ভোটব্যাঙ্কের লক্ষ্যেই দেশে আগুন জ্বালিয়েছে বিজেপি

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

তীর্থ রায়

গোটা দেশে বিজেপি আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের নামে বিজেপি চাইছে, গোটা দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে। সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন থেকে তারা তাদের ভোট ব্যাঙ্কে সংগঠিত করতে চাইছে। স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে ৭২ বছরের ইতিহাসে এমন ঘৃণ্য চক্রান্ত কখনও দেখা যায়নি। একটি রাজনৈতিক দল ভোটে জেতার স্বার্থে এতটা নিচে নামতে পারে, তা ভাবাও যায় না। রাজনীতি মানে মানুষের ভালর জন্য কাজ করা। রাজনীতি মানে সমাজের উপকারে হাত লাগানো। কিন্তু বিজেপি রাজনীতির সংজ্ঞা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বিজেপি নেতাদের কাছে রাজনীতি মানে, ক্ষমতা দখল করে দেশের সম্পদ লুঠ করা ছাড়া আর কিছু নয়। দেশের ক্ষমতা তারা করায়ত্ত করেছে। এখন তারা চায়, দেশে সমস্ত অঙ্গরাজ্য তাদের তাঁবেতে থাকুক। যে কোনও উপায়ে তারা সমস্ত অঙ্গরাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে চক্রান্ত শুরু করেছে। তার জন্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগিয়ে দেশ ও মানুষের বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের পরোয়া নেই।

দেশে আচ্ছে দিন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিনি চরম ব্যর্থ। দেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। বেকারত্ব পৌঁছেছে চরম সীমায়। সরকারি তথ্যেই বলা হচ্ছে, গত ৪৫ বছরে দেশে এত বেকারত্ব দেখা দেয়নি। গত পাঁচ বছরে দেশে কোনও কলকারখানা হয়নি। দেশে কোনও বড় লগ্নি হয়নি। শিল্পপতিরা লগ্নি করার বদলে গত পাঁচ বছরে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। বিজয় মালিয়া, মেহুল চোকসি, নীরব মোদি যার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই অসাধু ব্যবসায়ীদের তালিকা আরও দীর্ঘ। নরেন্দ্র মোদির আরও অনেক বন্ধু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যাঙ্কের টাকা চুরি করে বিদেশে তা পাচার করেছে। বিদেশের ব্যাঙ্কগুলিতে অসাধু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের টাকার পাহাড় তৈরি হয়েছে। ক্ষমতায় আসার আগে মোদি মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বলেছিলেন তিনি এই টাকা উদ্ধার করে আনবেন। সেই উদ্ধার করা টাকা থেকে তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে দিয়ে দেবেন। মোদি সরকার প্রায় ৬ বছর অতিক্রম করতে চলল। বিদেশের মাটি থেকে কানাকড়িও সরকার উদ্ধার করে আনতে পারেনি। উপরন্তু, মোদির আমলে ব্যাঙ্কের আরও টাকা নানা পথে বিদেশে পাচার হয়েছে। দেশের ব্যাঙ্কে যে টাকা সঞ্চিত থাকে, তা সাধারণ মানুষের টাকা।

সাধারণ মানুষ তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাঙ্কে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে। মানুষের অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়া ধোঁকাই থেকে গিয়েছে গত ৬ বছরে। বরং এই ৬ বছরে আমরা শুধু দেখেছি, নানা ফন্দিফিকির করে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে থাকা মানুষের সঞ্চয়ে সরকারকে হাত দিতে। সরকার ব্যবসা ও লগ্নির নামে সেই টাকা অসাধু ব্যবসায়ীদের পাইয়ে দেওয়ার রাস্তা করেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হাতিয়ে নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে ও প্রশ্রয়ে সেই টাকা বিদেশের ব্যাঙ্কে নিয়ে গিয়ে জমা করছে। আজকে দেশের প্রায় সব ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে। ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ ১০ লক্ষ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ যদি এই জায়গায় গিয়ে পৌঁছয়, তাহলে দেশে লগ্নি হবে কীভাবে এবং ব্যবসাই বা হবে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। দেশ যখন চরম আর্থিক সংকটে তখন সরকারের তরফে বলা হচ্ছে যে, অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়ার মূল কারণ, বাজারে চাহিদা নেই। এই চাহিদা ফিরলেই অর্থনীতি আবার চাঙ্গা হয়ে যাবে। বাজারে চাহিদা ফেরানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ৩২টি পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, কর্পোরেট করে বিরাট ছাড়। মোট ১ লক্ষ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই ৩২টি পদক্ষেপের পর বাজারে একচিলতে চাহিদাও বাড়েনি। মাঝখান থেকে দেশের ব্যবসায়ীরা ১ লক্ষ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করে ছাড় নিয়ে চলে গেল। গরিব-মধ্যবিত্ত আরও তলানিতে চলে যাচ্ছে। তাদের চাকরি-বাকরি নেই, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, আর্থিক সংকট আরও চরমে। এই অবস্থাতেও কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যবসায়ীদের নানারকম সুবিধা করে দেওয়া। তেলা মাথায় তেল দেওয়া। এই নীতিগুলি থেকেই স্পষ্ট করে বোঝা যায়, মোদি সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? মানুষের উপকার এই সরকারের কোনও উদ্দেশ্য নয়। আচ্ছে দিন আনাও এই সরকারের লক্ষ্য নয়। এই সরকার শুধু চায়, মানুষের সম্পদ লুঠ করে নিজেদের পেটোয়া ব্যবসায়ীদের তা পাইয়ে দিতে।

এইরকম একটা সরকার যে মানুষে মানুষে আরও বিভেদ তৈরির চেষ্টা চালাবে তা বলাই বাহুল্য। গত ৬ বছর ধরে সেই চেষ্টাই এই সরকার করে চলেছে। আচ্ছে দিন আনা বা অর্থনীতির সামান্যতম উন্নতি করার কাজ না করে মানুষের নজর ঘোরাতে এই সরকার শুধু সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কাজ করে চলেছে। এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীক্ষ্ণ ও তীব্র করতে এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল তথা ক্যাব আনা হয়েছে। ক্যাব সংখ্যার জোরে সংসদে পাস করানোও হয়েছে। কিন্তু বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সংখ্যার জোরে দেশের আইনসভায় পাস করানো আইন মানেন না। যে আইনের জন্য জনগণের কোনও সম্মতি বা স্বতঃস্ফূর্ততা নেই, সেই আইন তিনি কোনওভাবেই প্রয়োগ করতে দেবেন না বলেও বাংলার জননেত্রী জানিয়ে দিয়েছেন। বাংলার জননেত্রী এই অবস্থানের পিছনে যে কোটি কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে তা সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস করানোর পরই জনগণের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়েছে। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। তিনি বিলটি পাস করানোর পর থেকে রাস্তায় জনগণের সঙ্গে প্রতিবাদ আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। তাঁর ডাকে প্রতিদিন এই রাজ্যের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ পথে সমবেত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিলের বিরোধিতা করছেন। বিজেপি বাংলার জননেত্রীর প্রতিবাদ আন্দোলনে ভয় পেয়ে দুষ্কৃতীদের ইন্ধন দিয়ে রাজ্যে গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করছে।

বাংলার জননেত্রী আগেই জানিয়েছেন, বিজেপি একটি মৌলবাদী সংগঠনকে টাকা দিয়ে রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরির জন্য ইন্ধন দিচ্ছে। সংসদে ক্যাব পাস করানোর পর বিজেপির এই চক্রান্ত সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। এই বাংলাতেও দেখা গেল, বিজেপির টাকায় ও ইন্ধনে কিছু লোক রেল-সহ সরকারি সম্পত্তির উপর আক্রমণ চালাল। রাস্তাঘাট অবরোধ করে জনগণের সমস্যা তৈরির চেষ্টা করল। বিজেপির ইন্ধনে যে এই কাজ হয়েছে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। বিজেপির লক্ষ্য ছিল, এই সব দুষ্কৃতীদের অর্থ দিয়ে রাজ্যে একটা সাম্প্রদায়িক হিংসার বাতাবরণ তৈরি করা। জননেত্রী মানুষকে নিয়ে ক্যাবের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আন্দোলনে রাস্তায় নামতেই এই দুষ্কৃতীরা পালিয়ে গিয়েছে। বিজেপির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে। কিন্ত বিজেপি সারা দেশে এখন দাঙ্গা লাগানোর চক্রান্ত চালাচ্ছে। দিল্লিতে কী ঘটনা ঘটছে, জনগণ তা দেখতে পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের উপর যেভাবে অমিত শাহর পুলিশ দিল্লিতে অত্যাচার চালিয়েছে, তা স্বাধীন ভারতে খুব কমই ঘটেছে। ছাত্রদের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। সেই আন্দোলনের উপর পুলিশ লাঠি -গুলি-গ্যাস নিয়ে দিল্লিতে আক্রমণ করেছে। এমনকী, ছাত্রদের পাঠাগারে ঢুকে অমিত শাহর পুলিশ নিগ্রহ করেছে। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশ যেভাবে নিরীহ ছাত্রদের উপর আক্রমণ করেছে তার জন্য গোটা দেশ শুধু নয়, পৃথিবী জুড়ে ছিঃ ছিঃ শুরু হয়েছে। অক্সফোর্ড থেকে হার্ভার্ড, পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। স্বাধীনতার পর এই এমন একটা সরকার দেশে এসেছে, যার জন্য গোটা পৃথিবীর সামনে ভারতের মুখ পুড়ছে। আধুনিক উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ভারত যেভাবে এগিয়ে চলেছিল এই সরকার সেই ভারতকে ফের মধ্যযুগে টেনে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এই সরকারকে বিদায় না দেওয়া পর্যন্ত দেশে শান্তি ও সুস্থিতি ফিরবে না। গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে খারিজ করলেই হবে না, কেন্দ্রের মোদি সরকারকে বিদায় জানাতে হবে। গোটা দেশ জুড়ে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন এই পর্যায়ে তুলে নিয়ে যেতে হবে যাতে মোদি সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। বাংলার জননেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলনের সুর বেঁধে দিয়েছেন। এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে দিতে হবে গোটা দেশে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial