প্রসঙ্গঃ ক্ষুধা, শিশু অপুষ্টি ও ইতিহাস বিকৃতি ইত্যাদি

পূর্ণেন্দু বসু

ক্ষুধা ও অপুষ্টি

সম্প্রতি বিশ্ব ক্ষুধা সূচক প্রকাশিত হয়েছে। যার মাধ্যমে জানা গিয়েছে, ১১৭টি দেশের মধ্যে ভারতের ঠাঁই হয়েছে ১০২তম স্থানে। শ্রীলঙ্কা তো বটেই, এমনকী বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং নেপালের স্থানও ভারতের থেকে উপরে। ব্রিকস অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থান সর্বনিন্ন।

গ্লোবাল হাঙ্গার ইন্ডেক্স বা বিশ্ব খাদ্য সুচকের ধাক্কা সামলানোর আগেই রাষ্ট্রপুঞ্জের অধীনস্থ সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ভারতের অর্ধেক শিশুই অপুষ্টির শিকার। গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থা সর্বাপেক্ষা খারাপ। পরিসংখ্যানগুলি অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এমনকী, ২০০০ সালের তুলনায় ভারতের অবস্থা ভাল হয়েছে বলেও দাবি করা যাবে না। হাঙ্গার ইন্ডেক্সের তালিকায় ভারতের ঠিক আগে এবং পরে আছে আফ্রিকার দুটি দেশ–যথাক্রমে নাইজার ও সিয়েরা লিয়ন। ২০০০ সালে যখন প্রথম ক্ষুধা সূচক তৈরি হয়েছে, তখন এই দু’টি দেশে যে ভয়ংকর ছবি ছিল, সেই তুলনায় তাদের উন্নতি ভারতের থেকে যথেষ্ট ভাল। এই দুই হতদরিত্র দেশ যা পারে, “আর্থিক মহাশক্তি” নামধারী ভারত কেন তা পারে না, এই প্রশ্নটি আমাদের তিরের ফলার মতো বিঁধছে।

একথা স্মরণ করা বিধেয় যে এই ব্যর্থতা শুধু বর্তমান সরকারেরই নয়, তার পূর্বসূরিদেরও। স্বাধীনতার সাত দশক পার করে এসেও আমরা বৈষম্য কমাতে পারলাম না। এটা শুধু বিস্ময়ের নয়, অত্যন্ত লজ্জার এবং নিদারুণ উদ্বেগেরও। ভারতের আর্থিক বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। অর্থাৎ সমাজের সিংহভাগ মানুষের কাছে দেশের আর্থিক সমৃদ্ধির ফল পৌঁছয়নি। শিশুর পুষ্টিতে স্বভাবতই তার প্রভাব পড়েছে। আইসিডিএস বা মিডডে মিলের মতো প্রকল্পগুলিকে যতখানি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল, ভারতীয় রাজনীতি তা দেয়নি।

ভারতীয় শিশুরা যে অপুষ্টিতে ভুগছে, তা জানার জন্য কোনও আন্তর্জাতিক রিপোর্টের অপেক্ষায় থাকার দরকার নেই। শুধু চোখ খোলা রাখলেই সেই অপুষ্টির সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় নিরন্তর। তবুও শিশুর পুষ্টির প্রশ্নটি কখনও ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে না। মিডডে মিল নিয়ে ছেলেখেলা হয় কেন? অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী অনুপস্থিত থাকলে শিশুদের অভুক্ত থাকতে হয় কেন? সাধারণ মানুষ ও শিশুর অভিভাবকরা নেতাদের এই প্রশ্ন করেন না। রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন না। এর ফলেই রাষ্ট্রও শিশুর অপুষ্টিকে দেখেও না দেখে থাকতে পারে। শিশুদের ভোট নেই, ফলে তাদের নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই রাজনীতির। এরকম রিপোর্ট প্রকাশিত হলে কয়েকদিনের লজ্জা। তারপর যে-কে সেই।

কেন বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের পরিসংখ্যানগুলি নিদারুণ উদ্বেগজনক তা বোঝা প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের মতে, জন্মের প্রথম এক হাজার দিন, অর্থাৎ মোটামুটি তিন বছরের মধ্যে মানুষের মস্তিষ্ক পূর্ণতা পায়। একজন প্রাপ্তবয়স্কের মস্তিষ্কের দক্ষতা বহুলাংশেই নির্ধারিত হয়ে যায় পাঁচ বছর বয়সের আগেই। সেই কারণেই জন্মের পর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের সুষম ও পুষ্টিকর আহার সুনিশ্চিত করা সমগ্র দেশের ভবিষ্যতের পক্ষে অত্যান্ত জরুরি। আর এখানেই ভারতের ব্যর্থতা। নীতি- নির্ধারকরা এ বিষয়ে আর কবে দায়িত্বের পরিচয় দেবেন। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ—এই কথাটি উচ্চারণ করলেই ব্যর্থতা ঢাকা যাবে না। দেশের নীতি- নির্ধারকরা এতাবৎ কতটা ব্যর্থ, বিশ্ব ক্ষুধা সুচকের পরিসংখ্যানগুলি তার মর্মন্তুদ প্রমাণ।

সাভারকরপন্থীদের ইতিহাস-বিকৃতি

সাভারকরকে সামনে তুলে ধরার যে অভিযান বিজেপি নেতৃত্ব শুরু করেছে, তাকে আরও একধাপ এগিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গত ১৬ অক্টোবর ২০১৯ বারাণসীতে অমিত শাহ বলেন, সাভারকর যদি না বলতেন তাহলে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ প্রথম স্বাধীনতার লড়াই বলে চিহ্নিত হত না। বারাণসীতে অমিত শাহ ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ নিয়ে ভিন্ন মত অবশ্যই ছিল। কিন্তু সাভারকরই প্রথম এই বিদ্রোহকে স্বাধীনতার লড়াই বলেছেন– এমন কথা এর আগে শোনা যায়নি। বিজেপির “নয়া ইতিহাসবিদ”রা ইতিহাসকে তাদের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য ইতিহাসের পুনর্লিখন শুরু করেছেন।

১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ প্রসঙ্গে একথা ওয়াকিবহাল মহল জানে যে, সেই সময় মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস নিউইয়র্ক ট্রিবিউন পত্রিকায় লিখেছিলেন—সিপাহী বিদ্রোহ নয়, জাতীয় বিদ্রোহ”।

অমিত শাহ আরও বলেন, ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের ইতিহাস নতুন করে লেখা উচিত। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের সংগ্রাম সম্পর্কে কোনও গবেষণামূলক কাজ নেই। মহারাণা প্রতাপ ও শিখ গুরুদের আত্মত্যাগের বিষয়েও কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই। তার আসল বক্তব্য হল, সাভারকর ধারায় নয়া ইতিহাস রচনা করতে হবে। রাষ্ট্রবাদী দৃষ্টিতে দেখতে হবে ভারতের অতীতকে। এখন আরএসএস-বিজেপি ঠিক করেছে সাভারকরকে “জাতীয়তাবাদের জনক” বলে তুলে ধরা হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মহারাষ্ট্র নির্বাচনে বিজেপির ইস্তেহারে সাভারকরকে ভারতরত্ন দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৫ অক্টোবর ২০১৯ মহারাষ্ট্রে বলেছেন–সাভারকরের মূল্যবোধ জাতিগঠনের ভিত্তি। সাভারকরের জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ভিত্তি করেই আমরা জাতি গঠনের ধারণা গড়ে তুলেছি।

জাতীয়তাবাদী হিসাবে সাভারকরের ইতিহাস নানা কারণেই প্রশ্নের মুখে। তার জাতির ধারণাও ছিল ধর্মীয় পরিচয় ভিত্তিক। সাভারকর বন্দি অবস্থায় ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে। চিঠিতে লিখেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার যেমন চাইবে তেমনই সেবা করতে তিনি রাজি। ব্রিটিশের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার রাজনৈতিক নীতি নিয়েছিলেন তিনি। সাভারকর হিটলার- মুসোলিনির অনুরাগী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, হিন্দু ও মুসলিম পরস্পর “বৈরী জাতি”। ভারতে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে বাস করতে পারে না বলে তিনি সওয়াল করতেন। অভিযোগ উঠেছে, “লাইফ অব ব্যারিস্টার সাভারকর” নামে ১৯২৬ সালে একটি বই লেখা হয়, যেখানে সাভারকরের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়, সেই বইটি চিত্রগুপ্ত ছদ্মনামে আসলে লিখেছিলেন সাভারকর নিজেই। সম্প্রতি সাভারকরের উপর মোটা মোটা বই লেখা হচ্ছে। বইগুলির মাধ্যমে সাভারকরের উজ্জ্বল ভাবমুর্তি তুলে ধরা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সাভারকর যা করেছেন তা ছিল নেহাতই কৌশল মাত্র! এছাড়াও “ভয়েস অব ইন্ডিয়া” নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলে একের পর এক বই প্রকাশ করা হচ্ছে–ইতিহাস পুনর্লিখনের নামে। সেইসব বইতে গান্ধীকে দেশদ্রোহী বানানো হচ্ছে। গান্ধী-বিরোধীদের জাতীয় নেতা রূপে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সমালোচনা করা হচ্ছে নেহরুকে। তৈরি হচ্ছে আরএসএস ঘরানার ইতিহাস। আরএসএস যে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি, সেই সত্যকে অস্বীকার করে–ইতিহাস রচনায় “বিদেশি দৃষ্টিকোণ” এবং “স্বদেশি দৃষ্টিকোণ”-এর অবান্তর প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস রচয়িতাদের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই ভারতীয় ইতিহাসবিদরা কলম ধরেছেন। যুক্তি-নিষ্ঠা ও বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাস চর্চার একটা শক্তিশালী ধারা গড়ে উঠেছে। সেখানে গেরুয়া ইতিহাসবিদরা কোথায়? তারা যে কাজ করছেন, তা এককথায় প্রকৃত ইতিহাসের উপর অন্তর্ধাত। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। তবে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইতিহাস পুনর্লিখনের কথা কোনও বিশেষ বৈপ্লবিক নতুন ধারণা নয়। বিশ্বজুড়ে যুগে যুগে ক্ষমতাসীনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইতিহাসের সরকারি ভাষ্য পরিবর্তিত হয়েছে। এছাড়া নতুন উপাদান আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস ক্রমাগত পুনর্লিখিত হতে থাকে। অমিত শাহ যে পুনর্লিখনের উল্লেখ করেছেন তা ভারতের ইতিহাসের তথাকথিত “ভারতীয়করণ”। যার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতাদর্শের পূর্নমূল্যায়ন ও তাকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসা। স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর এই প্রস্তাব বিশদে আলোচনা হওয়া উচিত। কারণ তার মধ্যে নিহিত আছে কিছু বিপজ্জনক আশঙ্কা। এইসব বিষয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একথা সত্য যে স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে ভারতের ইতিহাস বহুলাংশেই পশ্চিমি , মূলত ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের রচনা-নির্ভর ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তন ঘটেছে বহুকাল আগেই। তবে ১৯৭০-৮০-র দশক থেকে ভারতীয় ইতিহাসের প্রতিটি শাখাতেই ভারতীয় ইতিহাসবিদেরা বিপুল অবদান রেখেছেন। সেই ধারা অব্যাহত। ভারতীয় ইতিহাস বহুমুখী। কাজেই পশ্চিমি প্রভাব নিয়ে দুশ্চিন্তাটি অমূলক।

মূল প্রশ্নটি হল সাভারকরকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসার জন্য বিজেপির একাংশের বিশেষ আগ্রহটি ঘিরে। একটা কথা বোঝা দরকার যে, মহাত্মা গন্ধী এবং সাভারকর, উভয়ের রাজনৈতিক দর্শন এতটাই পরস্পরবিরোধী যে, কোনও দলের পক্ষে উভয়েরই অনুগামী হওয়ার দাবি অর্থহীন। সাভারকর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে গান্ধীর ভাবনাকে নিরর্থক বাড়াবাড়ি বলে মনে করতেন। এমনকী বিজেপির পছন্দের মানুষ স্বয়ং বল্পভভাই প্যাটেলের ধারণা ছিল যে, গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গেও সাভারকর জড়িত ছিলেন। যদিও তা নিয়ে বিতর্কও আছে। একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, মহম্মদ আলি জিন্না-র অনেক আগে থেকেই সাভারকর দ্বিজাতি-তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তদুপরি সাভারকর বিশ্বাস করতেন মুসলমান বা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষদের দেশপ্রেম সততই প্রশ্নযোগ্য। কারণ, তাদের “পবিত্রভূমি” তাদের পিতৃভূমি থেকে পৃথক। এই দর্শন বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের “হিন্দু পাকিস্তান”-এ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এরকম সাভারকরীয় ভাবনাগুলির ক্ষেত্রে বিজেপির অবস্থান কী, তা দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত। হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের সেই ট্র্যাডিশন সামনে চলেছে। ইতিহাসের পুনর্লিখন নাকি যুক্তি তথ্যের বিসর্জন?

লিঞ্চিং অথবা পিটিয়ে হত্যা

রাষ্ট্রিয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত “লিঞ্চিং” শব্দটিকে নিশানা করেছেন। গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জমানায় এই শব্দটি ভারতে বহুল প্রচলিত। বস্তুত, গোটা বিশ্বও এখন মোদির ভারতে লিঞ্চিং ঘটনা সম্পর্কে অবহিত ও সন্ত্রস্ত। তাই এমন একটি শব্দ সঙ্ঘপ্রধানের পক্ষে প্রীতিকর না হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই ঠিক বিজয়া দশমীর পুণ্যলগ্নে, আরএসএসের প্রতিষ্ঠা দিবসে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, লিঞ্চিং ব্যাপারটাই পশ্চিমি। ভারতের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে এই নাম প্রয়োগ করলে দেশের এবং হিন্দু সমাজের অবমাননা করা হয়। ভাগবত আরও বলেছেন, এই দেশের বাইরে রচিত এক ধর্মগ্রন্থে’ লিঞ্চিংয়ের প্রসঙ্গ বিবৃত হয়েছিল। “পাপী”কে সমবেতভাবে পাথর ছুঁড়ে মারার উদ্যোগকে যিশুখ্রিস্ট কীভাবে প্রতিহত করেছিলেন, সেই কাহিনি উল্লেখ করে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দেন যে, ধর্মগ্রন্থটি বাইবেল। পবিত্র ভারতের কীর্তিকলাপ বর্ণনায় এমন শব্দ ব্যবহার করলে সনাতন হিন্দুত্বের যবনদোষ ঘটে–এমনটাই তিনি ভেবে থাকবেন।

লিঞ্চিং শব্দটি বিদেশি । এর পিছনে অস্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন ইতিহাসের ভূমিকাও সুবিদিত। কিন্তু শ্রীভাগবত শব্দতত্ত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য প্রতিষ্ঠা দিবসের বক্তৃতা ফাঁদেননি। এর পিছনে গুঢ় উদ্দেশ্য আছে বলেই অনুমান করা যায়। তিনি বিলক্ষণ জানেন, গণপ্রহারে হত্যার ঐতিহ্য ভারতে আদৌ অপরিচিত নয়। পাড়ায় পাড়ায় ছেলেধরা বা পকেটমার সন্দেহে পিটিয়ে মারা, দলিত নিধন এদেশে বহুকাল ধরেই চলে আসছে। তবে গত কয়েক বছরে প্রাণঘাতী গণপ্রহারের পরম্পরায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। তার নাম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ। উত্তরপ্রদেশের দাদরি, রাজস্থানের আলোয়ার, গুজরাতের উনা–মহান ভারতের এমন নানা অঞ্চলে দলিত ও সংখ্যালঘু মানুষ ক্রমাগত গোমাংস ভক্ষণ বা গোহত্যার অভিযোগে গণপ্রহারের শিকার হয়েছেন। কেউ প্রাণে বেঁচেছেন, অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘাতকরা সঙ্ঘ পরিবারের অনুগামী বা ভক্ত বলে পরিচিত। আরও বড় কথা হল—মোদি সরকারের শাসনে উগ্র হিন্দুত্ববাদের যে প্রবল দাপট কায়েম হয়েছে, যার উৎকট প্রকাশ ঘটে চলেছে গোরক্ষা থেকে শুরু করে জয় শ্রীরাম কীর্তনের জবরদস্তি অবধি নানাবিধ উপদ্রবে, এই অপরাধগুলির পিছনে সেই সামগ্রিক বাতাবরণের বিপুল অবদান। অথচ শাসক শিবিরের মনোভাব যেন কিছুই ঘটেনি! প্রধানমন্ত্রী এসব ক্ষেত্রে নীরবতা পালনকেই শ্রেষ্ঠ অবস্থান মনে করেন। তাই মোহন ভাগবতও শব্দটির জন্ম- বৃত্তান্ত নিয়ে বক্তৃতা করেই “কিছুই ঘটেনি” তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

একইভাবে অমিত শাহ বলেছেন—“মানবাধিকার”-এর ধারণাটি একটি পশ্চিমি ধারণা । ভারতীয় পরম্পরায় এই ধারণাটি খাপ খায় না। এখানেও উদ্দেশ্য একই। মোদি-শাসনে চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। সেই মানবাধিকার বিরোধী কার্যকলাপকে আড়াল করার জন্যই মানবাধিকারের ধারণার ব্যুৎপত্তি নিয়ে অমিত শাহ বক্তৃতা করেছেন। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই। একজন সংগঠিত হত্যার অপরাধীদের সমর্থন করেছেন। অপরজন মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষেই কথা বলেছেন। আরএসএস প্রধান এবং বিজেপি প্রধান-এর যৌথ তৎপরতা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করতে পারবে না।

This post is also available in: English

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial