বাতিল করো ‘কালা কানুন’ , সরব মুখ্যমন্ত্রী

Share, Comment
EmailFacebookTwitterWhatsApp

মেঘাংশী দাস

সিএএ বাতিল, এনপিআর এবং এনআরসি প্রত্যাহারের দাবিতে বিধানসভায় প্রস্তাব পাস করিয়ে বিজেপি বিরোধিতায় আরও ঝাঁজ বাড়িয়ে দিলেন জননেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে অসমে এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর্বে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তা প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই সিন্ধান্ত নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা । এরপর এনআরসি নিয়ে নাগরিক হয়রানির প্রতিবাদে এবং বাংলায়এনআরসি লাগু করা যাবে না বলে এই মর্মে ২০১৯ সালে ৬ সেপ্টেম্বর আরও একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল রাজ্য বিধানসভা। সেখানেও জননেত্রীর নেতৃত্বে বিজেপি বাদে অন্য সমস্ত দল এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছিল। আর এবার সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন অবিলম্বে বাতিলের দাবিতে বিধানসভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। প্রস্তাবের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বলেছেন, “গোটা দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতা, ঘৃণার রাজনীতি চলছে। সংবিধানকে যারা ধ্বংস করতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরাই আইন মানছি না, মানবও না। কালাকানুন দিয়ে একজন মানুষেরও নাগরিকত্ব হরণ করতে দেব না। অবিলম্বে এই আইন রদ করতে বলেছি।

তার কারণ, আইনটা সংবিধান বিরোধী, তেমন জনবিরোধীও ৷ আমরা চাই দেশের সমস্ত রাজ্য আমাদের মতোই বিধানসভায় সিএএ বিরোধী প্রস্তাব পাস করাক।” বিধানসভায় পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এই প্রস্তাব এনে বলেছেন, “খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই প্রস্তাব। নাগরিক বিপন্নতার মধ্যে দিয়ে চলা আইনের ধাক্কায় দেশও এখন বিপন্ন। এজন্যই দেশ বাঁচাতে আমাদের সরকার বিধানসভায় এই প্রস্তাব এনেছে।” বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে আনা প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নাগরিকত্বের যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড হিসাবে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে।

যা ভারতের সংবিধান বিরোধী। এই আইনের সাহায্যে কেন্দ্রের শাসকদল ধর্মের নামে দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন আনছে। সিএএ বাতিলের জন্য অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ করতে হবে। এনপিআর এবং এনআরসি যা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, তার প্রত্যেকটি প্রত্যাহার করতে হবে।

পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আনা সিএএ বিরোধী প্রস্তাব বিধানসভায় শেষপর্যন্ত বাম ও কংগ্রেস সমর্থন করতে বাধ্য হলেও ওই বিরোধী নেতারা বক্তব্য রাখার সময় রাজা সরকারকে কটাক্ষ করেন। কিন্তু এরপর নিজের বক্তব্য রাখতে উঠে সমুচিত জবাব দিয়েছেন মা-মাটি- মানুষের নেত্রী। বাম ও কংগ্রেস বিধায়কদের স্পষ্ট শব্দে নেত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, ‘মোদি আর দিদি কিন্তু এক নয়”। সিএএ, এনপিআর এবং এনসিআর বিরোধিতায় পথে নেমে যে স্লোগান আপনারা দিচ্ছেন, তা একদিন বুমেরাং হবে।’ এরপরই বাম পরিষদীয় নেতাকে স্মরণ করিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের ভোটই কিন্তু বিজেপির বাক্সে গিয়েছে, আমাদের ভোট নয়।” আর কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতাকে উষ্মা সুরে জননেত্রী বলেছেন, “প্রোটোকল বলে একটা বিষয় আছে। সরকারে থাকলে অনেক দায়বদ্ধতা থাকে, সংবিধান মেনে সেগুলো করতে হয়। দেখা করলে বলবেন কেন গেলাম, আর না গেলেও সমালোচনা করবেন। আর আমি যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অন্যায় করে থাকি, তাহলে কেন কংগ্রেস শাসিত পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলেন? যদি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এতই আপনাদের বিরোধিতা, তবে কেন কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীরা সবাই এনপিআর বৈঠকে দিল্লি গিয়েছিলেন? এনপিআর মিটিংয়ে আমি যাইনি। মনে রাখবেন, আমি যাইনি শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার জন্য নয়, দেখাতে চেয়েছিলাম আমি একাই লড়তে পারি। “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে” মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা মাত্রই তৃণমূলের সমস্ত বিধায়করা টেবিল চাপড়ে জননেত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন জানান।

দেশ বাঁচাতে তৃণমূলের লড়াইকে যে অন্যান্য রাজা এবং রাজনৈতিক দল সমর্থন করছে, তাও বুঝিয়ে দেন জননেত্রী । সভায় বাম ও কংগ্রেস নেতাদের মা-মাটি-মানুষের নেত্রী পরামর্শ দেন, “ঘরে আগুন লাগলে সেই আগুনে কিন্তু সবাইকে পুড়তে হবে। আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য বছরের বাকি দিনগুলি তো পড়েই আছে। একটা দিন অন্তত এই সংবিধান, গণতন্ত্র এবং জনবিরোধী সিএএ, পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এনপিআর ও এনআরসির বিরুদ্ধে সংবিধান রক্ষায় আসুন এক সঙ্গে লড়াই করি।” এরপর বিরোধী নেতাকে উদ্দেশ করে জননেত্রীর আহ্বান, “বন্ধু মনে করি বলেই বলছি, আপনার দলকে বোঝান, এনপিআর মানা মানেই এনআরসি মেনে নেওয়া। এটা একে অপরের পরিপূরক।”

জননেত্রী উল্লেখ করেন, বাংলা সব সময়ই পথ দেখায়। এই আইন শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের সমস্যা নয়, দেশের অখণ্ডতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূলে আঘাত করছে। সিএএ দেশের মানবিকতা ও সভ্যতা- সংস্কৃতির লজ্জা। সাংঘাতিক মৃত্যুর খেলা খেলছে বিজেপি। মৃত্যুর ফাঁদে আপনারা কেউ পা দেবেন না।” বাম এবং কংগ্রেসের নেতাদের কটাক্ষের কড়া জবাব দিয়ে জননেত্রী বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আপনারা যা খুশি বলুন। কিন্তু বৃহত্তর মানবতার স্বার্থে আমাদের প্রস্তাব সমর্থন করা উচিত। ঘোলা জলে মাছ ধরে লাভ নেই। বারবার বলেছি, আমাদের সঙ্গে আসুন। আন্দোলন করুন। অসম ও উত্তরপ্রদেশে ক’বার গিয়েছেন আপনারা? আপনাদের দায়বদ্ধতা আছে। এই দেশ আমাদের সবার। সবারই নাগরিক অধিকার আছে। আসুন আমরা একজোট হই। এই স্বেচ্ছাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সবাই মিলে আন্দোলন করি। বিজেপি বাঙালি- অবাঙালি, হিন্দু-সংখ্যালঘু ভাগ করছে। সবার অধিকার রয়েছে এদেশে থাকার। ঘৃণার রাজনীতি আমরা করি না। মানুষের অধিকার আমরা কাড়তে দেব না। ছাত্র-ছাত্রী, যুব, নাগরিক সমাজ, যে যেখানে আছেন-বিজেপির বিরুদ্ধে জোরদার, লাগাতার আন্দোলন গড়ে তুলুন।”

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial