প্রতিহিংসার রাজনীতি জবাব দেবে মানুষ: মমতা

রাণার চক্রবর্তী

গোটা দেশে দমবন্ধ পরিবেশ। এঁক্য ও সংহতির ভিতকে আঘাত করা হচ্ছে। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে গোপনীয়তার অধিকার।ইন্টারনেটে নজরদারি, স্টিং অপারেশন চলছে। এই পরিস্থিতিতে আবারও দেশকে এক্যবদ্ধ রাখার আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দেশের মানুষকে আবেদন করেছেন, “গব্বর সিংদের হাতে দেশকে আর ছেড়ে দেবেন না। বর্গিরা যেন আর ফিরে না আসতে পারে ।” নতুন প্রজন্মকেও এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে বলেছেন তিনি। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ‘খেলাশ্রী’ প্রকল্পের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছেন জননেত্রী। নাগরিকত্ব বা ফোনে আড়ি পাতা, সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রের শাসক দলকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন তিনি। প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের প্রজন্মের মানুষ কোথা থেকে বাবার বার্থ সার্টিফিকেট পাবেন? আর এরা কোথা থেকে কখন কাকে তাড়াবে, তা-ই খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই মাটিই আমাদের জন্ম, মৃত্যু, ধর্ম। বলছে, প্রথমে ৬ বছর বিদেশি হও। সবটা নির্বাচনী ভাওতা। এতে সত্য নেই। একটা টাইটেল মানুষের পরিচয় নয়। তার পরিচয় কাজে। নাগরিকত্ব কি ওরা বিচার করবে? ভোট এলেই এসব নাটক চলে। বিচারপতিরাও ছাড় পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা বা কেউ ফোনে কথা বললেই তা রেকর্ড করা হচ্ছে। জীবন ও সম্পত্তির অধিকার আর নিরাপদ নয়।” পাশাপাশি তিনি তোপ দেগেছেন, বাঙালি-বাঙালির মধ্যেও পরিকল্পনা করে বিভাজন করা হচ্ছে। বিভিন্ন এজেন্সিকে দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কিছুই ধোপে টিকবে না। চিদন্বরম কেন, এ রাজ্যের কেসও ধোপে টিকবে না। সবাইকে ফাসানো হচ্ছে। এই প্রতিহিংসার রাজনীতি ঠিক নয়। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ভোটের মুখে মানুষের আবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে একে তাড়াব, ওকে তাড়াব চলবে না। আধখানা রুটি ভাগ করে খাব, কিন্তু বাংলা থেকে কাউকে তাড়াব না। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মেয়র তথা মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, লক্ষ্মীরতন শুরা ছাড়াও ছিলেন সব খেলার কৃতী বাঙালিরা। হাজার হাজার যুবদের ভিড়ে রাজ্যের খেলার পরিকাঠামো উন্নতিতে এবার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার নতুন ৪৩০০ ক্লাবকে যেমন দুই লক্ষ টাকা করে অর্থসাহায্য করা হয়েছে, তেমনই ক্রীড়াপ্রতিভা তুলে আনতে এই প্রথম ২২১টি কোচিং সেন্টারকে এক লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানেই মুখ্যমন্ত্রী ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের মন্ত্র অরূপ বিশ্বাসকে নির্দেশ দেন, খ্যাতনামা পেনশন প্রকল্প চালু করা যায় তা খতিয়ে দেখতে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, জঙ্গলমহল, সুন্দরবন বা তরাই, রাঙামাটিতে পুলিশের তত্বাবধানে ৩০-৪০ হাজার ক্লাবকে যুক্ত করে ফুটবল প্রতিযোগিতা হচ্ছে। স্থানীয় স্তরে এই কাপগুলি জনপ্রিয়ও বটে। চ্যাম্পিয়ন, রানার্স দলের বা সেরা খেলোয়াড়দের সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি দেওয়া হচ্ছে। ব্যবস্থা থাকছে চাকরিতে উন্নতিরও ৷ তার কথায়, “শুধু খেলো ইন্ডিয়া বললেই হবে না। গেলো ইন্ডিয়া। অনেকে তো খেতেও পারে না। ক্রীড়া দফতরকে তাদের জন্য ভাবতে বলব, যদি পেনশন দিতে পারি। বাজেটে টাকা বরাদ্দ করতে হবে।” ক্লাবগুলিকে টাকা দিলেও কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকার আন্তরিক সাহায্যের প্রচার চায় না বলে জানিয়ে তার বক্তব্য, “অনেকে শুধু নির্বাচনের আগেই ক্লাবকে স্পনসর খুঁজে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। পরে আর পাত্তা পাওয়া যায় না। ক্লাবে টাকা দিলেও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সাদা, না কালো টাকা। এখন ক্লাবে সাহায্য করতে গেলেও ভয় পায়। ভয় হয়ে গিয়েছে, এজেন্সি লেলিয়ে দেবে না তো! স্পনসরের টাকাতেই তো ক্লাব চলে। কে কোথা থেকে টাকা দিচ্ছে, তা ক্লাব জানবে কী করে? গরমিল হলে প্রথমে সতর্ক করুন, তা করছে না। গায়ের জোরে কিছু করতে গেলে আমরা প্রতিবাদ করবই।” সাম্প্রদায়িকতা বা ভেদাভেদ প্রশ্নে এ রাজ্যের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। গান্ধীজি, নেতাজি বা বিবেকানন্দের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, “এঁদের ক্ষেত্রে কি জিজ্ঞাসা করা হয়, কে গুজরাতি, না বাঙালি, হিন্দু, না মুসলমান? সেই নেতা যে সবাইকে নিয়ে চলতে পারে । এই মাটিকে যেন কেউ কলঙ্কিত না করতে পারে। নতুন প্রজন্ম এগিয়ে আসুক। খেলাধুলোয় সম্প্রীতি তৈরি হয়।” খেলাধুলোর ক্ষেত্রে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায় হয়েছেন আজহারউদ্দিন, সৌরভ, কপিল, ধোনি। এঁদের ক্ষেত্রে কে কোন সম্প্রদায়ের দেখা হয়নি। মঞ্চে বসে থাকা আখতার আলি, গুরবক্স সিং, শ্যাম থাপার তুলনা টানেন মুখ্যমন্ত্রী

২০১১ সালে রাজ্য সরকারের ক্রীড়াক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৭৩ কোটি টাকা। এখন তা সাতগুণ, বেড়ে হয়েছে ৫১৫ কোটি টাকা। বহু পরিচিত ব্যক্তিত্বকে পেনশন দেওয়া হয়। নাম প্রকাশ করেন না মুখ্যমন্ত্রী। আসলে মুখ্যমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, “আন্তরিকতা ৩৬৫ দিনই করতে হয়। তিন বা পাঁচ বছরে একদিন করলে হয় না।” তার ইঙ্গিত ছিল কেন্দ্রের শাসক দলের প্রতি। ২০১৩ সাল থেকে ক্লাবগুলিকে অর্থসাহায্য করে আসছে রাজ্য । কিন্তু জিএসটি চালুর পর ক্লাব চালাতে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্লাবগুলিকে স্পনসর করার আগে কোনও প্রতিষ্ঠান এজেন্সির ভয়ে এগোতে পারছে না বলেও বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের তির কেন্দ্রের প্রতি। তবে খেলাধুলোর বিকাশ যাতে তাতে থমকে না যায়, রাজ্য সরকার সে দিকে লক্ষ রাখবে এবং ক্লাবগুলিকে এবং খেলোয়াড়দেরকে সাহায্য করার কর্মসুচি বহাল থাকবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। ইতিমধ্যেই রাজ্যের ২৪ হাজার ক্লাবকে প্রথম ধাপে দু’লক্ষ এবং পরে তিন লক্ষ টাকা করে আর্িক অনুদান দেওয়া হয়েছে। অডিট রিপোর্ট ঠিক থাকলে টাকা পেতে সমস্যা হবে না বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, “আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি। প্রচুর ক্লাব আছে যেখান থেকে ভাল খেলোয়াড় তৈরী হয়। কিন্তু তাদের পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন। আমরা তাদের কথা ভেবেই এই আর্থিক অনুদান চালু করেছি।” মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, কৃতী খেলোয়াড়, যাঁদের দরকার রয়েছে, তারা যেন পেনশন পেতে পারেন, তা দেখতে হবে। বয়সকালে অনেক খেলোয়াড় অর্থাভাবে ভোগেন। তাদের কথা ভেবেই রাজ্যের এই ভাবনা। পাশাপাশি সিভিক ভলান্টিয়াররা ভাল খেললে তাদের চাকরি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ‘খেলাশ্রী’র আওতায় এ দিন ‘ক্রীড়া গুরু’ সম্মান দেওয়া হয়েছে সাতজনকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার রণদেব বসু, আম্পায়ার সুবত পোড়েল, প্রাক্তন ফুটবলার দেবজিৎ ঘোষ এবং তুষার রক্ষিত-সহ মোট ১৫ জনকে দেওয়া হয়েছে ‘বাংলার গৌরব’ সম্মান। ‘খেল সম্মান’ পেয়েছেন ২০ জন। পর্বতারোহণে সত্যরূপ সিদ্ধান্ত, অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ী দলের সদস্য তরুণ ক্রিকেটার ঈশান পোড়েল-সহ ১২ জন পেয়েছেন ‘বিশেষ সন্মান’। উপস্থিত ছিলেন মেয়র তথা মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের রাষ্ট্র মন্ত্রী লক্ষ্মীরতন শুক্ল। ছিলেন গুরুবক্স সিং, আখতাআলি, পরিমল দে, মনোজ তেওয়ারি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের কৃতী ক্রীড়াবিদরা।

This post is also available in: Bangla

Subscribe to Jagobangla

Get the hottest news,
fresh off the rack,
delivered to your mailbox.

652k Subscribers