ভেদাভেদ, বিচ্ছেদের প্রচেষ্টা রুখতে হবে কন্যাশ্রীদেরই

মেঘাংশী দাস

একজন সন্তান যখন জন্ম নেয়, তখন তার প্রথম শিক্ষক হলেন বাবা-মা। তাঁরাই হলেন জীবনের প্রথম পথপ্রদর্শক। আর যিনি স্কুল-কলেজে শিক্ষা দেন, সেই শিক্ষকরা জানিয়ে দেন, সমাজ-সভ্যতায় কীভাবে নিজেকে তুলে ধরতে হাবে। তাই একজন কন্যার জীবনে দু’জন পথপ্রদর্শক থাকে। মা-বাবার পাশাপাশি শিক্ষকরাই সমাজ-সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁদের শ্রদ্ধা করা, সম্মান করা এবং গুরুত্ব দেওয়া প্রতিটি কন্যাশ্রীর অনেক বেশি লক্ষ্য হওয়া উচিত। কন্যাশ্রী প্রকল্পের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কলকাতার নজরুল মঞ্চে এভাবেই উপস্থিত ছাত্রীদের শিক্ষার বার্তা দিয়েছেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্রীদের আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “এ সমাজ তোমাদের সংস্কার করতে হবে। এ সমাজে শান্তি তোমাদের রক্ষা করতে হবে। এ সমাজে ভেদাভেদ, বিচ্ছেদের প্রচেষ্টা তোমাদের রোধ করতে হবে। তোমরা লড়বে, গড়বে, জিতবে । তোমরাই একদিন বিশ্ব জয় করবে। তোমরাই আগামী দিনে বাংলার গর্ব।” আগামীদিনে প্রতিটি জেলায় একটি করে কন্যাশ্রী কলেজ হবে বলেও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

রক্তদানের প্রসঙ্গ টেনে ভারতে বিজেপি যে ধর্মীয় রাজনীতির বিষাক্ত আবহ তৈরি করছে, তার তীব্র নিন্দা করেন জননেত্রী। বলেন, “রক্তদান শিবির হলে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান সবাই রক্ত দেয়। এরপর ওই পাড়ায় যখন কেউ অসুস্থ হয়, তার জন্য ব্লাডব্যাঙ্ক থেকে এক বোতল রক্ত নিয়ে আসা হয়। তখন কেউ কি জিজ্ঞেস করে, এই বোতলের রক্তটা হিন্দু না মুসলমানের? আসলে এটাই ভারতীয় সংস্কৃতি, বাংলার সমাজজীবনের পরম্পরা ও ঐতিহ্য। একে আমাদের সবাইকে ধরে রাখতে হবে।” মুখ্যমন্ত্রী সমস্ত কন্যাশ্রী ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন গড়ার জন্য নতুন করে শপথগ্রহণের ডাক দেন। বলেন, “আজ থেকে তোমরা সবাই সিদ্ধান্ত নাও কাউকে ঘৃণা করবে না, সবাইকে ভালবাসবে, সবার পাশে দাঁড়াবে।” নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকি থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দের আত্মত্যাগের কথা কন্যাশ্রীর যষ্ঠ জন্মদিবসে উপস্থিত ছাত্রীদের স্মরণ করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী।

বাংলার কিশোরীর দলকে স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুক্তির ডানা পেল তারা। আর কোনও সীমানার গণ্ডি নয়। রইল না কোনও রোজগারের বেড়ি। মা-মাটি-মানুষের নেত্রীর ঘোষণা মেনে একবছর আগে থেকেই সব ছাত্রীই কন্যাশ্রী।

কন্যাশ্রীর ভাতা পাওয়ার জন্য বার্ষিক রোজগারের ঊর্ধ্বসীমা গতবছর তুলে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এখন বার্ষিক যে কোনও রোজকারের পরিবারই কন্যাশ্রী প্রকল্পের আওতাভুক্ত। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা মেনে ইতিমধ্যে কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে। জননেত্রীর ঘোষণা মেনে কন্যাশ্রী মেয়েরা যে যা হতে চায়, সেই লক্ষ্যপূরণে সবরকম কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা করছে স্কুল শিক্ষা দফতর। যষ্ঠবার্ষিকীর হিসাব বলছে, এখন বাংলায় প্রায় ৬০ লক্ষ কন্যাশ্রী রাজ্য সরকারের সুবিধা পাচ্ছে।

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে কন্যাশ্রী দিবসের ষষ্ঠ জন্মবার্ষিকীতে কলকাতার নজরুল মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলার কন্যাদের আগামী দিনের দিশা দেখিয়েছেন জননেত্রী। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ঘন ঘন আনন্দের কলরোল উঠেছিল সভায়। তাঁর এই সভায় আসার কথা ছিল না, কিন্তু কন্যাশ্রীদের টানে চলে আসেন। সভায় এসে স্বয়ং জননেত্রীর বললেন, “অন্য কর্মসূচির ধাক্কায় আসার জন্য নির্দিষ্ট সূচি ছিল না। কিন্তু তোমাদের টানে কয়েক মিনিটের জন্য চলে এলাম।” বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কন্যারা নিজেদের আইডলকে কাছে পেয়ে উল্লসিত ছিল। তার পরই মুখ্যমন্ত্রীর সেই ঘোষণা। যার জেরে হাততালিতে ফেটে পড়ল সভাক্ষেত্র। তারস্বরে গলা মিলিয়ে নানা বয়সের কন্যারা জানিয়ে দিল, মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন সফল তারা করবেই।

মুখ্যমন্ত্রীর আশা, “কন্যাশ্রী দিনটা একদিন পৃথিবীজুড়ে পালিত হবে। কন্যাশ্রী আমার গর্ব, বাংলার গর্ব, বিশ্বের গর্ব। কন্যাশ্রীরাই বিশ্বজয় করবে। তারাই বিশ্বসেরা হবে। এটাই আমার স্বপ্ন।”

একজন অভিভাবক যেমন করে ভাবে, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা যেভাবে চিন্তা করে, সেভাবেই মুখ্যমন্ত্রী ভেবেছেন। তাঁর কণ্ঠেই ধরা পড়ে ছোট ছোট কন্যাশ্রীদের জন্য সেই আবেগ। তাঁর কথায়, “কন্যাশ্রীর মেয়েরা যেন পড়াশোনা করে আর যেন গর্ব করে বলতে পারে যে, তারা সব সুবিধা পাচ্ছে। কোনওদিন চিন্তা করতে হবে না যে, কোথায় যাব। পড়াশোনা করে প্রশিক্ষিত হলে তাদের যেন চাকরি একেবারে নিশ্চিত হয়ে যায়।” শিক্ষা দফতরকে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ দিয়েছেন, “মেয়েদের দক্ষ করে নিজেদের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। তাদের এমন করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যে, তারা যে কোনও বিষয়ে শিক্ষিত হয়ে যেন নিজের পায়ে দাঁড়ায়। কারও দরজায় দাঁড়াতে না হয়।” বাংলার কন্যাশ্রীদের নিয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তার নিদর্শন মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি কথায় ধরা পড়ছিল। তিনি জানিয়ে দিলেন, “এটাই ওদের স্বপ্নের ভোর হবে। আমার ছোট ছোট বোনেদের ভবিষ্যৎটা সুরক্ষিত করতে হবে। এরাই গড়বে রাজ্য। গড়বে দেশ। গড়বে বিশ্ব।”

কন্যাশ্রীর মধ্য দিয়ে বাংলার মেয়েদের স্বপ্ন সফল করা – এটুকুই মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন। উৎসাহ দিয়ে তাই তিনি বলেছেন, তোমরা ভাল করে পড়াশোনা করো। খেলাধুলো করো। সংস্কৃতি চর্চা করো। নাটক করো। গান করো। ক্যারাটে শেখো। অন্যায়ের প্রতিবাদ করো। বিজেপি যে দেশভাগের চক্রান্ত করছে, ভেদাভেদের রাজনীতি করছে, নিজের কথা সেটুকু ইঙ্গিতে বুঝিয়ে তা নিয়েও ছাত্রীদের সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী! কন্যাশ্রী মেয়েদের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “ভাঙো অন্যায় অত্যাচার। ভেদাভেদ দূর করে দাও। সংকীর্ণতা দূর করে দাও ।” তাঁর সাফ কথা, “বাংলা কখনও হার মানে না। বাংলা এগিয়ে যেতে শিখেছে। বাংলা মাথা নত করে চলে না। আমরা যারা সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তারা ভয় পাই না। ভয়কে বরাভয় করে এগিয়ে যেতে হবে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial