প্রাপ্য ও প্রাপ্তির সমন্বয় করতে হবে

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় মানুষের প্রত্যাশার কোনও সীমারেখা থাকে না ফলে গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তার দাবি উত্থাপন করতে পারে, আন্দোলন করতে পারে। আমাদের দেশের সংবিধানে কতকগুলি অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যথা ১) বক্তব্য রাখা ও অভিব্যাক্তির স্বাধীনতা। ২) কোনও স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে এবং অস্ত্র ছাড়া সমবেত হওয়া। ৩) অ্যাসসিয়েশান, ইউনিয়ন ও সমবায় গঠন। ৪) ভারতীয় সীমানার মধ্যে  স্বাধীনভাবে ঘোরা। ৫) ভারতবর্ষের যে কোনও স্থানে থাকা এবং বসবাস করা । ৬) সম্পত্তি ক্রয়, রক্ষা ও বিক্রি করার অধিকার। ৭) যে কোনও পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং কাজ, ব্যবসা-বাণিজা করা।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে অধিকার ভারতবর্ষের মানুষ ভোগ করে বিশ্বের সব দেশে এই সকল অধিকার স্বীকৃত নয়। সমগ্র পৃথিবীতে যে সকল ব্যাবস্থায় বিভিন্ন দেশ পরিচালিত হয় সেগুলি মূলত : ১) উদার রাজনৈতিক মতবাদ বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, ২) মার্কসীয় পথ যার স্রষ্টা কার্ল মার্কস এবং যাঁরা এই পথে দেশ পরিচালনা করেন তাঁদের বলা হয় কমিউনিস্ট, ৩) একনায়কতন্ত্র অর্থাৎ যেখানে ব্যক্তিই দেশ শাসন করে। যে কোনও রাজনৈতিক পথই হোক, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দেশের মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো , অন্যথায় দেশের মানুষ উগ্র থেকে অতি উগ্র আন্দোলনে শামিল হয়। কোথাও এই আন্দোলন রাজশক্তির সাহায্যে দমন করা হয় আবার কোথাও রাজশক্তির পতন হয়। কোনও কোনও দেশে  সামরিক শক্তিও শাসন ক্ষমতা দখল করে। সাংসদীয় গনতন্ত্রে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংখ্যাধিক্যের দ্বারা সরকার পরিচালিত হয়। প্রতিটি দেশ তাদের দেশের সংবিধান বর্ণিত ধারাগুলি দ্বারা দেশ পরিচালনা করে এবং সংবিধানের কোনও ধারা যদি দেশের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক হয় তাহলে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়।

যুগে যুগে বিভিন্ন দার্শনিক মানুষের অধিকার সম্পর্কে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন। গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে গণতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর মত ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এবং সেখানে বলা হয়েছিল সম অধিকার এবং রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দের দায়বদ্ধতা তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে। দার্শনিক আ্যরিস্টটল বলেছিলেন, “গরিষ্ঠ জনগণ যা মতামত ব্যক্ত করে তাহাই আইন।” দার্শনিক পেরিক্লিস বলেছিলেন, “এথেনিয়া সংবিধানই গণতন্ত্র কারণ ইহা সংখ্যাধিক্যের জন্য কল্যাণকর” এরপর প্রায় তিনশো বছর পরে আব্রাহাম লিঙ্কন বলেন, “জনগনের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের সরকার।” আজও এই মন্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সমগ্র পৃথিবীতে এবং বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ গণতন্ত্রের এই ব্যাখ্যাকেই সমর্থন করে। পরবর্তীকালে লর্ড ব্রেস গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর মত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, একটি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা পরিচালিত হবে যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষিত প্রতিনিধি থাকবে। মহাত্মা গান্ধী সত্য ও অহিংসাকে গণতন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। সর্বস্তরের মানুষের শারীরিক, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির সম্মিলিত চেষ্টায় সব স্তরের মানুষের মেধার মধ্যে গণতন্ত্রের বিনাশের কথা বলেছেন। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন বলেছেন, গনতন্ত্রের অন্তিম উদ্দেশ্য, মানুষের মধ্যে নিরাশা দূর করা, তাকে গোপন করা নয়।

গণতন্ত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে যে বক্তব্য তুলে ধরা হল তার কারণ হল, আমাদের দেশে গণতন্ত্র দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজ শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মানুষ অধিকার সম্পর্কে যতটা সচেতন হয়েছে দায়িত্ব সম্পর্কে সেইভাবে সচেতন হয়নি। সম্প্রতি একটি সভায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুবই সহজভাবে কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। এই প্রবন্ধে সেই বিষয়গুলির বিশ্লেষণ করতে চাই সকল মানুষের জন্য। তিনি বললেন, “প্রাপ্য ও প্রাপ্তির মধ্যে দূরত্ব খুবই কম। কিন্তু সেটা নির্ভর করে সরকারে যারা বিভিন্ন  দায়িত্বে আছে তাদের সদিচ্ছার উপর অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বে (শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত) এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁদের সদিচ্ছা, কর্তব্যপরায়ণতা ও দায়বদ্ধতার উপর প্রাপ্য ও প্রাপ্তির ব্যবধান থাকে না। “সরকার জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ করে মানুষের কল্যাণের জনা কিন্তু মানুষ যদি বঞ্চিত হয় তাহলে মুল উদ্দেশাই ব্যাহত হয়। এই প্রসঙ্গে দার্শনিক হেরোডোটাসের কথা অতান্ত প্রাসঙ্গিক যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, “সম অধিকার ও রাজনৈতিক নেতাদের দায়বদ্ধতা তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে।” প্রায় ২৫০০ হাজার বছর আগে একজন দার্শনিক যে কথা বলেছিলেন আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সহজ ভাষায় বলেছেন, “প্রাপ্য ও প্রাপ্তি”-র মধ্যে ব্যবধান ঘোচাতেই হবে। একজন দার্শনিক তার শিক্ষালব্ধ জ্ঞানের কথা মানুষকে জানাতে পারেন কিন্তু শাসন ক্ষমতায় থেকে সেই আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে গেলে কখনও কখনও কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে হয় কারণ দার্শনিক হেরোডোটাস বলেছিলেন, রাজনৈতিক নেতাদের দায়বদ্ধ হতে হবে জনগণের প্রতি। এর পর মমতা বন্দোপাধ্যায় বললেন, “কোনও কাজ ফেলে রাখা যাবে না।” কাজ ফেলে রাখার অর্থই হল মানুষের প্রতি বঞ্চনা ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাত্ত্বিক নেতা নন, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এই প্রসঙ্গে একটি পৌরাণিক ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। রামায়ণ আজকের যুবসমাজ পড়ে না। কিন্তু রামায়ণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে সকল ঘটনার কথা লেখা আছে তা জীবনে চলার পথনির্দেশ। একটি ঘটনা অতান্ত প্রাসঙ্গিক, সেই জন্য উল্লেখ করতে চাই। সীতা হরণের পর রাম ও শ্রীলঙ্কার রাজা রাবণের যুদ্ধের কথা আমরা জানি। যুদ্ধ শেষে পরাজিত রাবণ যখন মৃত্যুশয্যায় তখন রাম তার ভাই লক্ষণকে ডেকে বলেছিলেন যে চোদ্দো বছর বনবাসের পর দেশে গিয়ে তিনি রাজ্য শাসন ও প্রজাপালন করতে পারবেন না কারণ এই বিষয়ে তার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। তিনি লক্ষণকে পাঠালেন লঙ্কার রাজা রাবণের কাছে শিখতে কীভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে হয়। লক্ষণ রাবণের কাছে গেলেন এবং রামচন্দ্রের প্রার্থনা তাঁকে জানালেন । প্রথমে রাজা রাবণ কোনও কথা বলতে অস্বীকার করলেও পরে রাজি হন এবং বলেন, তুমি রামকে গিয়ে বলো রাজ্য পরিচালনার জন্য যে সিদ্ধান্ত নেবে সেই কাজ যেন ফেলে না রাখে। মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কাজ তখনই করতে হয় যখন সেটা মনে আসে । একটি সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “কাজ ফেলে রাখা যাবে না।” কয়েক হাজার বছর আগে রামায়ণে রাজ্য শাসনের যে পদ্ধতির কথা লেখা আছে আজ সেই কথাই বলছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী যোগ্য প্রশাসক হিসাবে । এই মানসিকতায় আমাদের মাতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এই প্রসঙ্গে আরও একটি প্রাসঙ্গিক ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। একদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শীতকালে একটি সভায় যোগদানের জন্য গাড়িতে যাচ্ছেন। রাস্তায় একটি ছাত্রকে দেখলেন, তার পায়ে জুতো নেই। তাঁর মনে খুবই দুঃখ হল। তিনি গাড়িতে বসেই প্রশাসনকে জানালেন, পশ্চিমবঙ্গের সব ছাত্র-ছাত্রী যারা প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে তাদের জুতো সরকার দেবে। আশা করি যে পৌরাণিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছি, পাঠক বুঝতে পারবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাত্ত্বিক নেতা না হয়েও বিভিন্ন দার্শনিকরা রাজ্য পরিচালনের জন্য যে পথের নির্দেশ দিয়েছেন তিনিও সেই পথের পথিক।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি একটি সভায় রাজনৈতিক নেতাদের লোভ সংবরণ করার কথা বলেছেন। অতীতেও অনেক সভায় এই কথা তিনি বলেছেন। এর কারণ হল, জনগণ নেতৃবৃন্দের জীবন , চালচলন, ব্যবহার লক্ষ করেন, যার প্রতিফলন হয় নির্বাচনের সময়। সঠিকভাবে গণতন্ত্র সফল হয় যদি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা তাঁদের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে সমাধান করেন এবং মানুষের আশা-আকাঙক্ষা পূরণ করেন।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial