বড়দিনের যীশু

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

রাজ চক্রবর্তী

আজ থেকে ২০১৯ বছর আগে এক শৈত্যপ্রবাহের দিনে পৃথিবীতে এসেছিলেন মহামানব যীশু। তিনি না এলে পৃথিবীতে আলোকসম্পাত হত না আরেকবার। শীতের দিনে ছুটির বড়দিন পেতাম না আমরা। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ গণনাই হত না। কেননা, বড়দিনটা তাঁরই হ্যাপি বার্থ ডে আর সেই দিনটি থেকেই পৃথিবীতে খ্রিস্টাব্দ গণনার সৃত্রপাত।

একালে ধর্মীয় উৎসবের অনেকগুলিই ধর্মীয় সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই। দুর্গাপুজো যেমন, বড়দিনও তেমনই আজ সর্বজনীন উৎসবের মাত্রা লাভ করেছে। তাই শুধু খ্রিস্টানের তরে নয়, বড়দিন আজ দুনিয়াব্যাপী সকলের তরে। শীতের লুকোচুরির মাঝে বড়দিন তার নিজস্ব গরিমায় উজ্জ্বল। বাংলার মা-মাটি-মানুষও এই উৎসবে শামিল। প্রায় সারা বছর আমরা তাকিয়ে থাকি ডিসেম্বরের ২৫ তারিখটির দিকে। পৃথিবীতে ভগবান যীশুর আবির্ভাব একটা বিরাট ঘটনা আর সেই ঘটনাকেই আমরা প্রতি বছর উদযাপন করি প্রাণভরে। আর এটা এমন একটা সময় যখন এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বিরল শীতের উপস্থিতি। সেইসঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা শেষ, ফলে পড়াশোনার ক্ষণিক বিরাম-মূল্যবান অবসর। অফিসে অফিসে বছর শেষ সিএল পূরণের ধামাকা। ফলে আনন্দ করার এর চেয়ে সুসময় আর বোধহয় হয় না। তবে দেশে এই মুহূর্তে অনেক সমস্যার কালো মেঘ।

আর্থিক মন্দার সঙ্গে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ ও অশান্তির চোরাস্রোত রয়েছে। তাই ষোলোআনা আনন্দ উপভোগ হয়তো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আনন্দকে একেবারে ব্রাত্য করে তো বাঁচাও যাবে না। তাই এরই মধ্যে মানুষ মেতে উঠেছে। আবার শুধুই বছর শেষ তো নয়, আস্ত একটা নতুন বছরও আসছে। এ যেন একটা সন্ধিক্ষণ। বিষাদে-পুলকে একটা মাখামাখি ব্যাপার। বেথেলহেমের এক আস্তাবলে রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে জন্ম হয়েছিল যীশুর। তারপর জেরুজালেমের পথে। সেখান থেকে মিশর। হত্যার ষড়যন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল এক পবিত্র জীবন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ষড়যন্ত্রই জয়ী হয়েছিল। রাজাদেশে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন যীশু। যীশুর জীবনে ঠিক কত বছর বয়সে এই ঘটনা ঘটেছিল বা যীশু মোট কত বছর জীবিত ছিলেন সে নিয়ে বিতর্ক আছে। সুসমাচার অনুযায়ী, ৩০ বা ৩৩ বছর বয়সে যীশু ক্রুশবিদ্ধ হন। কিন্তু ভক্তের মতে, যীশুর পুনরুজ্জীবন ঘটে এবং তিনি প্রায় ৮০ বছর পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন। শোনা যায়, কাশ্মীরে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তিনি ভারতে পুরী, কাশী প্রভৃতি জায়গায় এসেছিলেন। বেদচর্চাও করেছিলেন। যোগক্রিয়া ও সাধনভজন করে অলৌকিক ক্ষমতা বা সিদ্ধাইও কিছু কিছু অর্জন করেছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি শাস্ত্রনিহিত সত্যের প্রচার শুরু করেছিলেন। তাঁর জীবনের মাঝের মোট ১৬ বছরের কোনও কাহিনী বাইবেলে নেই। হয়তো সেটি তাঁর অজ্ঞাতবাসের কাল।

জন্মের পর শিশু যীশুকে প্রথমে আস্তাবলের খড়ের গাদায় শুইয়ে রেখেছিলেন মাতা মেরি। পরদিন সকালে অত্যাচারী রোমান রাজা হেরোদের ভয়ে সেখান থেকে পলায়ন। হেরোদ যেন কংসমামা। আর এ এসবই ছিল অন্ধকারের ষড়যন্ত্র। সেই অন্ধকার পৃথিবীতে আলো ফেলার জন্যই যীশুর ‘সম্ভবামি যুগে যুগে’। ধর্মের গ্লানি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করাই ছিল উদ্দেশ্য। বুদ্ধ, কৃষ্ণ, নানক, চৈতন্য, যীশু-একই পরম্পরা। যীশু বলেছিলেন, “পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মকেই পুনরায় সংস্থাপন করতে এবং তাকে পূর্ণতর করতেই আমার আগমন” (বাইবেল)। কাজেই নতুন কোনও ধর্মস্থাপন তাঁর অভীষ্ট ছিল না। তাছাড়া ধর্ম তো একাধিক হয় না। একটাই তো ধর্ম পৃথিবীর সেটা হল মানবধর্ম। সেই মানবধর্মের নতুন করে অভিষেক ঘটানোর দিন হল বড়দিন। পবিত্র মানবশিশু যীশু এই মানবজীবনকে পবিত্র করার জন্য ডাক দিয়েছিলেন। পৃথিবীর অন্যান্য অবতারপুরুষরাও একই কথা বলেছেন। কবিতার ভাষায় আমাদের ‘আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু’ রচনার স্বপ্ন দেখতে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথও। যীশু বলেছিলেন প্রেম ও ক্ষমার কথা। কিন্তু, সেসব অপরাধের ক্ষমা হয় না আজ সেসবই ঘটে চলেছে বার বার। কেন এমন ঘটবে। তবে কি পৃথিবী কোনওদিনই পবিত্র হবে না? পূরণ হবে না যীশুর স্বপ্ন? অন্ধকারই থেকে যাবে চিরতরে? তা হতেই পারে না। বিশ্বাস হারানো পাপ। বড়দিনের আনন্দ উৎসবের মধ্যে নতুন করে বেঁচে ওঠার, জেগে ওঠার জন্য একবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—আসুন না সকলে। বছরের শেষ প্রহরে এবার জ্বলে উঠুক আলো। হোক আমাদের আলোকাভিসার। আলোকপুরুষের সৌজন্যে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial