প্রসঙ্গ : কাশ্মীর

পূর্ণেন্দু বসু 

প্রায় তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছে জম্মু-কাশ্মীর। জম্মুর জীবনযাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও শ্রীনগর-সহ কাশ্মীর উপত্যকা যে পুরোপুরি সেনাবাহিনী ও  নিরাপত্তারক্ষীদের কব্জায় তা বারংবার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। কেন্দ্র সরকার একই রেকর্ড বাজিয়ে দেশবাসীকে জানান দিচ্ছে, কাশ্মীরে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। অথচ প্রতিদিন সংবাদপত্রে স্থান করে নিচ্ছে  কাশ্মীর। কখনও দেশীয়, কখনওবা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই সেখান থেকে মৃত্যু-রুক্তপাত কিংবা নিখোঁজের সংবাদ আসছে অবরোধের ফাঁক-ফোকর গলে। এরই মধ্যে ইওরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে উগ্র দক্ষিণপন্থী আধা ফ্যাসিস্ট সাংসদদের কেন্দ্র সরকার অতিথি আপ্যায়ন করে কাশ্মীর সফরে নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য, কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে বহির্বিশ্বে “স্বাভাবিক” বলে প্রতিপন্ন করা। তাদের সফরের মধোই সন্ত্রাসী হামলায় বাংলার পাঁচজন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।

(এক)

সন্ত্রাসবাদীদের গুলিতে পাঁচ বাঙালি শ্রমিক হত্যা

২৯ অক্টোবর কাম্মীরের কুলগামে সন্ত্রাসবাদীদের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ৫ বাংলার শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার-অন্তর্গত সাগরদিঘি থানার বহালনগর প্রামে এই শ্রমিকরা খানিকটা বাড়তি আয়ের জন্য কাশ্মীরে গেছিলেন। সেই বহালনগর গ্রাম এখনও শোকস্তব্ধ। ভিন রাজ্যে প্রাণহারানো শ্রমিকদের পরিবারের পাশে বরাবরের মতো এবারও দাঁড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।  কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখা যায়নি। দেশের একজন নাগরিককেও যদি হত্যা করা হয়, তার দায় রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁর সঙ্গত কারণ রয়েছে। অথচ এভাবে পাঁচ বাঙালি শ্রমিকের বেখোরে প্রাণ হারানো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও তাপ- উত্তাপ লক্ষ করা যায়নি।

প্রশ্ন হলো, কাম্মীর কি সত্যিই স্বাভাবিক? ওখানকার মানুষজন কী বলছেন? মানুষকে মুখ খুলতে দেওয়া হচ্ছে না বলে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্র সরকার কাশ্মীরবাসীদের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার কতটা ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কাশ্মীরকে  নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা এতটাই অবরুদ্ধ করা হয়েছে যে, বহিরাগত কোনও মানুষকেই প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে  এতসব কড়াকড়ি সত্ত্বেও বাংলার মুর্শিদাবাদের এতজন শ্রমিক কী করে কাশ্মীরে থেকে গেল? কে বা কারা শ্রমিকদের নিয়ে গেল?

কাম্মীরে সন্ত্রাসবাদীদের গুলিতে পাঁচ বাঙালি শ্রমিকের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছেন, রাজ্যে কাজ পেলে শ্রমিকেরা ভিন রাজ্যে যেতেন না। সন্ত্রাসবাদীদের হানাতে প্রাণও যেত না। এ-এক-বালখিল্য যুক্তি! প্রাণ বাঁচাতে কি রাজ্যের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ হলো? এটাই কি নরেন্দ্র মোদির ‘নতুন ভারত’?  আমাদের সংবাধানের ভারত কিন্তু এমন নয়। ভারতের সফল নাগরিক দেশের যে-কোনও স্থানে যেতে পারবেন, বসবাস করতে পারবেন ও কাজ করতে পারবেন -এটা প্রত্যেক ভারতীয়ের মৌলিক অধিকার। অতএব সরকারের দায়িত্ব হলো, ভারতের সর্বত্র সকল নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কাশ্মীরে কেন্দ্র তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সহজ সত্যটা স্বীকার করতে বাধা কোথায় অভূতপূর্ব  সেনা উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদী হানা ঘটল কী করে? সেই প্রশ্নের উত্তরে কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে অভিযোগের অবতারণা অর্থহীন। কাজের জন্য কেন অদক্ষ অথবা দক্ষ কর্মীরা ঘর ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দেন,সে বিষয়ে অর্থশাস্ত্রে বহু আলোচনা রয়েছে অর্থনীতিবিদরা পরিযায়ী শ্রমকে অনভিপ্রেত বলে বিচার করেন না। তাই এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারকেদায়ী করার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই।

(দুই)

দক্ষিণপন্থী ইওরোপীয় সাংসদরা কাশ্মীরে

বিরোধী দলের সাংসদরা কাশ্মীরে ঢুকতে চাইলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইওরোপীয় ইউনিয়নের সাংসদদের করে দিল মোদি সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকের পর ২৮ জনের এই প্রতিনিধি দলটি ২৯ শে অক্টোবর কাশ্মীর পৌঁছোয়। কিন্তু ইওরোপীয় সরকারি সফর নয়। বিদেশি সাংসদরা প্রত্যেকেই বেসরকারি ভাবে এদেশে এসেছেন এই প্রতিনিধি দলের অনেকেই আবার অতি-ডানগন্থী, শরণার্থী-বিরোধী বলে পরিচিত দলের সদস্য।

আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের মুখে পড়ে বিজেপি সরকারই বাছাই করা সাংসদদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কাশ্মীরে পাঠাচ্ছে। যাতে তাদের ইতিবাচক রিপোর্টে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সওয়াল করতে সুবিধা হয়। প্রতিনিধি দলের সদস্য বি এন ডান বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের সবটাই ব্যাখ্যা করেছেন। কথা বলে বাস্তব পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করব।’

কাশ্মীরে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ এবং তারপরে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এই প্রথম কোনও বিদেশি প্রতিনিধি দল কাস্মীরে গেল। তিনজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি, ফারুক ও ওমর আবদুল্লা-সহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাকেই আটক করে রাখা হয়েছে। কাশ্মীরের বাইরে থেকে কোনও রাজনৈতিক নেতা সেখানে যেতে গেলেও বাধা পাচ্ছেন।

কিছুদিন আগেই মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির কাছে দাবি তোলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের কাশ্মীর যেতে দেওয়া হোক। কারণ নয়াদিল্লি যা বলছে সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট তার সঙ্গে মিলছে না। তাই চাপ কাটাতে মার্কিন কংগ্রেসের বদলে নিজেদের বাছাই করা ইওরোপীয় ইউনিয়নের সদ্যসদের কাশ্মীরে নিয়ে গেল মোদি সরকার।

ইওরোপীয় পার্লামেন্টের বাছাই করা সদস্যদের এনে কাশ্মীর সম্পর্কে ভাল ‘ছবি’ প্রচারের চেষ্টা করেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। কিন্তু সেই প্রতিনিধি দলের সফরের বিরুদ্ধে দফায় দফায়  বিক্ষোভ এবং জঙ্গি হামলায় পাঁচ বাঙালি শ্রমিক নিহত হওয়ায় সরকারের মুখ পুড়লো বলে মনে করা হচ্ছে।

২৯ অক্টোবর সকাল থেকেই উপত্যকার শ্রীনগর, গান্ধেরবাল, বাদগাম, বারামুলা, কুপওয়ারা,পুলওয়ামা,শোপিয়ান, কুলগামে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে রীতিমতো সংঘর্ষ হয় বাহিনীর। পুলিশের খবর অনুযায়ী, কাশ্মীরের ২৩টি এলাকায় জনতার সঙ্গে বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সফরের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই  ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রাখেন। শেষ পর্যন্ত ৩০ অক্টোবরের অনন্তনাগ ও কুপওয়ারা সফর বাতিল করে বিদেশি সফরকারিরা সফর বাতিল করেন। অন্যদিক, এদিনেই কাশ্মীর নিয়ে ফের মুখ খুলেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাইকমিশন। তাদের মুখপাত্র পার্ট কোলভিল বলেছেন, “কাস্মীরের মানুষ এখনও অনেক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। ভারতের কাছে আমাদের অনুরোধে নিষেধাজ্ঞা তুলে ওই মানবাধিকার তুলনায় হোক.”

এ যাবৎ কেন্দ্র দাবি করে এসেছে, পাকিস্তানের উস্কানি সত্ত্বেও কাশ্মীরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মোদি সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। ফলে উপত্যকার স্বাভাবিক ছবিটি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেনি মোদি সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসী হামলা দেখিয়ে দিল প্রকৃত সত্যটা কী!

(তিন)

ভাগ হয়ে গেল জম্মু-কাশ্মীর

কেন্দ্রের মোদি সরকারের একতরফা পদক্ষেপ অনুযায়ী ৩১ শে অক্টোবর আনুষ্ঠনিকভাবে হয়ে গেল জম্মু ও কাশ্মীর। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের অবনমন ঘটিয়ে  সেটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হলো। একই সঙ্গে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে করা হলো। পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। উপত্যকা দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় ভারতে রাজ্যের সংখ্যা ২৯ থেকে কমে ২৮ হল। আর কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের সংখ্যা ৮ থেকে বেড়ে ৯ হলো। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ এবং সে-রাজ্যের বিধানসভার মতামত না নিয়েই কেন্দ্রের গৃহীত এই পদক্ষেপের নিন্দা করেছেন অনেকেই। পাশাপাশি এটাও বলা দরকার যে, ইতিহাস বিকৃতি অভিযানকে সফল করার লক্ষে যে ভাবে বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মদিন কে বেঁচে নেওয়া হয়েছে, তা তীব্র সমালোচনার যোগ্য। সংসদে জম্মু – কাশ্মীর সংক্রান্ত আইনগুলি পাস করানোর তিন মাস পরেও এদেশের নাগরিক হিসাবে প্রাপ্য সংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি সে রাজ্যের মানুষকে দিতে অস্বীকার করছে কেন্দ্র। ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে এটি একটা লজ্জাজনক ঘটনা একটা লজ্জাজনক ঘটনা। কারণ, জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ ও সে রাজ্যের বিধানসভার কোনও মতামত ছাড়াই একটি রাজ্যকে বিভাজিত করা হলো এবং পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হল। এই ঘটনা ভারতীয় সংবিধানের ৩নং ধারার নির্লজ্জ  লঙ্ঘন। দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো- সহ সাংবিধানিক মুল্যবোধগুলিকে যাঁরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চান, তাদের সকলকে এ বিষয়ে ভেবে দেখতেই হবে।

সত্য-বর্জনের মাধ্যমে ইতিহাস বানানোর যে পদ্ধতি অমিত শাহ হাজির করেছেন তা কার্যকরী করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ দিনটি পছন্দ করেছে সরকার। অথচ বল্পভভাই প্যাটেলের আত্মজীবনী-সহ বিভিন্ন নথিতে একথাই উল্লিখিত রয়েছে যে সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার খসড়া তৈরির কাজে তিনি কেবল সহযোগীই ছিলেন না, সক্রিয়ভাবেই অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ এবং ১৬ মে তারিখে বল্লভভাই প্যাটেলের বাড়িতেই তিনি, জওহরলাল নেহেরু এবং শেখ আব্দুল্লা রাজ্যের বিশেষ মর্যাদার ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্যাটেল এবং গোপালস্বামী আইয়ার মিলিতভাবে যে খসড়া তৈরি করেছিলেন, সেটিই চূড়ান্ত পর্যায়ে ৩৭০ ধারা হিসেবে পরিগণিত হয়। এমনকী নেহরুর অনুপস্থিতিতে (নেহেরু তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন) শেষ পর্যন্ত প্যাটেলই গণপরিষদে ৩৭০ নম্বর ধারার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।

এসবের মধ্যে দিয়ে ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে আরএসএস-বিজেপি ক্রমশই প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক পথ থেকে সরে স্বৈরাচারী ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার পথে পা বাড়াচ্ছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এ-এক নয়া মোড়। অবশ্যই যা অগণতন্ত্রের দিকে যাত্রা বলেই প্রতিভাত হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী এই রাজনীতি অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী। এই হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি নির্বাচনের মাধ্যমে যে-রাজ্য দখল করতে পারবে না সেখানেই তারা জম্মু-কাশ্মীরের পথ অনুসরণ করবে। সমবেত প্রতিরোধই পারে এই পিছুটানের শক্তিকে পরাজিত করতে।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial