ভয়ংকর বিভাজন রাজনীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলনের পথে এগোতে হবে

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

পূর্ণেন্দু বসু

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলন চলছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু যতবড় অন্যায়ই হোক না কেন, যত্রতত্র অঘোষিত অবরোধ করে, ট্রেনে-বাসে-রাস্তাঘাটে আগুন জ্বালিয়ে, চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে, ভাঙচুর-লুঠতরাজ চালিয়ে যে প্রতিবাদ তা শেষ বিচারে ধ্বংসাত্মক উপদ্রব ছাড়া অন্য কিছু নয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা গুন্ডামিতে পরিণত হয়। প্রতিবাদের নামে জনজীবন স্তব্ধ ও বিপর্যস্ত করে দেওয়ার আন্দোলন সমর্থনযোগ্য নয়। বরং তা অপরাধ বলে গণ্য হয়। আর এই অপরাধ নিবারণ ও তার শাস্তিবিধান আইনের শাসন অস্বীকার করতে পারে না।

আমরা নতুন আইনের বিরোধী। নৈতিকতার বিচারে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন প্রবল আপত্তিকর। এতে কোনও সন্দেহ নেই। প্রতিবাদকারীদের এটা মনে রাখা উচিত, নতুন আইনের যত বিরোধীই তাঁরা হোন না কেন, আইন নিজেদের হাতে তলে নেওয়া কখনওই সমর্থনযোগ্য নয়। তাঁরা যেন ভুলে না যান যে প্রশাসনের কাজ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা।

একথাও ঠিক যে রাজনীতির ঘোলা জলে যারা মাছ ধরতে নামে, তারা মূলত সমাজবিরোধী। ধর্মনিরপেক্ষতা বিনষ্টকারী ও বিভাজনের রাজনীতিকে ছড়িয়ে দিতে যারা আগুন নিয়ে খেলছে তাদের মধ্যে গেরুয়া শাসকদের এজেন্টরা সক্রিয় আছে। সাধারণ মানুষ এদের প্ররোচনায় পা দিলে প্রতিবাদ আন্দোলনেরই ক্ষতি। গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে বিপথগামী করার লোকের অভাব নেই। কেন্দ্রের শাসকরা চায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে বিভাজন ও দাঙ্গার বাতাবরণ তৈরি করে এক আতঙ্কময় পরিস্থিতিতে নিজেদের পক্ষে জনমত নিয়ে আসা। এনআরসি এবং সিএএ (সিটিজেন আ্যামেন্ডমেন্ট আইন) সেই উদ্দেশ্যেই রচিত। এতে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-জৈন-বৌদ্ধ- পার্সি কারওই ভাল হবে না।

অন্য রাজ্যের মতো বাংলাতেও অশান্তির আগুন জ্বলছে। এই পরিস্থিতিতে যথোচিতভাবেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের আইনের শাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আইন ভঙ্গকারীদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করার কথাও তিনি ঘোষণা করেছেন। যে কোনও প্ররোচনায় পা না দিতে বারবার সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক হিসাবে তিনি একথা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, এনআরসি এবং নতুন নাগরিকত্ব আইন-সংবিধান বিরোধী এবং জনবিরোধী। সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকেই বিজেপি এই আইন পাস করিয়েছে। তিনি এবং তাঁর পরিচালনাধীন টিএমসি দল দুটি আইনেরই পুরোপুরি বিরোধী। এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী) আইনের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস পথে নেমেছে। তিনি একথাও ঘোষণা করেছেন যে, এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ন্যায়সঙ্গত অধিকার সকলের আছে। তবে সেই প্রতিবাদ যেন ধ্বংসাত্মক না হয়।

বলাবাহুল্য যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠিত রাখার কথা বলেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি। প্রতিবাদে তিনি পথে নেমেছেন। একদিনের মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর প্রতিবাদ। তিনি পরপর তিনদিন প্রতিবাদী মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজধানী জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভকে গণপ্রতিবাদের গণতান্ত্রিক পথে কীভাবে এগোতে হবে, বহু সংগ্রামের নেত্রী পথে নেমেই তা বৃহত্তর মানুষকে দেখাচ্ছেন। এরই সঙ্গে সারা রাজ্যজুড়ে সংযত থেকে প্রতিবাদ আন্দোলনে শামিল করেছেন গোটা দলকে। তিনি সকলকেই বোঝাতে চেয়েছেন যে, নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা করার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশেষ করে বিরোধিতা করার কারণ আছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে। এটাও স্পষ্ট যে মুসলমান ধর্মপরিচিতির মানুষদের বিশেষভাবে প্রতিবাদ করার কারণ হল- নতুন আইন এবং এনআরসি-র অভিমুখ তাঁদের প্রতি ভয়ংকর প্রতিকূল অবস্থা তৈরি করবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, অযথা হিংসা, বিশৃঙ্খলার পথ গ্রহণ করতে হবে। গণআন্দোলনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একথাই বলে যে, হিংসা ও বিশৃঙ্খলা শেষ বিচারে আত্মঘাতী হতে বাধ্য। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানও সে কথাই বলে। এই হিংসা শুধু অন্যায় নয়, অপ্রয়োজনীয়ও বটে।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পথে থেকেও জনবিরোধী শাসকদের উপর যথেষ্ট নৈতিক চাপ তৈরি করা যায়। ভারতের তথা বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে সে কথা আমরা ভুলি কী করে। সে-কথা বিস্মৃত হলে তা হবে দেশের এবং রাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অপমান স্বরূপ। এক্ষেত্রে গণআন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের বিশেষ দায়িত্ব বর্তায়। দায়িত্ব বর্তায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদেরও।

আনন্দের কথা, মুসলমান সমাজ থেকে, একাধিক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শান্তিরক্ষার আবেদন করা হয়েছে। সেটা হয়েছে গোটা দেশেই। এই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে ন্যায়ের পথে, গণতন্ত্রের পথে অবিচলিত থাকার বার্তা সমস্ত স্তরে বুঝিয়ে বলা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে সেই সব শক্তিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, যারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে। একবার চিহ্নিত করতে পারলে সেই সব ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগসন্ধানীদের নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।

মমতাকে ধন্যবাদ। অশান্তির কারবারিদের কঠোর ও নিরপেক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং শান্তির পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করার গুরুদায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। অতীত সাক্ষ্য দেয়, গোটা দেশে যখন সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বলে উঠেছিল, তখনও বাংলায় শান্তি বজায় ছিল। একবার নয়। বারবার। আমরা এটাও জানি যে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নিজস্ব শক্তি এই রাজ্যের সমাজ-অভ্যন্তরে আছে।
সেই সদর্থক শুভশক্তিকে শান্তিরক্ষার কাজে সার্থকভাবে ব্যবহার করতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই সদিচ্ছা, দক্ষতা ও তৎপরতার অভাব নেই। একজন দক্ষ প্রশাসক ও মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজনীতিক হিসাবে মমতার উপর সেই ভরসা করা যায়।

নতুন আইনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ধরন হিসাবে একাধিক দিন বড় বড় মিছিলে হাঁটবার যে সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন, তা সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে একটি মূল্যবান পদক্ষেপ। একে যাঁরা খোটা করে দেখবেন, তাঁরা এর মূল্য সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল নন। এই সংকটের সময় রাজ্যের প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকেরও দায়িত্ব বেড়ে যায়। কাজে, ভাবনায় ও কথায় শুভবুদ্ধির পরিচয় দেওয়া, সংযত থাকা এখন অতীব প্রয়োজন। দ্রুত মিথ্যা খবর ছড়ানো এবং উত্তেজনার মুহূর্তে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। এর সঙ্গে জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। তাই সকলের হুঁশিয়ার থেকে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। পশ্চিমবঙ্গ এক বড় রাজনীতির পরীক্ষার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। এই আইনের বিরুদ্ধে যে যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি আছে, তাদের দায়িত্বও কম নয়। বেহিসেবি মন্তব্য করার সময় এটা নয়। নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য নৈতিকতাহীন কার্যকলাপ আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। দায়িত্ব একা মমতার নয়। তাঁদেরও দায়িত্ব আছে।

ভারতবর্ষে মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে দেওয়ার যে তাত্ত্বিক ভিত্তি সাভারকর শিষ্য আরএসএস-এর আদিগুরু গোলওয়ালকর প্রবর্তন টিকিয়ে রাখতে আরএসএস-বিজেপি তাদের মতো করে সেই তত্ত্বকে আরও বদলে নিয়ে ভারতকে মুসলমান শুন্য করতে চায়। অসমে হিন্দু সম্প্রদায়ের হয়েছে। ১২ লক্ষ হিন্দু রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছেন। এটা কেবল অসম নয়, গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ আদৌ ভালভাবে নেয়নি। অসমকে কেন্দ্র করে এনআরসিকে ঘিরে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে একটা তীব্র বিজেপি-বিরোধী ক্ষোভ তৈরি হতে শুরু করেছে। মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি এই ক্ষোভের আঁচ হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিতরেও বেশ ভালরকমভাবে পড়তে শুরু করেছে। এই বিষয়টি বুঝতে পেরে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এনে একাধারে হিন্দ সম্প্রদায়ের মানুষদের মনে একটা মিথ্যা আশা জাগিয়ে, তাদের কার্যত প্রতারিত করা হচ্ছে। অন্যদিক মুসলমান প্রধান দেশগুলি হিন্দুদের উপর অত্যাচার করে এই ধারণাকে হিন্দু মনে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে। দরদ দেখানো হচ্ছে শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান ও পারসিকদের প্রতি। এই সকল সত্যটি আমরা যেন বুঝতে ভুল না করি।

বাংলা ওদের লক্ষ্য। তাই বাংলায় সাম্প্রদায়িক আরএসএস-বিজেপির যৌথ প্রয়াসে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে- এই ভাবনা থেকেই এনআরসি-র ধাক্কা খেয়ে নতুন আইন আনা হয়েছে। ওদের ভয়ংকর পরিকল্পনা হল বাংলায় সাম্প্রদায়িক হানাহানির পরিবেশ তৈরি করে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ভয় পাইয়ে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে জেতা। এই ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত নির্বিশেষে আরএসএস-বিরোধী সমস্ত মানুষকে গণপ্রতিবাদী আন্দোলনে শামিল করা আজ সবথেকে বড় কাজ।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial