ভাবহস্তী ঢুকেছিল তাঁর দেহঘরে 

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

কেশব-কেশব, গোপাল-গোপাল, হরি-হরি, হর-হর। শ্রীরামকৃষ্ণ-কথিত সেই অবিস্মরণীয় গল্গের কথা কথামৃতে সকলেই পড়েছেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সেখানে ভেকধারী ভক্তদের কথা বলেছিলেন। সেই ‘কেশব’-এর নেপথ্যে ছিল “কেসব”। কিন্তু ১৮৩৮ সালের ১৯ নভেম্বর উত্তর কলকাতার কলুটোলায় (বর্তমান ১২২, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ) যে-কেশব জন্মেছিলেন তিনি ব্রাহ্ম ধর্ম আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা, বাগ্মী ও প্রসিদ্ধ সংগঠক, শ্রীরামকৃষ্ণেরই পরম অনুরাগী ভক্ত হিসাবে বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

কেশবচন্দ্রের উত্থান ঘটেছিল দেবেন্দ্রনাথের হাত ধরে আর সিদ্ধিলাভ শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে । নইলে একেশ্বরবাদী  নিরাকার সাধক কীভাবে মজলেন বহুত্ববাদী সাকার সাধকের লীলায়। কিন্তু তিনি কি শুধুই দুই মতবাদের মাঝে একটা সাঁকো? একথা ঠিক, কেশবচন্দ্রের মধ্যে প্রভূত দ্বিচারিতা ছিল, একনিষ্ঠা বজায় রাখতে তিনি পারেননি। ব্রাহ্মাধর্মের শীর্ষ নেতা হয়েও কেশব একজন কালীসাধকের সঙ্গে কীভাবে গঙ্গাবক্ষে নামসংকীর্তন সহযোগে উদ্বাহু নৃত্য করতেন তা সত্যিই বিস্ময়ের। আবার একথাও সত্য যে, সব মত ও পথের বেড়া ভেঙে দেবেন বলেই অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের যে আবির্ভাব হয়েছিল তা একবার সার্থক হয়েছিল কেশবকে দিয়েই। আর কেশবের পরিণতিতে ভয় পেয়েই সম্ভবত শ্রীরামকৃষ্ণ-সানিধ্য এড়িয়ে চলতেন শিবনাথ শাস্ত্রীর মতো তরুণ ব্রাহ্ম-অনুরাগীরা। ইতিহাসের এক পরম সন্ধিক্ষণকে ঘটনাবহুল করে তুলেছিল এইসব ইতিহাস।

আসলে কেশবের মধ্যে জ্বলন্ত মশালের আগুন দেখে তাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্র। তাই ব্রাহ্মসমাজের অনুশাসন ভেঙে প্রথম অব্রাহ্মণ  আচার্যপদে বরণ করে নিয়েছিলেন। আবার কেশব পরবর্তীতে শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে সেই জ্বলন্ত অগ্নি দেখে স্রেফ পতঙ্গের মতো তাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। দু’হাত বাড়িয়ে অনুরাগীকে ভালবাসা বিলিয়েছিলেন মানবপ্রেমিক পরমহংসদেব।

দ্বিচারিতা সত্ত্বেও  কেশবের গুণাগুণ চিনতে ভুল করেননি দক্ষিণেশ্বরের কালীসাধক। তাছাড়া কেশবের মধ্যে ছিল বলিষ্ঠ সাংগঠনিক শক্তি। মতোবিরোধের নিয়ে মেছুয়াবাজার স্ট্রিটে (আজকের কেশব সেন স্ট্রিট) ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করলেন। সেটা ১৮৬৬ সাল। এর কয়েক বছর পর বিলেত গেলেন এবং একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রচার করলেন বেশ সাড়া জাগিয়ে। কেশব তখন মাত্র ৩২-এর তরুণ। ফিরে এসে শুধু ধর্ম নয়, বিবিধ সামাজিক কর্মে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন। পত্রিকা প্রকাশ করছেন (‘সুলভ সমাচার’, ‘বালকবন্ধু’), সংগঠন গড়ছেন (আ্যালবার্ট হল প্রতিষ্ঠা), স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নিচ্ছেন (পরবত্তীকালের ভিক্টোরিয়া

ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা)। এমনকী ১৮৭২ সালে যখন সরকারি বিবাহবিধি রচিত হয়, তাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল কেশবের। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার করলেন। অর্থাৎ সমাজ-সংস্কারের একটা বাসনা ফলবতী করতে চেয়েছিলেন, এটা স্পষ্ট । মোটামুটি বছর দশেক এইভাবে চলার পর একটা মোড় ফিরল কেশবের জীবনে। ১৮৭৫। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হল কেশবের। কেশব তখন কর্মকোলাহল থেকে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে এনে নিজের ঈষৎ ফিকে হওয়া আধ্যাত্মিক চাইছিলেন। বেলঘরিয়ার জয়গোপাল সেনের বাগানবাড়িতে সাধনরত কেশবকে বসন্তের এক অপরাহ্নে দেখতে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, যেমন গিয়েছিলেন দেখতে ঈশ্বরচন্দ্রকে। কেশবকে বলেছিলেন, “তোমার ল্যাজ খসেছে”। তাদের বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র দু’বছরের। এ যেন ছিল পূর্বনির্দিষ্ট বন্ধুত্ব।

মাত্র ৪৬ বছর বয়সেই জীবনের নটেগাছটা মুড়িয়ে গেল কেশবের। শেষ একটা বছর প্রিয় কেশবের জন্য ঠাকুরের ব্যাকুলতা ছিল লক্ষণীয়। একবার ঠনঠনিয়ায় সিদ্ধেশ্বরী কালীর কাছে ডাব- চিনি মানত করছেন। যাকে কাছে পান তার কাছেই খবর নেন কেশবের। ছুটে যান “কমল কুটিরে” কেশবের বাড়িতে। শেষরক্ষা হল না। চলে গেলেন কেশবচন্দ্র। ঠাকুর তিনদিন শয্যাত্যাগ করতে পারেননি। মনে হয়েছিল তার, যেন একটা অঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেছে। ভালবাসা তো এমনই গভীর হতে হয়। ঠাকুর বলেছিলেন, ভাবহস্তী ঢুকে তোলপাড় করেছে কেশবের দেহঘর।

উনিশ শতকে কেশবচন্দ্র যে ‘নববিধান’ তৈরি করেছিলেন তার মূল কথা ছিল, ভগবানে বিশ্বাস এবং ভগবানের সঙ্গে পূর্ণ যোগসাধন ও মানুষে মানুষে ও পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে পূর্ণ যোগসাধন করা। সেই বিধান আজও প্রযোজ্য। তাই কেশবচন্দ্র আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর ১৮২-তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের প্রণাম।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial