বহুগুণ ওয়াদা সত্ত্বেও কৃষকদের প্রতি কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা মোদির আমলে স্পষ্ট

 

ডঃ দেবনারায়ণ সরকার

বিশ্বের অন্যতম বৈজ্ঞানিক দার্শনিক চার্লস ডারউইন লিখেছিলেন, “যদি দরিদ্রদের দুর্দশা গুরুতর হয় প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কারণে, তাহলে সেটা আমাদের পাপ” (“If the misery of the poor be caused not by the laws of nature, but by our institutions, great is our sin”)। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক গত সাড়ে চার বছরে দরিদ্রদের স্বার্থে বড়বড় ওয়াদা দেওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের আত্বহত্যা ভারতে গড়ে প্রতি বছরে বারো হাজারেরও বেশি। পূর্বাপেক্ষা কমেনি বরং বেড়েছে। বিমূদ্রাকরণের অভিশাপে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে যে চরম অবনতি খটেছিল, তাদের একটা বড় অংশ আর মাথা তুলতে পারেনি। দেশে কৃষি ও শিল্পোৎপাদন গত সাড়ে চার বছরে ক্রমশ অবনতির দিকে। কার্যকরী চাহিদার অভাবে দেশে সার্বিক বিনিয়োগ প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মোদির আমলে বেকারত্ব ক্রমশ বাড়ছে। অতীতের সরকারকে দোষারোপ করে অথবা রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে (যা অতীতে কখনও ঘটেনি) মনমোহন সিং-এর আমলের সরকারের সমৃদ্ধির হার নিচে নামিয়েও মোদি সরকার তার নিজের আমলে সমৃদ্ধির হার কোনভাবেই বাড়াতে পারছেন না। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোদির আমলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হার যেখানে ছিল ৮.২ শতাংশ, পরবর্তী ৩ বছরেও সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ মোদি সরকার। কৃষকদের স্বার্থে খরচের দেড় গুণ বেশি নূন্যতম দামের অঙ্গীকার করে কৃষকদের উৎপাদিত মূল ফসলের দাম গড়ে ১৫ শতাংশও বাড়েনি। অথচ মনমোহন সিং-এর আমলে ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই দাম শতাংশের হিসাবে আরও বেশি বেড়েছিল। শিল্প শ্রমিক ও অকৃষি শ্রমিকের প্রকৃত আয় মোদির আমলে কমেছে। কৃষি শ্রমিক ও কৃষকের অবস্থা আরও চরমে- বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ইত্যাদি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে।

 

মোদি সরকার কর্তৃক কৃষকদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

মোদি সরকার অঙ্গীকার করেছিল যে ২০২২-এ ভারতের কৃষকের প্রকৃত আয় দ্বিগুণ বাড়বে। এটা যে কত বড় মিথ্যাচার তা মোদির আমলে কৃষি উৎপাদনের সমৃদ্ধির হার থেকে তা স্পষ্ট। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করেছিলেন ২০২২-এর মধ্যে ভারতের কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করতে হলে মোদির আমলে কৃষির সমৃদ্ধির হার ২০১৪-১৫ থেকে গড়ে বছরে ১২ শতাংশের মতো হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে মোদির আমলে গত ৪ বছরে কৃষিতে সমৃদ্ধির হার গড়ে ৩ শতাংশের মতো। বর্তমান বছরে কৃষি সমৃদ্ধির হার আরও কমবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একদিকে কৃষকেরা ঋণের জালে সর্বস্বান্ত, অন্যদিকে কৃষিতে উৎপাদন ফলিয়েও তার দাম পাচ্ছে না কৃষক।

 

মোদির মডেল কৃষক আজ মোদিকেই দুষছেন

৭৫০ কেজি পিঁয়াজের দাম মাত্র ১০৬৪ টাকা। পিঁয়াজের ঝাঁঝে চোখে জল মহারাষ্ট্রের কৃষকের। বছরভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও কেজি প্রতি দেড় টাকাও জোগাড় করতে পারেনি মহারাষ্ট্রের নাসিকের এক কৃষক। তিনি আবার যে সে কৃষক নন। ভারতে কৃষিকাজ এবং কৃষকেরা কত আধুনিক এবং প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছেন, তা বোঝাতে এককালে তাকেই মডেল হিসাবে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সামনে। তার নাম শ্রী সঞ্জয় সাঠে।

 

জলের দরে পিঁয়াজ বিক্রির টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে

মুম্বইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে স্টল দিয়েছিলেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বুঝিয়ে ছিলেন, কীভাবে চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার করেন তিনি। নাসিকের সেই সঞ্জয় শাঠেই কৃষিবাজারে গিয়ে নিজের হাতে ফলানো ৭৫০ কেজি পিঁয়াজ কার্যত জলের দরে বিক্রি করতে বাধ্য হলেন। চাষের জন্য নেওয়া ঋণ কিভাবে পরিশোধ করবেন, তা তাঁর জানা নেই। এমন অবস্থায় ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি তিনি। পিঁয়াজ বিক্রি করে পাওয়া ১০৬৪ টাকা তিনি সোজা  প্রধানমন্ত্রীকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পাঠাতে গিয়ে মানি অর্ডারের জন্যও তাকে অতিরিক্ত ৫৪ টাকা চার্জ দিতে হয়েছে। পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও মানি অর্ডারটি তিনি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। খামের উপর ‘নরেন্দ্র মোদি’, ভারতের প্রধানমন্ত্রী লিখে মানি অর্ডারটি পাঠিয়ে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। তাঁর কথায়, “ওই টাকা নিয়ে কী-ই বা করতাম। তার থেকে উনিই বরং রাখুন।” গলায় ক্ষোভ ঝরিয়ে শাঠের মন্তব্য, মাসের পর মাস পরিশ্রম করে কী পেলাম, এক টাকা চল্লিশ পয়সা প্রতি কেজি।

 

খরচের দেড় গুণ দাম দেওয়ার ওয়াদা সত্ত্বেও কৃষকরা আজ সর্বস্বান্ত

নাসিকের বহু পিঁয়াজ চাষি তো শাঠের থেকেও হতবাক্য। শাঠে তবু কেজি প্রতি ১টাকা ৪০ পয়সা পেয়েছেন। তারা কেজি প্রতি এক টাকাও জোগাড় করতে পারেননি। শাঠের কথায়, “আমি কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। কিন্তু কৃষকদের প্রতি কেন্দ্রের এমন বঞ্চনা মেনে নেওয়া যায় না।” তাই হতবাক্য কৃষকরা বলছেন, খরচের থেকেও কম দামে বিকোতে হবে? হতভাগ্য দরিদ্র কৃষকের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কার্যত কোনও ক্ষমতা নেই মোদির।

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কার্যত কৃষকের পাশে

একদিকে বিজেপি শাসিত রাজ্যে চাষিরা কেজি প্রতি ১ টাকাও পিঁয়াজের দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আলু। বিজেপি শাসিত রাজ্যে পিঁয়াজ চাষিরা চরম দুর্দশার মধ্যে পড়লেও এ রাজ্যে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এগিয়ে এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। আলু উৎপাদনের উত্তরপ্রদেশের পরেই এ রাজ্যের অবস্থান। গড়ে বছরে রাজ্যে আলুর উৎপাদন ১১০-১২০ লাখ টন। প্রতিবছর নভেম্বরের মধ্যে হিমঘর খালি করে দিতে হয়। নভেম্বরের মধ্যে সমস্ত আলু হিমঘর থেকে বের করলে এক ধাক্কায় আলুর দাম তলানিতে যেত। এমতাবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার হিমঘরে আলু রাখার সীমা এক মাস বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করেছে। তা ছাড়াও আলু অন্যত্র পাঠানোর জন্য ১৫ কোটি টাকা ভরতুকিও বরাদ্দ করেছে সরকার। ট্রাকে পাঠালে প্রতি কুইন্টাল ৫০ টাকা এবং জাহাজে পাঠালে প্রতি কুইন্টাল ১০০ টাকা ভরতুকি মিলবে। এরই অর্থ কৃষকদের পাশে থাকা।

 

কিন্তু মোদির আমলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও অসংগঠিত ক্ষেত্র ছাড়াও কৃষকদের অবস্থা ক্রমশ ক্রমাবনতির দিকে। ঋণের জ্বালায় একদিকে কৃষকদের আত্মহত্যা কমছে না, অন্যদিকে কৃষির সমৃদ্ধির হার ক্রমশ কমছে। তেমনই খরচের থেকেও কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে হতভাগ্য কৃষকেরা। অথচ ঢাক পেটানো হচ্ছে, খরচের থেকে ফসলের দেড়গুণ বেশি দাম দেওয়া হচ্ছে চাষিদের। মিথ্যাচারের ফসল অবশ্যই ভোটের বাক্সে পড়বে।

 

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers