বিদ্যাসাগরের বাংলায় ঠাঁই নেই বিভেদের রাজনীতির

হিয়া রায়

শান্তি, সংহতি, সম্প্রীতি-এটাই বাংলার চিরন্তন ঐক্য। বাংলায় সব মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতির যে ঐক্য রয়েছে, তা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাই সম্প্রীতির অনন্য উদাহারণ। ইদ, দুর্গাপুজো, নববর্ষ, ক্রিসমাস সবেতেই বাংলার মানুষ একত্রিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করেন। জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই বলেছেন, ধর্ম যাঁর যাঁর, উৎসব সবার। বাস্তবিকভাবে বাংলাতেই দেখা যায়, সব মানুষের মধ্যে সহাবস্থান। আর এই বাংলা বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, নজরুলের মতো অসংখ্য মনীষীর। এখানে ঠাঁই নেই বিভেদের রাজনীতির।

বাংলার মানুষ ভাগাভাগি পছন্দ করেন না। বাংলার মানুষ একবাক্যে জানিয়ে দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাংলায় শান্তি ফিরেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজ্যজুড়ে উন্নয়ন হচ্ছে। এই অবস্থায় কোনও বিভেদকামী শক্তির জায়গা নেই বাংলায়। সমাজ সংস্কারের অন্যন্য প্রতীক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বর্ণপরিচয় স্রষ্টার ২০০তম জন্মদিবসকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করে রাজ্য সরকার। জন্মদিবস উপলক্ষে এক বছরব্যাপী অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবর্ষ উপলক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যান বীরসিংহ গ্রামে। বিদ্যাসাগরের জন্মভিটেতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। বীরসিংহ গ্রামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবর্ষের সুচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিদ্যাসাগরের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলছি, বাংলায় এনআরসি হবে না”

২৬সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগরের জন্মদিবস গুরুত্ব সহকারে রাজ্যজুড়ে পালন করা হয়। রাজ্যের তরফে আগামী এক বছর একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বর্ণপরিচয় বইটির পুর্নমুদ্রন করেছে রাজ্য সরকার। বিদ্যাসাগরের নামাঙ্কিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সাজিয়ে তোলা হয়। ঈশ্বরচন্দ্রের জীবন আদর্শ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী। লোকসভা ভোটের সময় দলীয় কর্মসূচি থেকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিল বিজেপি। পরে বিদ্য়সাগরের মুর্তি নতুন করে তৈরি করে দিয়ে বর্ণপরিচয় স্রষ্টাকে শ্রদ্ধা জানায় রাজ্য সরকার। জননেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলেন, “নতুন করে বিদ্যাসাগরের মুর্তি আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। এটা অকালবোধনের মতো। একদল ধর্মান্ধ লোক মূর্তি ভাঙল। ওরা হয়তো চেনেই না বিদ্যাসাগরকে। ওরা জানে না ওটা মাটির মুর্তি নয়, ওটা সভ্যতা, সংস্কৃতির মূর্তি। ভেঙে সব শেষ করা যায় না। ভয় দেখিয়ে বাংলাকে স্তব্ধ করা যাবে না।” একইসঙ্গে জননেত্রী বলেন, “বিদ্যাসাগর নবজাগরণ করেছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছিলেন। আরও অনেক কাজ করেছেন। তিনি করেছেন সবার জন্য। বাংলায় কোনও ভেদাভেদ নেই। বন্যা হলে শীলাবতীর জল সবার ঘরে ঢোকে। হিন্দুর ঘর-মুসলিম ঘর বলে কোনও ভেদ থাকে না। তেমন আগুন লাগলে সবার ঘর পোড়ে।”

ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মভিটেয় নবরূপে সজ্জিত বাড়িটিতে একটি সংগ্রহশালা করা হয়েছে। বিদ্যাসাগরের মুর্তিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর গুণিজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলা ভাষার জন্য বিদ্যাসাগর কাজ করেছেন। উনি সভ্যতার আলো দেখিয়েছিলেন।” ২৬ সেপ্টেম্বর নবান্নে বিদ্যাসাগরের ছবিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে শ্রদ্ধা জানান মুখ্যমন্ত্রী । রাজ্যজুড়ে একাধিক অনুষ্ঠান পালিত হয়।

বিদ্যাসাগরের জন্মভিটায় দাঁড়িয়ে চারজন কৃতী মানুষকে সংবর্ধনা দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন তাঁদের বিদ্যাসাগর পুরস্কার প্রদানও করেন মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যাসাগর পুরস্কার পেলেন আশিস লাহিড়ী, কৃত্যপ্রিয় ঘোষ, স্বপন চক্রবর্তী ও অরুণ নাগ। আশিস লাহিড়ী হলেন একজন লেখক ও ইতিহাসবিদ। উনবিংশ শতকের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের বিষয়ে তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে কৃত্যপ্রিয় ঘোষ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক। প্রেসিডেন্সি কলেজ-সহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে দীর্ঘ চার দশক তিনি অধ্যাপনা করেছেন। অধ্যাপক অরুণ নাগ একজন বিশিষ্ট লেখক ও সম্পাদক। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিয়ে গবেষণা করেছেন। স্বপন চক্রবর্তী ইংরেজি সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক। তিনি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ার প্রফেসর ছিলেন। বিদ্যাসাগরের উপর গবেষণা করেছেন।

মঞ্চে জেলার বেশ কয়েকজন কৃতী ছাত্রীকে সংবর্ধিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১১ জন মেধাবী ছাত্রীকে মানপত্র দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তারা হল ২০১৯ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জেলার ছাত্রীদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক সঙ্গীতা মহাপাত্র, ২০১৯ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ছাত্রীদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক সুপর্ণা সাউ, সিবিএসই, আইসিএসই পরীক্ষায় যথাক্রমে কৃতী ছাত্রী মনুশ্রী হাঁসা গঙ্গাবংশম, উপমা আইচ, সৃজিতা মান্না ও ঝিনুক দাস। জুনিয়র ও সিনিয়র মাদ্রাসা পরীক্ষায় দুই কৃতী ছাত্রী নুরনেগার বানু, পারভিনা খাতুনকেও সংবর্ধিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ ছাড়া দুই কন্যাশ্রী ফুটবলার মৌমিতা ধাড়া ও নিজের বিয়ে আটকে দিয়ে নজির স্থাপনকারী কন্যাশ্রী সরম্বতী মালিককেও সংবর্ধনা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দুই খুদে পড়ুয়ার হাতে বর্ণপরিচয় পুস্তক তুলে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৬০ জন প্রাপকের হাতে পুরস্কারও তুলে দিয়েছেন। এছাড়া সবুজশ্রী, কন্যাশ্রী, আনন্দধারা প্রকল্পের প্রাপককেও সুবিধা প্রদান করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যাসাগরের জন্মস্থল একটি গ্রামের জন্য উন্নয়ন পর্ষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডেবরার প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মস্থান বীরসিংহ গ্রামের জন্য একটি উন্নয়ন পর্ষদ তৈরির কথা বলেন। নাম হবে বীরসিংহ গ্রাম উন্নয়ন পর্যদ।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial