ভোট বাড়ল করিমপুরে, প্রথম জয় কালিয়াগঞ্জ, খড়্গপুরে

মেঘাংশী দাস

মানুষের ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল বিজেপি। উপনির্বাচনে ৩-০ ফলে মানুষের রায়ে ধূলিসাৎ হয়ে গেল গেরুয়া শিবিরের অহংকার ও ঔদ্ধত্য। দিনের পর দিন এনআরসি থেকে শুরু করে নানা এজেন্সি দিয়ে সাধারণ মানুষকে যেভাবে বিজেপি ভয় দেখাচ্ছিল, সন্ত্রাস চালাচ্ছিল তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যোগ্য জবাব দিয়েছেন। হাতে থাকা করিমপুরই শুধু নয়, দীর্ঘদিন বিরোধীদের দখলে থাকা খড়্গপুর এবং কালিয়াগঞ্জেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে দূর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তৃণমূল। তিন কেন্দ্রেই কার্যত সাফ হয়ে গিয়েছে পদ্মফুল। মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়ায় উপনির্বাচনে তিনটি আসনেই কার্যত জয়ী হলেন মা-মাটি-মানুষের নেত্রী মমত বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলায় বিরোধীদের এলাকাতেও এবারের “সবুজ ঝড়’ ফের প্রমাণ করে দিল বিপদের দিনে মানুষের একমাত্র বন্ধ মমতার তৃণমূলের প্রতিই আস্থা রাখছে বাংলা। উপনির্বাচনে “তিনে তিন” দলের এই বিপুল সাফল্য ‘মা-মাটি-মানুষকে’ উৎসর্গ করেছেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিন কেন্দ্রের ভোটারদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়ে জননেত্রী ঘোষণা করেছেন, আগামী দিনে এই তিন বিধানসভা ক্ষেত্রেই নিজে উপস্থিত হয়ে মানুষকে ধন্যবাদ জানাবেন।

লোকসভা ভোটে মিথ্যা প্রতিশ্রতি এবং বিভ্রান্তিকর প্রলোভন দেখিয়ে খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জ দুই বিধানসভা কেন্দ্রেই যথাক্রমে ৪৫ হাজার ও ৫৭ হাজার ভোটে এগিয়ে গিয়েছিল পদ্ম শিবির । ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে খড়গপুর থেকে বিধায়ক হন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। রায়গঞ্জ লোকসভার অধীনে ঝাড়খণ্ড সীমান্তের কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী প্রায় ৫৭ হাজার ভোটেরও বেশি ব্যবধানে এগিয়ে যান। কিন্তু এবার এই দুটি কেন্দ্রেই শুধুমাত্র তৃণমূল জিতল না, খড়গপুরে রেকর্ড মার্জিন করলেন তৃণমূল প্রার্থী পুরপ্রধান প্রদীপ সরকার। নদিয়ার করিমপুরে ২৪,১১৯ ভোটে জিতেছেন তৃণমূলের বিমলেন্দু সিংহ রায়। কালিয়াগঞ্জে তৃণমূল প্রার্থী তপনদেব সিংহ রায় জিতে গিয়েছেন ২ হাজার ৩০৪ ভোটে। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে করিমপুর কেন্দ্রে মহুয়া মৈত্র জিতেছিলেন প্রায় ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে। সেখানে উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের ডালি সামনে রেখে তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের মার্জিন বেড়ে হল ২৪ হাজারের বেশি। শুধুমাত্র অঙ্কের হিসাব নয়, তিন কেন্দ্রের সামগ্রিক ফলাফল এবং মানুষের রায় বিশ্লেষণ শেষে দেখা গেল, বাংলায় চরমভাবে ধরাশারী গেরুয়া শিবির। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সমস্ত কুৎসা ও অপপ্রচার দিয়ে তৈরি করা ষড়যন্ত্রের জাল। কারণ, মানুষ ধর্ম দিয়ে তৈরি করা বিজেপির বিভ্রান্তিকে আর গুরুত্ব দিছে না। উপনির্বচিনের রায় প্রমাণ করে দিল, বাংলায় সর্বধর্ম সমন্বয়, সব মানুষের সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীতি-আদর্শকেই মান্যতা দিচ্ছে আমজনতা।

এমনকী অবাঙালি ভোটার প্রধান খড়গপুরে দিল্লি থেকে আসা আরএসএসের নেতারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন। কিন্তু তাকেও বিন্দুমাত্র পাত্তা দেননি এলাকার ভোটাররা । বিজেপির সমস্ত অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো সেনাপতি মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জে দলের জয় ছিনিয়ে আনতে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন পরিবহণমন্ত্রী। করিমপুরেও দলের পর্যবেক্ষক মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় নেত্রীর বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস তৈরির পর খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জে কখনওই জিততে পারেনি জোড়াফুল। শুধু তাই নয়, অহংকারী বিজেপি নেতারা গত কয়েকমাস ধরে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে প্রচার করছিলেন, এই দুই কেন্দ্র গেরুয়া গড়। কিন্তু উপনির্বাচনে প্রমাণ হয়ে গেল, দেশের মানুষকে ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্তকরে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসা বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলার মানুষ। শুধুমাত্র জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মা-মাটি-মানুষ সরকারের উন্নয়ন এবং পরিষেবামূলক সাফল্যকে তুলে ধরে প্রচার করায় বিরোধীদের দখলে থাকা খড়গপুর এবং কালিয়াগঞ্জও দখল করল তৃণমূল। নদিয়ার করিমপুর আসন দখল করার জন্য বিজেপির শীর্যনেতৃত্ব মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়েছিলেন। সর্বভারতীয় নেতারা কার্যত ঘাঁটি গেড়েছিলেন।

লোকসভা ভোটের পর নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিম মেদিনীপুরে দলের দায়িত্ব দেন পরিবহণ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জকে আরও নজর দিতে বলেন পর্যবেক্ষক শুভেন্দুকে। উপনির্বাচন ঘোষণা হতেই দুই কেন্দ্রেই বাড়তি নজর দেওয়া শুধু নয়,মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন পরিবহণ মন্ত্রী। বিশেষ করে খড়গপুরে দলের প্রার্থীকে জেতাতে চ্যালেঞ্জ নিয়ে দিনে-রাতে নির্বাচনী কাজে মন দিয়েছিলেন নন্দীগ্রামের সেনাপতি। এবার ভোটে তার ফল মিলল। অন্যদিকে নদীয়াতেও লোকসভা ভোটের পর মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে পর্যবেক্ষক করে পাঠানো অনেক কাজে দিয়েছে তৃণমূলকে। নির্বাচনী ঘোষণার পর নেত্রীর বার্তা নিয়ে বাড়ি বাড়ি প্রচার করে বিজেপির সহসভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারকে তৃতীয় স্থানে পাঠিয়েছেন রাজীব। অন্যদিকে বিজেপিকে কটাক্ষ করে তৃণমূল মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন,“বাহুবল এবং ধর্মের ভিত্তিতে যে এখানে ভোট হয় না তা প্রমাণিত হল। এনআরসির ভয় দেখিয়ে বিজেপি রাজনৈতিক চাল দিয়েছিল। বাংলার মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর আস্থা রেখেছেন। ধর্মের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন মানুষ” রাজনৈতিক মহলের মতে, গোটা দেশে যেভাবে বিজেপির ফল খারাপ হচ্ছে তার প্রভাব এই বাংলাতেও। কালিয়াগঞ্জ ও করিমপুরে তৃণমূলের জয় প্রমান করেছে এনআরসির খেসারত দিতে হল বিজেপিকে। লোকসভা ভোটে উদ্বাস্তুরা বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিযেছিল। ৬ মাস কাটতে না কাটতেই সেই ভোট ফিরতে শুরু করল তৃণমূলের ঘরে। এই ভোটেও জোট করেছিল বাম ও কগ্রেস। কিন্তু তারা কোনও দাগ কাটতেই পারেনি। কালিয়াগঞ্জে লোকসভা ভোটে রাজবংশী ভোটারদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে নিজেদের দিকে টেনেছিল গেরুয়া শিবির। বাস্তবটা গত ৬ মাসে বুঝতে পেরে রাজবংশী ভোটাররা সবাই দল বেঁধে এবার তৃণমূলকে দু’হাত তুলে সমর্থন করেছেন।

লোকসভা ভোটের পর নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ শেষে দলীয় সংগঠকে চাঙ্গা করতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। তারমধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ হল জনসংযোগ কর্মসূচি বড়ানো। মানুষের কাছে গিয়ে কোনও ক্ষোভ আছে কি না তা বোঝার চেষ্টা। কোনও চাওয়া-পাওয়ার তফাত আছে কি না তা সরেজমিন খতিয়ে দেখা। কোনও ভুল ত্রুটি থাকলে তার মৃল্যায়ন। ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির মাধ্যমে সেটা যে কার্যকর হয়েছে উপনির্বাচনের রায়ে তা প্রমাণ হয়ে গেল। নির্বাচনী ফলাফল বুঝিয়ে দিল, নেত্রীর বার্তা মেনে মাথা নিচু করে মানুষের জন্য তৃণমূল কর্মীদের কাজ করে যাওয়ার ব্রত আরও নিবিড়ভাবে করতে হবে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial