ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ধ্বংস হোক

 শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন আসন্ন৷ এই নির্বাচনে নির্ধারিত গণতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি জয়ী হবে না মৌলবাদী সুবিধাবাদী শক্তি জয়লাভ করবে সেটা ঠিক করবে বাংলাদেশের জনগণ৷ সমগ্র বিশ্বের মানুষ মৌলবাদমুক্ত গণতন্ত্র চায়৷ স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়৷ সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার চায়৷ ভারতবর্ষের মানুষ যেহেতু গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং বৈদিকযুগ থেকে শুরু করে কৌটিল্যের যুগে আধুনিক ভারতবর্ষ গড়ে ওঠার আগে পর্যন্ত জনপদের মানুষের মতামত নেবার পদ্ধতি চালু ছিল৷ পরবর্তিকালে দেশের মানুষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করে৷ মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষেও দেশের মানুষের অধিকারের লড়াই গণতাস্তিক পথে স্বাধীনতার লড়াইতে পর্যবসিত হয়েছিল৷

আজকের বাংলাদেশ যা পূর্বে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের লড়াইয়ের শুরু হয়েছিল ভাষার অধিকার রক্ষা থেকে৷ ভাষা আন্দোলন,পরবর্তিকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছিল শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে৷ ভারতবর্ষের মানুষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ, বঞ্চনা ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল৷ বাংলাদেশের মানুষও পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্চনা ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে লড়াই করেই এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে৷

গণতন্ত্রপ্রিয় ভারতবাসী যখন লক্ষ করল ইউপিএ সরকার দেশ পরিচালনা করতে ব্যর্থ এবং নেতৃত্ব দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে তখন তারা ইউপিএকে পরাজিত করে পরীক্ষামূলকভাবে এনডিএকে জয়ী করে৷ দেশের মানুষ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান-সহ বেঁচে থাকার অধিকার চায়৷ বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার যে প্রতিশ্রুতি মানুষকে দিয়েছিল তার কোনও প্রতিশ্রুতিই তারা পালন করতে পারেনি৷ উপরন্ত দেশের টাকা প্রায় লুঠ করে নিয়ে ২৯ জন অসাধু ব্যবসায়ী দেশের বাইরে চলে গিয়েছে যাদের মধ্যে নীরব মোদি, মেহুল চোক্সি, বিজয় মালিয়া রয়েছে৷ এদের দেশের বাইরে চঙ্গে যাওয়ার “Safe Passage” বা সহজে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিজেপি সরকার৷ বাংলাদেশ ঠিক তার বিপরীত৷ তারা দ্রুত দেশের উন্নতি করেছে এবং উন্নয়নের নিরিখে তারা ভারতবর্ষের চেয়ে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে৷ বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গের তুলনা করা যায় যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মমতা৷ গড় ব্যক্তিগত আয় ও কৃষকের বাংসরিক আয় বৃদ্ধি, গরিব লোকদের বাড়ি, বিনামূল্যে চিকিৎসা, খাদ্য-নিরাপত্তা বলয়ে সওয়া আট কোটি মানুষকে নিয়ে আসা, শিক্ষার অবাধ সুযোগের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানেজমেন্ট কলেজ, ডাক্তারিতে আসন বৃদ্ধি, পলিটেকনিক, আইটিআই স্থাপন-সহ পরিকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি করেছে পশ্চিমবঙ্গ। একটি রাজ্য নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দ্রুত অগ্রগতির পথে আর একটি দেশ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দ্রুত উন্নয়ন করে চলেছে।

বর্তমানে ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের মানুষের শাসনে সবচেয়ে বড় বিপদ ধর্মীয় মৌলবাদ৷ ভারতবর্ষে মুক্তমনা মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে৷ খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় কিন্তু তারাও আক্রান্ত৷ মুক্তমনা লেখক-শিল্পীদের উপর নানা ধরনের অবিচার চলছে৷ বাংলাদেশে দিনের পরদিন ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা নিহত হচ্ছে গণতান্ত্রিক স্বাধীন মনের মানুষ যাদের লেখনী মৌলবাদের বিরুদ্ধে সরব।

ধর্মকে ক্ষমতার অলিন্দে বসার হাতিয়ার হিসাবে যদি বা কোনও দল ব্যবহার করে তা সমাজের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ বাংলাদেশে বিরোধীশক্তি মৌলবাদী আর ভারতবর্ষের শাসকদল মৌলবাদীদের ভূমিকা পালন করছে৷ প্রতি মানুষের অন্তরে ধর্মের আবেগ ও অনুভূতি কাজ করছে কিন্তু তার স্থান হৃদয়ে ও ধর্মস্থানে৷ রাজনীতির কারবারিরা যখন ধর্মকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে তখন ধর্মকেই কলঙ্কিত করা হয়৷ ধর্ম মানুষকে তার চিন্তা, ভাবনা, চেতনা ও জীবনযাপন-সহ জীবনের সব ক্ষেত্রে এক উন্নত মানুষ হতে সহায়তা করে৷ কোনও সংকীর্ণতাই ধর্মের শিক্ষা হতে পারে না, ধর্মবিশ্বাস ও আচরণ এক উন্নত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ৷ উন্নত ও উদার মানসিকতাই ধর্মের শিক্ষা৷ ধর্মের শিক্ষা যদি গ্রহণ করি তাহলে আমাদের ধর্মে বলা হয়েছে, “যুক্তিহীন বিচারেতু/ধর্মহানি প্রজায়েত।’’ অর্থাৎ বিচার যদি যুক্তিহীন হয় তাহলে ব্যক্তি বা সমষ্টির ধর্মহানি হয়৷

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি হিন্দু ও একটি মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন৷ পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠোর হস্তে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করছেন কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের মূল দল বিজেপি এক ভয়ংকর এবং আত্মহননকারী ও বাংলার যুগ-যুগান্তের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিরোধী ভূমিকা পালন করছে৷ বাংলাদেশের আওয়ামি লিগ সরকারের নেত্রী শেখ হাসিনা মৌলবাদী আঘাত মোকাবিলা করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন৷ ভারতবর্ষ চিরায়ত বহুত্ববাদের দেশ৷ এখানকার আদি বাসিন্দারা অনার্য। এই দেশে যুগে যুগে আর্য, তুর্কি, সুলতান, মোঘল, ফরাসি, পর্তুগিজ ও ইংরেজরা এসেছে কখনও ব্যবসার কারণে আবার কখনও রাজ্য জয়ের জন্য৷ এদের মধ্যে অনেকেই ফিরে গিয়েছে আবার অনেকে ভারতবর্ষের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছে৷ একইভাবে আজকের বাংলাদেশ ছিল মুসলমান, হিন্দু-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাসভূমি৷

ভারতের হিন্দু মৌলবাদী অথবা বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদীরা যদি দাবি করে শত শত বছর ধরে যারা বসবাস করছে তারা বিদেশি তাহলে মানবতার অসম্মান হবে৷ মানুষের জন্মগত অধিকার লঙ্ঘিত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই কিছু মানুষ আছে যারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ধর্মের সঙ্গে ধর্মের, জাতের সঙ্গে জাতের বিবাদ লাগিয়ে মুনাফা লোটার চেষ্টা করে৷ ভারতের জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে বেদ, উপনিষদ, অষ্টাদশ পুরাণ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, বাইবেল, কোরান, ত্রিপিটক, গ্রন্থসাহেব প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে। আবার যুগে যুগে ভারতবর্ষ (অবিভক্ত) সমৃদ্ধ হয়েছে চিন্তায়, মননে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও সংস্কৃতিতে৷ ভারতে সব ধর্মের মানুষের তৈরি স্থাপত্য সমগ্র বিশ্বের মানুষকে আকর্ষণ করেছে৷ ধর্ম মানুষকে ধার্মিক হতে শিক্ষা দেয়৷ ধার্মিক হতে গেলে মানুষের চরিত্রে দয়া, মায়া, মমতা, ভালবাসা, মনুষ্যত্ব, অহিংসা, সততা, ত্যাগ ও পরমত সহিষ্ণুতা প্রভৃতি গুণগুলি থাকা আবশ্যক৷ ধর্ম রক্ষা করার জন্য অন্য ধর্মাবলম্বীদের আঘাত করা কোনও ধার্মিকের কাজ হতে পারে না৷ অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন যে করে না সে নিজ ধর্মকেই অসম্মান করে জাত বা অজ্ঞাতসারে৷ হিন্দু, মুসলিম অথবা অন্য কোনও ধর্মের মানুষ যারা ঈর্ষা, ও শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে তারা ধর্মের নামে অধর্ম করছে৷ পরম পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, “যত মত তত পথ।’’ তিনি নিজে রোজা রেখেছিলেন, মসজিদে গিয়ে কোরান পাঠ করেছিলেন, কিন্তু তার পরে বলেছিলেন “আমি তো ধর্মচ্যুত হইনি”। তিনি বলেছিলেন, “খালি পেটে ধর্ম হয় না।’’

বিশ্বের সব মানুষই এই সত্য বিশ্বাস করে যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল এবং কর্মসংস্থানই মানুষের প্রথম চাহিদা। কবি সুকান্ত বলেছিলেন, “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।’’অবশ্যই ক্ষুধার রাজ্যে মানুষের জীবন যন্ত্রণার মধ্যে ধর্মের প্রতি মনোনিবেশ করা সম্ভব নয়৷ যাঁরা কর্মের পথ থেকে সরে গিয়ে ধর্মের পথে পা বাড়াবার চেষ্টা করেন তারা কর্ম ও ধর্ম কোনওটাই করেন না৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “ভারতীয়রা (অবশ্যই বাংলাদেশ সমেত কারণ রবীন্দ্রনাথ যখন একথা বলেছিলেন তখন দেশভাগ হয়নি) সব সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে নির্বিশেষে ভারতীয় এই পরিচয়ে গৌরবান্বিত হোক৷’’ কালী নজরুল ইসলাম বাংলার কবি৷ বাঙালির কবি, যাকে সময় ভাগ করে দিতে পারেনি৷ তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি আবার এপার বাংলার হৃদয়ের কবি৷ তিনি বলেছিলেন, “হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন/কান্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।’’ আজ ভারতবর্ষের মানুষের আর্থিক দুরবস্থা চরম পর্যায়ে এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চালু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে না ফলে কর্মসংস্থান হচ্ছে না, কৃষকরা ঋণ মকুবের দাবিতে সোচ্চার, ফলে রাজ্যে রাজা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি পরাজিত হচ্ছে৷ রামমন্দির দেবতার মন্দির এবং সেই মন্দির হবে কি না, হলে কীভাবে হবে সেটা ঠিক করবে সুপ্রিম কোর্ট। যদি মন্দির হয়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাহলেও ক্ষুধার অন্ন সরকারকেই জোগাড় করতে হবে৷

ভারতবর্ষে কিছু মৌলবাদী সংগঠন যারা আজ সরকারে আছে তাদের মূল অ্যাজেন্ডা মন্দির নির্মাণ হতে পারে না আবার বাংলাদেশে যারা মৌলবাদী তারা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে আঘাত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধর্মীয় মৌলবাদ ধ্বংস হবে, জন-জাগরণের মধ্য দিয়ে, সেদিন আর বেশি দুরে নয়৷

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers