ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

বর্তমান ভারতবর্ষ কি তার যুগ-যুগান্তের শিক্ষা পরিত্যাগ করে ঔদার্য থেকে সংকীর্ণতার পথে এগিয়ে চলেছে। এই প্রশ্মের উত্তর হয়তো এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রাথমিক কিছু ঘটনাবলি মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভারতের বর্তমান ইতিহাস কোন পথে অগ্রসর হবে সেটা অনেকটাই নির্ভর করে দেশের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, সাহিতা, শিল্পকলা ও জীবনবোধের উপর। আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ধর্ম যার প্রভাব ভারতীয় সমাজের উপর প্রবল। মুখ্যত ভারতীয় সমাজ গড়ে উঠেছে আধ্যাত্মিক চেতনার উপর। ভারতীয় সভ্যতার মূল গ্রন্থ বেদ। বেদেই বিশ্বশান্তি। বিশ্ব মৈত্রী, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্ব কল্যাণের প্রথম প্রকাশ ও অগ্রদূত। হিন্দুধর্মের আদি গ্রন্থগুলি হল বেদ, উপনিষদ, বেদান্ত, পুরাণ যার মূল বাণী বিশ্বসভায় প্রথম তুলে ধরেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, শিকাগো ধর্মসভায়। ভারতীয় দর্শন কত উচ্চমার্গের সেদিন স্বীকার করে নিয়েছিল সমগ্র বিশ্ব। দেশে ফেরার পথে তাঁকে পাম্বান দ্বীপে অভিনন্দিত করা হয়। অভিনন্দনের উত্তরে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি পাশ্চাত্য দেশের অনেক স্থানে ঘুরিয়াছি – অনেক দেশ পর্যটন করিয়াছি, অনেক জাতি দেখিয়াছি । আমার বোধ হয় প্রত্যেক জাতির একটা মুখ্য আদর্শ আছে। সেই আদর্শই যেন তাহার জাতীয় জীবনের মেরুদণ্ড স্বরূপ । রাজনীতি, যুদ্ধ, বাণিজ্য বা যন্ত্র বিজ্ঞান ভারতের মেরুদণ্ড নহে। ধর্ম, কেবল ধর্মই ভারতের মেরুদণ্ড।” ধর্মের প্রাধান্য ভারতে চিরকাল। স্বামী বিবেকানন্দ ভারতে জ্ঞানতপস্বী। ওই একই স্থানে তিনি বলেছেন, “খ্রীষ্ট, বুদ্ধ বা মহম্মদ-জগতের যে কোন অবতারের উপাসনা করুন না কেন, কোন ধর্মাবলম্বীর সহিত আমাদের বিবাদ নাই।” এখানে “আমাদের’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন হিন্দু ধর্মবলম্বীদের সঙ্গে কোনও বিবাদ নেই। এই কথাগুলি বলার কারণ হল হাজার হাজার বছর আগে যে জাতি বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, বেদান্ত, বেদান্ত-এর মতো পুস্তক রচনা করেছে, সেই জাতি অন্য কোনও ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃণা, ঈর্ষা, দ্বেষ প্রকাশ করতে পারে না। কারণ উপরিউক্ত পুস্তকগুলি যে জাতি নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলে বিশ্বাস করে তারাই হিন্দু। এই পুস্তকগুলি রচনার বহু সহস্র বছর পরে এই বিশ্বের সমস্ত ধর্মগ্রন্থ রচনা হয়েছে যেমন বাইবেল, কোরান, ত্রিপিটক, গ্রন্থসাহেব প্রভৃতি।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “হিন্দু নামে পরিচয় দেওয়া আমাদের প্রথা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহার আর কোন সার্থকতা নাই, কারণ এই শব্দের অর্থ যাহারা সিন্ধুনদের তীরে বাস করিত।” প্রাচীন পারসিকদের বিকৃত উচ্চারণে সিন্ধু শব্দই “হিন্দু রূপে পরিণত হয়। মুসলমান শাসনকাল থেকেই ওই শব্দে পরিচিত হয় এই দেশের আদি  মানুষজন। স্বামীজি বলেছেন, “হিন্দু” শব্দ ব্যবহারের কোনও ক্ষতি নাই কিন্তু কোন সার্থকতাও নাই। তিনি বলেন, হিন্দু শব্দের পরিবর্তে “বৈদান্তিক’ শব্দটি অর্থপূর্ণ কারণ বেদই বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থ (ধর্মপ্রন্থ)। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্ম বিশেষ বিশেষ কতকগুলি গ্রন্থকে প্রামাণ্য বলিয়া স্বীকার করে। আধুনিক পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মতে এই সকল গ্রন্থের মধ্যে বেদই প্রাচীনতম। হিন্দুদের কোনও প্রতিষ্ঠাতা নেহ। তাদের মতে বেদ অনাদি-অনন্ত। এবং ঈশ্বরের বাণী। স্বামীজির মতে, পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম ব্যক্তি ভাবাপন্ন ঈশ্বর অথবা ভগবানের দূত বা প্রেরিত পুরুষের বাণী বলিয়া তাহাদের শাস্ত্রের প্রামাণ্য দেখায়। হিন্দুরা বলেন বেদের অন্য কোনও প্রমাণ নাই। বেদ ঈশ্বরের জ্ঞানরাশি। আগেই উল্লেখ করেছি স্বামীজির মতে মানুষের অন্তরে যে দেবত্ব আছে তার পরিপূর্ণ প্রকাশই ধর্ম। মহাভারত রচয়িতা বেদব্যাস বলেছেন, কলিযুগে দানই একমাত্র ধর্ম। এই দান বলতে বোঝায় (১) ধর্মদান (২) বিদ্যাদান (৩) প্রাণদান (৪) অন্ন-বস্ত্র দান। ভারতবর্ষের যুগ যুগান্তের বাণী যদি উপলব্ধি করা যায় তাহলে এটাই প্রমাণিত হয় ভারতবর্ষে আধ্যাত্মিক ভাবের অনন্ত উৎসের উপর ভিত্তি করেই যুগ-যুগান্তের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। স্বামীজি “দেবত্ব’ এই শব্দ বলতে বোঝাতে চেয়েছেন মানবজীবনের সদ গুণগুলির পূর্ণ বিকাশ অর্থাৎ বিশ্বের অনন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার যার আছে। যার অন্তরে প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা আছে তিনিই ধার্মিক। তিনি মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুম্ফা, স্তূপ বা গুরুদ্ধারের মধ্যে আবদ্ধ কিছু ক্রিয়াকলাপকে ধর্ম বলে মানেননি। শ্রীমদ্ ভাগবত গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে সমগ্র দৃশ্যমান বিশ্বই হল ক্ষেত্র যার মধ্যে আমাদের মন, দেহ, ইন্দ্রিয়গুলি এবং অন্যান্য সবকিছুই পড়ে । এসবের বাইরে যে বস্তুটি তা হল বিশুদ্ধ চৈতন্য বা শুদ্ধ বুদ্ধি যার ওপর এই বিশ্ব অধিষ্ঠিত। প্রকৃত জ্ঞানলাভ করলে নিখিল বিশ্বকে জানা যায়।

শ্রীকৃষ্ণ অজুনকে বলেছেন, “অমানিত্বমদভিত্ব সহিংসা ক্ষান্তিরাজবম/আচার্যেপাসনং শৌচং স্থৈর্য্য মাত্মবিনিগ্রহঃ। অর্থাৎ যার মধ্যে নম্রতা, নিরভিমানতা, অহিংসা, ক্ষমাশীলতা, সরলতা, গুরুসেবা, পবিত্রতা, বর্ষ ও আত্মসংযম আছে তিনিই জ্ঞানী|

আজ যারা ধর্মের নামে বিভাজন চাইছে তারা আদৌ ধর্ম কি ধর্ম কী তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। জ্ঞান মানে কিছু বই পড়া বিদ্যা নয়, অনেক গুণের অধিকারী হতে হয়। গীতার শ্রীকৃষ্ণের উক্তিতে বলা হয়েছে “ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্য মনহঙ্কার এব চ /জন্ম মৃত্যু জরা ব্যাধি দুঃখ দোষানুদর্শননা । ‘অর্থাৎ জ্ঞানী যে হবে তাকে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়গুলির প্রতি অতি আসক্তি ত্যাগ করতে হবে এবং সেইসঙ্গে নিরহংকারিতা এবং জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি ও দুঃখের অশুভ দিকগুলির কথা বারংবার চিন্তা করা। অর্থাৎ যে ধর্মের কথা আলোচনার অন্যতম বিষয় তা ভারতের আদি ধর্মপ্রন্থ গুলির মধ্যে দেবতার মুখনিঃসৃত বাণী হিসাবেই উল্লেখিত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ উপরিউক্ত বিষয়কে সহজ ও সরল ভাষায় বলেছেন “জীবে প্রেম করে যেইজন/সেইজন সেবিছে ঈশ্বর” অর্থাৎ ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিটি মানুষের মধ্যে।

ইসলাম ধর্মে ইদ পালনের পর দরিদ্র মানুষদের রোজগারের একটি অংশ দেওয়া ধর্মীয় রীতি এবং অবশ্য কর্তব্য। স্বামীজি নিজে হিন্দুধর্মের প্রচারক (যদিও তিনি হিন্দু শব্দের বদলে বৈদান্তিক শব্দ ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন) হয়েও ধর্মের আচারসর্বস্বতার থেকেও মনুষ্যত্ব ও চেতনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি জাতপাত, ধর্মান্ধতা ও উচ্চনীচের বিভেদ থেকে মুক্ত হয়ে সমগ্র মানবজাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার কথা বলেছেন। যে জাতি নানা ধর্মীয় হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্ট, বৌদ্ধ, জৈন, বৈষ্ণব ইত্যাদি) অনুশাসন ও চেতনায় সঞ্জীবিত হয়েছে, যে জাতির আদি ভিত্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞান সেই জ্ঞান ভিত্তিপ্রস্তর কঠিন। যুগে যুগে মুসলমান, পাঠান, শক, হুন, খ্রিস্টান, ফরাসি, পর্তুগিজ প্রভৃতি জাতি ভারতে আগমন করেছে মূলত দুটি বিষয়কে সামনে রেখে। (১) যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ বা রাজ্য জয় (২) সম্পদ লুঠন। কিন্তু বহু শতাব্দী ধরে যারা ভারতে এসেছিল তারা অনেকেই ফিরে গেছে আবার কোনও কোনও জাতি এদেশে থেকে গিয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে এই দেশের জনসমষ্টির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। ভারতের মানুষের জনজীবন সম্ভীবিত করেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্ম। পরবর্তীকালে মোঘল ও পাঠানদের আমলে হিন্দু মুসলমান সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছে এবং পরবর্তী সময় খ্রিস্টানদের প্রভাবও ভারতীয় সভ্যতার বিবর্তনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। ভারতের ইতিহাসে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বহুবার কিন্তু ইসলাম ধর্মের সুফি সম্প্রদায়ের প্রভাব যেখানেবেশি ছিল সেখানে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য দৃঢ় হয়েছে। সত্যনারায়ণের যে পুজো হিন্দুরা করে সেখানে পুজো শেষে পাঁচালি পাঠ করা হয় যার শেষ দুটি লাইন হল

‘সত্যপীর কহি সবে সাথে দিবে হাত

নারায়ণ বলি করিবেক প্রণিপাত।’

অর্থাৎ হিন্দুদের পুজোয় পীরকে আরাধনার কথা উল্লেখিত হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি, সংগীত, ভাস্কর্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিটি ধর্মের মানুষই নিজ নিজ প্রতিভার নিদর্শন রাখতে পেরেছে। শ্রীচৈতন্য, দাদু, শ্রীরামকৃষ্ণ ও কবীর প্রমুখ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের উদার মানসিকতা ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্তির পথনির্দেশ করেছে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় মননের অন্তর্নিহিত বাণীকে প্রকাশ করেছিলেন তার কবিতায় যেখানে তিনি বলেছেন, “নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান/বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।” অর্থাৎ ভারতীয় সভ্যতা যে চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত তা হল আধ্যাত্মিকতা । মত ও পথের পার্থক্য থাকলেও লক্ষ্য কিন্ত একই, তা হল আত্মার মুক্তি। এবং অন্তরে নিহিত দেবত্বের পূর্ণ বিকাশ। যারা ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী তারা না হিন্দু না মুসলমান না খ্রিস্টান। তারা ভারতের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বীজকেই ধ্বংস করতে উদ্যত। ভারতের মানুষের মনে যে দৃঢ় ধর্মীয় ভিত্তি রয়েছে তাকে কিছু বিপথগামী মৌলবাদী ধ্বংস করতে পারবে না। বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, কবীর, দাদু, নানকের মতো মুক্তমনের মানুষ যে দেশে জন্মায় সেই দেশের হাজার হাজার বছরে গড়ে ওঠা সম্প্রীতি ও বিশ্বাসকে কেউই ধ্বংস করতে পারবে না। ত্যাগ, সহনশীলতা ও সেবার আদর্শই প্রতিষ্ঠিত হবে। কোরান শরিফে হজরত মহম্মদ বলেছেন, যার ধর্ম সে পালন করবে। রামকৃষ্ণ বলেছেন, যত মত তত পথ।

ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয়দের জীবনে ধর্মান্ধতার বিষবৃক্ষ পুঁতে দিয়ে গিয়েছিল আজ দেশের শাসকরা সেই রাজনীতির হাতিয়ার করেছে। মহাবিশ্বে যা কিছু সত্য তার প্রধান শক্তি হল সূর্য। সূর্যের উত্তাপ আমাদের প্রাণভোমরা। সেই সূর্যের দেশ ভারতবর্ষ কারণ বিশ্বের মানুষকে প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা, অহিংসার ধর্ম শিখিয়েছে ভারতবর্ষ, যার অন্তর্নিহিত ভাবই হল আধ্যাত্মিকতা । ভারতবর্ষ বিশ্বের মানুষকে শিখিয়েছে ধর্মের প্রকৃত তত্ব। ভারতবর্ষ বিশ্বে একমাত্র দেশ যে সূর্যের মতোই মানব জীবনে সত্যের সন্ধান দিয়েছে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial