথবা জনতাকে শান্ত রাখার জন্য কৃত্রিম ঐক্য নয়, গণতন্ত্র আদর্শ ধারাসরকার গঠনের পদ্ধুতি। জনগণের অধিকারই গণতন্ত্রের ভিত্তি।
ভারতবর্ষে বিজেপি পরিচালিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি হতে থাকে ধর্মকে সামনে রেখে। স্বাধীন মনোভাব ব্যক্ত করার জন্য নাগরিকদের ওপর আঘাত নেমে আসে। খাদ্য নিয়ে মানুষকে আঘাত করা হয়। মৃত্যু হয় ধর্মান্ধদের প্রহারে। মত ব্যক্ত করার, খাদ্যের ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যদি খর্ব হয় তাহলে গণতন্ত্র ধংস হয়। স্বাধীন ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৫২ সালে কিন্তু বৈদিক যুগেও ভারতের বিভিন্ন অংশে মানুষের মতামত নেবার পদ্ধুতি চালু ছিল। কৌটিল্যের সময় ও তাঁর বয়ানেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ আছে। প্রখ্যাত দার্শনিক হ্যারল্ড ল্যাস্কি বলেছেন, গণতন্ত্রের মাধুর্য হল অন্তরের সত্যতা প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই বক্তব্য যা ভারতীয় সভ্যতায় ও আধ্যাত্বিক চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছে যে কথা উল্লেখিত হয়েছে এই প্রবন্ধে। আজ ভারতবর্ষে মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় বিশ্বের সমস্ত স্থান থেকে তাদের প্রচলিত আইন, সংস্কৃতি-সহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মানবাধিকার সনদ প্রকাশ করে। এই সনদে ৩০টি ধারা বা নির্দেশ আছে এবং এই সনদ বিশ্বের সমস্ত মানুষের মৌলিক মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃত যা ৫০০টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। গণতন্ত্র কলঙ্কিত হয়।

ধর্মের নামে আজ ভারতবর্ষে যা চলছে তা ভারতীয় চেতনা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সভ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেইজন্য ভয়মুক্ত ও অস্থিরতা বর্জিত সমাজ গড়ে উঠুক এবং শুধু ধর্মীয় নয়, সব ধরনের মৌলবাদ ধ্বংস হোক।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers