বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের অ্যাজেন্ডা এনআরসি ও সিএএ বাতিল করতে হবে

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের একটি সিদ্ধান্ত দেশের নাগরিকদের প্রবল অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়েছে যার প্রতিবাদ হচ্ছে সমগ্র দেশ জুড়ে। অতি সম্প্রতি অসমে এনআরসি অর্থাৎ নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে যেখানে প্রায় ১৩ লক্ষ হিন্দু এবং প্রায় ৬ লক্ষ মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নাম নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ চলে গেছে। যারা নাগরিকত্ব হারালেন তারা ট্রাইবুনাল, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারবেন যদিও তার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি শুরু হয়েছিল All Assam Student’s Union-এর সুদীর্ঘ ৬ বছরের আন্দোলনের ফলে। ১৯৫১ সালে ভারতে প্রথম জনগণনা হয় এবং এর পরই অসমে N.R.C লাগু হয়। খুবই ধীরগতিতে এই কাজ চলার জন্য সুপ্রিম কোর্ট ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ সালে নির্দেশ দেয় ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে নাগরিকপঞ্জির কাজ শেষ করতে হবে। ২০১৮ সালের ১ জুলাই নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হয় এবং দেখা যায় ৩ কোটি ২৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়। সারা দেশ জুড়ে প্রতিবাদ হয়। সবথেকে তীব্র প্রতিবাদ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফলে ৪০ লক্ষ মানুষ আবার আবেদন করার সুযোগ পায় যেখানে ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জনের নাম বাদ যায় অর্থাৎ নাগরিকত্ব হারায়। যারা ৬০-৭০ বছর অসমে বসবাস করছে তাদের অনেকের নাম, অসমের সরকারি কর্মচারী, অসমের জাতীয় স্তরে ফুটবল খেলেছেন এমন মানুষরাও নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়েছেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, বাবা-মার নাম নাগরিকপুঞ্জিতে থাকলেও সন্তানদের নাম বাদ পড়ে গেছে। অনেকে আত্মহত্যা করেন। সারা দেশ জুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ফলে অসম সরকারও এই নাগরিকপঞ্জি বাতিলের দাবি করে। এই বাতাবরণে কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় The Citizenship (Amendment) Bill 2019 পেশ করে। দেশের সবক’টি বিরোধী রাজনৈতিক দল এই বিলের বিরোধিতা করে। তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যরা যুক্তির জাল বিস্তার করে প্রমাণ করেন যে বিলটি সংবিধান সম্মত নয় এবং সংবিধানের ১৪ নং ধারাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। সংবিধানের ১৪ নং ধারা হল Right to Equality। এই ধারায় বলা হয়েছে,The State shall not deny to any person equality before the low or the equal protection of the laws within the territory of India। লোকসভায় সংখ্যাধিক্যের জোরে বিজেপি বিলটি পাস করিয়ে নেয়। পরদিনই বিলটি রাজ্যসভার আলোচনার জন্য ধার্য হয়। রাজ্যসভায় এনডিএ সংখ্যালঘু ফলে বিলটি পাস হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না কিন্তু বিজেপি দু’টি কৌশল অবলম্বন করে ১) বিপুল অর্থ প্রদান, ২) বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দকে আর্থিক দুর্নীতির কেসে জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি। ফলে সংখ্যাধিক্য জোগাড় করতে বিজেপির কোনও অসুবিধা হয় না এবং রাজ্যসভাতেও The Citizenship (Amendment) Bill টি পাস হয়ে যায়। পরদিনই রাষ্ট্রপতি সই করার ফলে বিলটি আইনেও পরিণত হয়। ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ কেন্দ্রীয় সরকারের Ministry of Law and Justice গেজেট প্রকাশ করেন। সংবিধানের ৫ নম্বর ধারা থেকে ১১ নং ধারায় নাগরিকত্ব সম্পর্কিত বিষয়গুলি বর্ণিত হয়েছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে সংবিধানে কোনও একটি বা একাধিক ধারা প্রয়োগযোগ্য কি না তা অনেক ক্ষেত্রে অন্য একটি ধারায় বর্ণিত অধিকারকে খর্ব করতে পারে। আগেই উল্লেখ করেছি, সংবিধানের ১৪ নং ধারা বর্ণিত অধিকারকে এই আইনে সরাসরি অবজ্ঞা করা হয়েছে।

সংবিধানের ৫ নং ধারায় বলা হয়েছে, দেশের যেদিন বলবৎ হয়েছে সেই দিনে যারা ভারতে বসবাসকারী তারা সকলে নাগরিকত্ব পাবে এবং ক) যিনি ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন, খ) বাবা অথবা মা যিনি ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং গ) সংবিধান বলবৎ হওয়ার পাঁচ বছর আগে থেকে যে বা যারা ভারতবর্ষে বসবাস করছেন। সংবিধানের ৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, যারা পাকিস্তান থেকে ভারতবর্ষে এসেছে সংবিধান বলবতের দিন থেকে তারা নাগরিক হিসাবে গণ্য হবে। যদি সেই ব্যক্তি অথবা তার বাবা-মা অথবা পিতামহ ও পিতামহী ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন যা Govt. of India Act 1935-এ বর্ণিত হয়েছে। খ) যদি কোনও ব্যক্তি ১৯ জুলাই ১৯৪৮ সালের আগে ভারতে এসেছে এবং তখন থেকে ভারতে বসবাস করছে, গ) যদি কোনও ব্যক্তি ভারতবর্ষে এসে থাকে ১৯ জুলাই ১৯৪৮ সাল অথবা পরে কিন্তু যদি সরকার নিযুক্তি কোনও আধিকারিককে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে থাকেন তাহলে সংবিধান বলবৎ হওয়ার আগেই তাঁদের নাগরিক হিসাবে গণ্য করা হবে। কিন্তু সেই ব্যক্তি আবেদন করার ৬ মাস আগে থেকে ভারতবর্ষে বসবাসকারী হতে হবে। সংবিধানের ৭ নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি যদি ভারতবর্ষ থেকে পাকিস্তানে বসবাসের জন্য গিয়েছে সে নাগরিকত্ব পাবে না কিন্তু যদি সেই ব্যক্তি অন্য দেশের পারমিট নিয়ে পুনরায় ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসে (১৯ জুলাই ১৯৪৮) তাকে বসবাসের অনুমতি দিতে হবে।

সংবিধানের ৮ নং ধারা বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি অথবা তার পিতামাতা বা পিতামহ-পিতামহী ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু ভারতে বসবাস করেন না যা ভারত সরকারের Govt. of India Act 1935-এ বর্ণিত আছে, তাকে যদি কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষ বা কাউনসেলর অনুমোদন করে তাহলে তাকে নাগরিকত্ব দিতে হবে। সংবিধানের ৯ নং ধারায় সেই ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব দেওয়া যাবে না বলা হয়েছে, যে বা যারা স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে। সংবিধানের ১০ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষ নাগরিক হিসাবে গণ্য হবে যদি দেশের সংসদ কোনও আইন প্রণয়ন করে। সংবিধানের ১০ নং ধারায় কলা হয়েছে যে, নাগরিকদের অধিকার দেশের সংসদ নির্বাচন করবে। নতুন করে যে আইন প্রণয়ন করা হল তাতে বলা হল The Citizens Act 1955-এর ২ নং ধারায় সাব সেকশন (আই) ক্লজ বি-তে নিম্নলিখিত বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে।

“কোনও ব্যক্তি যদি হিন্দু, শিখ, বুদ্ধিস্ট, জৈন, পার্সি অথবা খ্রিস্টান জনসমষ্টিভুক্ত হয় এবং আফগানিস্তানি, বাংলাদেশি অথবা পাকিস্তানি যে বা যারা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে অথবা তার আগে এবং যাদের Passport (Entry into India) Act 1920-র ক্লজ (সি) যা উপধারা (২) এবং মূল ধারা (৩)-এ অন্তর্ভূক্ত এবং যাদের ভারত সরকার ছাড় দিয়েছে আবেদন করার জন্য Foreigners Act 194 অনুযায়ী তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে বিবেচিত হবে না।

ধারা ৬এ)-তে ৬(বি) (এক), ৬(বি)(২), ৬(বি)(৩) ও ৬(বি)(৪) উপধারা যুক্ত হবে। মূল ধারা ৭(ডি)-র (আই) সঙ্গে (ডি.এ) যুক্ত হবে এবং ক্লজ (এফ) এর পরে যুক্ত হবে যে, কোনও আদেশ বলবৎ হবে না তাদের ক্ষেত্রে যারা বিদেশে থাকে ভারতীয় কার্ডহোল্ডার যতক্ষণ না তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছে। একইভাবে ধারা (১৮)-র ২-এর উপধারার ক্লজ (ইই)-র পর যুক্তি হবে যেভাবে উপধারা ৬(বি) (১)- এ উল্লিখিত আছে।

আইনের তৃতীয় শিডিউল ক্লজ (ডি)-তে নিম্নলিখিত বিষয় যুক্ত হবে- হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান যারা বাংলাদেশ, আফগানিস্থান ও পাকিস্তানের নাগরিক তাদের অন্তত ৫ বছর ভারতে থাকতে হবে ১১ বছরের পরিবর্তে।

অতি সংক্ষেপে এনআরসির ভয়ংকর প্রভাব এবং সিটিজেন্স অ্যাক্টের জটিলতা সমগ্র ভারতে এক চরম অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। ভারতের যুগ-যুগান্তের মর্মবাণীকে আঘাত করেছে যা হল “Unity in diversity”| ভারতের সকল মনীষী, ধর্মগুরু, সমাজ সংস্কারক ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা চেয়েছেন, আমাদের পরিচয় হোক ভারতীয়।

পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এনআরসি এবং সিএএ বাতিল করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাধ্য করতে হবে এই দাবি মেনে নিতে। ধর্মের আবেগ অত্যন্ত তীব্র সেই জন্য সেই আবেগ যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সেটা দেখা রাজধর্ম যা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial